ভূমিকা

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:১০০

তবে এই আয়াতের হিজরতকে আধুনিক অর্থে প্রত্যেক ধরনের চাকরি বা উন্নত জীবনের জন্য বিদেশে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক নয়। ঐতিহাসিক হিজরতের মূল বিষয় ছিল ঈমান ও আল্লাহর পথে অবস্থান।

তাই প্রশ্নটির উত্তর দিতে হলে ইসলামের মূলনীতি, কোরআন-হাদিস এবং ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝতে হবে।


হিজরত বলতে কী বোঝায়?

আরবি “হিজরত” শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছু পরিত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়া। ইসলামের ইতিহাসে “হিজরত” বলতে বিশেষভাবে আল্লাহর দ্বীন রক্ষার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদিনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবিদের স্থানান্তরকে বোঝানো হয়।

তবে হিজরতের ধারণা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদি কোনো ব্যক্তি এমন পরিস্থিতিতে থাকে যেখানে সে নিজের ঈমান ও ফরজ দ্বীন পালন করতে পারে না এবং অন্যত্র গিয়ে তা পালন করার সুযোগ পায়, তখন স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“নিশ্চয় যারা নিজেদের প্রতি জুলুমকারী অবস্থায় ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে, তারা বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ও অসহায় ছিলাম।’ ফেরেশতারা বলে, ‘আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে তোমরা সেখানে হিজরত করতে?’”
—সূরা আন-নিসা, ৪:৯৭

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের দ্বীন পালন করতে না পারে এবং তার জন্য অন্যত্র যাওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকে, তাহলে স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি কখনো কখনো দায়িত্বে পরিণত হতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পৃথিবীর সব অমুসলিম দেশে বসবাস করা হারাম।


অমুসলিম দেশে বসবাস কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম?

না।

অমুসলিম দেশে বসবাসের বিষয়টি নিয়ে ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সমকালীন মিসরের দারুল ইফতা আল-আযহারভিত্তিক ফতোয়া পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে যে, একজন মুসলমান অমুসলিম দেশে বসবাস করতে পারে, যদি সে নিজের দ্বীন, জীবন ও মর্যাদা নিরাপদ রাখতে পারে এবং ইসলামের মৌলিক ইবাদত পালনের সুযোগ পায়।

অর্থাৎ শুধু কোনো দেশের নাগরিকরা মুসলিম নয়—এই কারণে সেখানে বসবাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম বলা যায় না।

ইসলাম মানুষকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৈধভাবে চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দিয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩

এ আয়াত মানুষের বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্পর্কের কথা বলে।


উন্নত দেশে চাকরি বা ব্যবসার জন্য যাওয়া কি জায়েজ?

যদি উদ্দেশ্য হয় বৈধ চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, গবেষণা বা জীবিকার উন্নতি, তাহলে মূলত বিদেশে যাওয়া নিজে হারাম নয়।

ইসলামে হালাল উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“কোনো ব্যক্তি তার নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি।”
—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২০৭২

অতএব একজন মুসলমান যদি বৈধ চাকরির জন্য জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে যান এবং সেখানে বৈধ উপায়ে উপার্জন করেন, তাহলে শুধু বিদেশে যাওয়ার কারণে তার উপার্জন হারাম হয়ে যাবে না।

তবে কাজটি নিজেই হারাম হলে বিষয়টি ভিন্ন।

উদাহরণ হিসেবে—

  • সুস্পষ্টভাবে হারাম ব্যবসা;
  • মাদক ব্যবসা;
  • জুয়া;
  • প্রতারণা;
  • পর্নোগ্রাফি;
  • অবৈধ অস্ত্র বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড;
  • মানুষের অধিকার নষ্ট করে এমন কাজ

ইত্যাদির জন্য বিদেশে যাওয়া বৈধ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।


উন্নত জীবনের জন্য বিদেশে যাওয়া কি শরিয়তসম্মত?

অনেক মুসলমান উন্নত দেশে যেতে চান কারণ সেখানে—

  • ভালো চাকরির সুযোগ রয়েছে;
  • উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে;
  • উন্নত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে;
  • নিরাপদ পরিবেশ রয়েছে;
  • শিশুদের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব;
  • গবেষণা ও পেশাগত উন্নতির সুযোগ রয়েছে;
  • সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশি।

এসব কারণ নিজে হারাম নয়।

ইসলাম মানুষের বৈধ প্রয়োজন ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“তিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:২৯

তবে এই আয়াতের অর্থ এই নয় যে মানুষ যা ইচ্ছা তাই করবে। বরং পৃথিবীর সম্পদ বৈধ উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

সুতরাং উন্নত জীবনযাত্রার জন্য বিদেশে যাওয়া বৈধ হতে পারে, যদি এর সঙ্গে হারাম উদ্দেশ্য বা দ্বীন নষ্ট হওয়ার বিষয় যুক্ত না থাকে।


কোরআনে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়ার কথা

বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াতগুলোর একটি হলো সূরা আন-নিসার ১০০ নম্বর আয়াত।

আল্লাহ বলেন:

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:১০০

এখানে আল্লাহ পৃথিবীকে প্রশস্ত বলেছেন।

ইসলামের ইতিহাসেও দেখা যায়, প্রথম যুগের মুসলমানরা প্রয়োজন অনুযায়ী এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়েছেন।

হাবশায় সাহাবিদের হিজরত এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মক্কার নির্যাতনের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের এমন একটি দেশে যেতে অনুমতি দেন যেখানে ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন এবং তারা নিরাপদে থাকতে পারতেন।

এ ঘটনা থেকে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—শুধু কোনো দেশের মুসলিম-অমুসলিম পরিচয় নয়; সেখানে একজন মুসলমান তার ঈমান ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।


হাবশায় মুসলমানদের হিজরত থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মক্কার মুসলমানদের ওপর যখন নির্যাতন বেড়ে যায়, তখন তিনি কিছু সাহাবিকে হাবশায় যাওয়ার অনুমতি দেন।

কারণ সেখানে নাজাশি নামে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন।

সীরাতের বর্ণনাগুলোতে হাবশার নাজাশির ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এখান থেকে আধুনিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি নীতিগত শিক্ষা নেওয়া যায়:

একজন মুসলমান এমন জায়গায় যেতে পারেন যেখানে তার জীবন, সম্পদ, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।

অবশ্য হাবশার ঐতিহাসিক হিজরত এবং আজকের অর্থনৈতিক মাইগ্রেশনকে হুবহু একই বিষয় বলা যাবে না। ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।


অমুসলিম দেশে মুসলমানের দ্বীন পালন করতে পারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানের প্রথম দায়িত্ব হলো ঈমান ও ফরজ ইবাদত রক্ষা করা।

যদি কোনো দেশে গিয়ে একজন মুসলমান—

  • নামাজ পড়তে না পারেন;
  • রোজা রাখতে বাধা দেওয়া হয়;
  • ঈমান ও আকিদা ত্যাগ করতে বাধ্য হন;
  • ইসলাম পালন করার কারণে জীবন বা গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে;
  • সন্তানদের ঈমান রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে যায়;

তাহলে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিষয়টি গুরুতরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

মিসরের দারুল ইফতার ফতোয়াতেও অমুসলিম দেশে বসবাসের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হিসেবে দ্বীন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ইসলামের মৌলিক ইবাদত পালনের সক্ষমতা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু—

“দেশটি মুসলিম কি না?”

এটি নয়।

বরং প্রশ্ন হবে—

“আমি সেখানে থেকে কি আমার ইসলাম যথাযথভাবে পালন করতে পারব?”


নিজের সন্তানদের দ্বীন রক্ষা করা কেন জরুরি?

একজন ব্যক্তি নিজের ঈমান রক্ষা করতে পারলেও সন্তানদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু নিজের ইবাদত নয়; সন্তানদের ঈমান, নৈতিকতা ও ইসলামী শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ বলেন:

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।”
—সূরা আত-তাহরিম, ৬৬:৬

তাই পরিবারসহ উন্নত দেশে যাওয়ার আগে মুসলিম পরিবারের উচিত বিবেচনা করা—

  • সন্তানদের ইসলাম শেখানোর সুযোগ আছে কি না;
  • মসজিদ বা ইসলামিক সেন্টার আছে কি না;
  • হালাল খাবারের ব্যবস্থা কতটা সহজ;
  • সন্তানদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখা সম্ভব কি না;
  • পরিবারে ইসলামী পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব কি না;
  • স্কুলের পরিবেশে ইসলামী মূল্যবোধ কীভাবে রক্ষা করা হবে।

এগুলো বাস্তব প্রশ্ন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অমুসলিম দেশের প্রতিটি স্কুল বা সমাজ মুসলমানের জন্য ক্ষতিকর। বাস্তবতা দেশ, শহর, পরিবার ও পরিবেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।


মুসলমান কি অমুসলিম দেশের নাগরিক হতে পারে?

এটিও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।

আধুনিক সময়ে অনেক মুসলমান দীর্ঘদিন বিদেশে বসবাসের পর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

এ বিষয়ে সমকালীন আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা রয়েছে। মিসরের দারুল ইফতা ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের একটি ফতোয়ায় অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণকে নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ বলেছে। সেখানে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে যদি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং ফরজ ইবাদত পালনে বাধা সৃষ্টি না হয়, তাহলে নাগরিকত্ব গ্রহণে আপত্তি নেই।

অতএব—

“অমুসলিম দেশের নাগরিক হলেই মুসলমানের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়”—এমন সাধারণীকরণ সঠিক নয়।

কোনো মুসলমানের ঈমানের ব্যাপারে এমন গুরুতর সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তিগত ও প্রমাণনির্ভর; সাধারণ মানুষের এ ধরনের তাকফিরে জড়ানো উচিত নয়।


বিদেশের আইন মানা কি মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক?

যে দেশে একজন মুসলমান বৈধ ভিসা বা নাগরিকত্বের মাধ্যমে বসবাস করছেন, সেখানে সে দেশের আইন ও বৈধ চুক্তি মানা তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ বলেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।”
—সূরা আল-মায়িদা, ৫:১

একজন ব্যক্তি যখন কোনো দেশের বৈধ ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি সেই দেশের আইন মেনে চলার একটি আইনগত সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করেন।

সুতরাং মুসলমানের জন্য—

  • ভিসার শর্ত মানা;
  • বৈধভাবে কাজ করা;
  • কর ও আইনগত দায়িত্ব পালন;
  • প্রতারণা না করা;
  • জাল কাগজ ব্যবহার না করা;
  • অবৈধভাবে অবস্থান না করা

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


অবৈধভাবে ইউরোপ বা উন্নত দেশে প্রবেশ করা কি জায়েজ?

না।

উন্নত দেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা, জাল কাগজ ব্যবহার করা, প্রতারণা করা বা অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনগত অনুমতি ছাড়া অবস্থান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে।

মিসরের দারুল ইফতার একটি ফতোয়ায় অবৈধ অভিবাসনের বিভিন্ন ধরন—যেমন গোপনে সীমান্ত অতিক্রম, জাল নথি ব্যবহার এবং অনুমোদিত সময়ের পর বেআইনিভাবে অবস্থান—নিষিদ্ধ বলা হয়েছে।

এর কারণ শুধু আইন ভঙ্গ নয়; এর সঙ্গে প্রতারণা, চুক্তি ভঙ্গ এবং কখনো কখনো নিজের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়ার বিষয়ও যুক্ত থাকে।

ইসলাম নিজের জীবনকে অকারণে বিপদের মধ্যে ফেলার অনুমতি দেয় না।


নৌপথে বিপজ্জনকভাবে অবৈধ মাইগ্রেশন?

অনেক সময় উন্নত দেশে যাওয়ার জন্য মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে যাত্রা করে। অতিরিক্ত বোঝাই নৌকা, সমুদ্রের ঝুঁকি এবং দালালদের প্রতারণার কারণে মানুষের প্রাণহানিও ঘটে।

এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার আগে শরিয়তের একটি মৌলিক নীতি মনে রাখতে হবে:

জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত।

আল্লাহ বলেন:

“তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৫

তাই শুধু উন্নত জীবনের আশায় নিজের জীবনকে অযৌক্তিক ও নিশ্চিত বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া শরিয়তের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


মুসলমানের জন্য উন্নত দেশ কি সবসময় উত্তম?

না।

কোনো দেশের মাথাপিছু আয় বেশি হলেই সেই দেশ একজন মুসলমানের জন্য অবশ্যই উত্তম—এমন সিদ্ধান্ত ইসলামে নেই।

একজন মুসলমানের জন্য প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হলো—

দুনিয়ার কল্যাণ + আখিরাতের সফলতা।

কেউ যদি উন্নত দেশে গিয়ে অনেক অর্থ উপার্জন করেন কিন্তু নামাজ, ঈমান, পরিবার ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক সফলতা ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণ সফলতা নয়।

আল্লাহ বলেন:

“যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সেই-ই সফল।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫

অতএব অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু বেতন বা জীবনযাত্রার মান নয়—আখিরাতের কথাও বিবেচনা করতে হবে।


আবার দরিদ্র দেশে থাকা কি বাধ্যতামূলক?

এটিও সঠিক নয়।

ইসলাম কোনো মুসলমানকে শুধু এই কারণে একটি নির্দিষ্ট দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশে থাকতে বাধ্য করেনি যে তার জন্ম সেখানে হয়েছে।

যদি একজন মুসলমান বৈধভাবে অন্য দেশে গিয়ে—

  • হালাল জীবিকা অর্জন করতে পারেন;
  • নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখতে পারেন;
  • সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে পারেন;
  • দ্বীন পালন করতে পারেন;
  • সমাজের জন্য উপকারী হতে পারেন;

তাহলে সেখানে বসবাস করা বৈধ হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“নিশ্চয়ই কাজসমূহ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।”
—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৭

তাই একই কাজ—বিদেশে যাওয়া—একজনের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে, অন্যজনের জন্য সাধারণভাবে বৈধ হতে পারে, আবার অন্য কারো ক্ষেত্রে হারামও হতে পারে।

কারণ উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন।


নিয়ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ধরা যাক, দুইজন মুসলমান একই দেশে গেলেন।

প্রথম ব্যক্তি গেলেন বৈধ চাকরি করে পরিবারের হালাল জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য।

দ্বিতীয় ব্যক্তি গেলেন হারাম ব্যবসা করার জন্য।

দুজনের কাজ বাহ্যিকভাবে একই—“বিদেশে যাওয়া”।

কিন্তু শরিয়তের বিচারে দুজনের নিয়ত ও কাজ এক নয়।

এখানে নিয়তের সঙ্গে কাজের বৈধতাও থাকতে হবে।

শুধু “আমার নিয়ত ভালো” বললেই হারাম কাজ হালাল হয়ে যায় না।


অমুসলিম সমাজে মুসলমানের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

ইসলাম মুসলমানকে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অন্যায় করতে শেখায় না।

আল্লাহ বলেন:

“যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।”
—সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:৮

এই আয়াত মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নীতি নির্দেশ করে।

অতএব একজন মুসলমান উন্নত দেশে বসবাস করলে—

  • প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন;
  • কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখবেন;
  • আইন মেনে চলবেন;
  • প্রতারণা করবেন না;
  • মানুষের অধিকার নষ্ট করবেন না;
  • ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাবেন;
  • নিজের ইসলামি পরিচয় বজায় রাখবেন;
  • অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিও অন্যায় করবেন না।

এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ পথ।


মুসলমান কি অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারে?

এখানেও ভারসাম্য প্রয়োজন।

ইসলাম সব অমুসলিম মানুষের সঙ্গে শত্রুতার শিক্ষা দেয় না।

বরং কুরআন ন্যায়বিচার ও সদাচরণের কথা বলেছে।

একজন মুসলমান অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে পারেন, সহকর্মীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে পারেন, অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে পারেন এবং সামাজিক সহযোগিতা করতে পারেন—যতক্ষণ তা ইসলামের নিষিদ্ধ বিষয়কে গ্রহণ বা সমর্থন করার পর্যায়ে না যায়।

মুসলমানের চরিত্রই অনেক সময় ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় হয়ে ওঠে।


উন্নত দেশে বসবাস করলে কি মুসলমানের ইসলামি পরিচয় হারিয়ে যাবে?

অবশ্যই নয়।

ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ভাষা বা ভূখণ্ডের ধর্ম নয়।

আল্লাহ বলেন:

“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে…”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩

ইসলাম বিশ্বজনীন ধর্ম।

তাই একজন মুসলমান ফ্রান্সে থাকলেও মুসলমান, কানাডায় থাকলেও মুসলমান, জাপানে থাকলেও মুসলমান, আফ্রিকায় থাকলেও মুসলমান।

তবে স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার ইসলামি জীবনযাপনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।


বিদেশে মুসলমানের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

১. ঈমান রক্ষা করা

সবার আগে নিজের ঈমান ও আকিদা রক্ষা করতে হবে।

২. ফরজ ইবাদত পালন করা

বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, যাকাত প্রযোজ্য হলে যাকাত ইত্যাদি।

৩. হালাল উপার্জন করা

বিদেশে গিয়ে বেশি বেতন পাওয়া গেলেই যেকোনো কাজ করা যাবে না।

৪. পরিবারকে ইসলামী শিক্ষা দেওয়া

সন্তানদের কোরআন, নামাজ, ইসলামি আদব ও নৈতিকতা শেখানো জরুরি।

৫. ভালো মুসলিম নাগরিক হওয়া

সততা, আমানতদারি, পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা উচিত।


বিদেশে গিয়ে ইসলাম পালন করা সম্ভব না হলে কী হবে?

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যদি কোনো মুসলমান বাস্তবভাবে এমন অবস্থায় পড়েন যেখানে তিনি ইসলাম পালন করতে পারছেন না এবং সেখান থেকে বের হওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে, তাহলে স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি তার জন্য গুরুতর দায়িত্ব হয়ে উঠতে পারে।

সূরা আন-নিসা ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এমন ব্যক্তিদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন যারা নিজেদের দ্বীন রক্ষার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনমূলক পরিবেশ থেকে বের হননি। তবে একই আয়াতে যারা সত্যিই অসহায় এবং বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না, তাদের ব্যতিক্রমও করা হয়েছে।

এখানে বোঝা যায়—শরিয়ত মানুষের বাস্তব সামর্থ্য ও পরিস্থিতিও বিবেচনা করে।


“লা হিজরাতা বাদাল ফাতহ”—এর অর্থ কী?

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“ফাতহে মক্কার পর আর হিজরত নেই; তবে জিহাদ ও নিয়ত রয়েছে…”
—সহিহ আল-বুখারি, ৩১৮৯; সহিহ মুসলিম, ১৩৫৩

এই হাদিসের অর্থ বুঝতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে।

এখানে মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদিনায় সেই বিশেষ ধরনের হিজরতের কথা বলা হয়েছে যা ইসলামের প্রথম যুগের পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

এটি এই অর্থে নেওয়া যাবে না যে আজ কোনো মুসলমান দেশ পরিবর্তন করতে পারবেন না।

আজকের শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, নিরাপত্তা বা বৈধ জীবিকার জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন একটি আলাদা বিষয়।


তাহলে আধুনিক “Migration” আর ইসলামের “Hijrah” কি একই?

না, সম্পূর্ণ একই নয়।

আধুনিক Migration বলতে সাধারণত বোঝানো হয়—

  • চাকরির জন্য দেশ পরিবর্তন;
  • পড়াশোনার জন্য দেশ পরিবর্তন;
  • ব্যবসার জন্য দেশ পরিবর্তন;
  • পরিবারের সঙ্গে অন্য দেশে বসবাস;
  • স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব গ্রহণ;
  • নিরাপত্তার কারণে দেশ পরিবর্তন।

আর ইসলামের ঐতিহাসিক হিজরত বিশেষ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় থাকতে পারে—মানুষ তার বর্তমান স্থান থেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

তাই আধুনিক অভিবাসনের প্রতিটি ঘটনাকে “হিজরত” বলে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রত্যেক অভিবাসনকে হারাম বলাও ঠিক নয়।


উন্নত দেশে যাওয়ার আগে একজন মুসলমান কী কী বিবেচনা করবেন?

বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত।

১. উদ্দেশ্য কী?

চাকরি? ব্যবসা? শিক্ষা? নিরাপত্তা? নাকি অন্য কোনো কারণ?

২. উপার্জন হালাল কি না?

চাকরি ও ব্যবসার প্রকৃতি যাচাই করতে হবে।

৩. নামাজের সুযোগ আছে কি?

বাসা, কর্মস্থল এবং স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে আগে জানা ভালো।

৪. হালাল খাবারের ব্যবস্থা আছে কি?

বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিবেচ্য।

৫. সন্তানদের শিক্ষা কেমন হবে?

শুধু একাডেমিক ফলাফল নয়, তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

৬. মুসলিম কমিউনিটি আছে কি?

মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার, মুসলিম পরিবার ইত্যাদি থাকলে ধর্মীয় জীবন বজায় রাখা সহজ হতে পারে।

৭. আইনগত অবস্থান কী?

বৈধ ভিসা, রেসিডেন্স ও কাজের অনুমতি থাকা জরুরি।

৮. পরিবারে প্রভাব কী হবে?

অভিবাসন পরিবারের সম্পর্ক, সন্তানদের শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবনে কী প্রভাব ফেলবে তা বিবেচনা করতে হবে।


উন্নত দেশে গিয়ে মুসলমানদের কীভাবে জীবনযাপন করা উচিত?

একজন মুসলমানের উচিত নিজের পরিচয়কে ইতিবাচকভাবে ধারণ করা।

তিনি—

সৎ হবেন।
কর্মঠ হবেন।
সময়ানুবর্তী হবেন।
অন্যের অধিকার রক্ষা করবেন।
আইন মেনে চলবেন।
হারাম থেকে দূরে থাকবেন।
নামাজ ও ইবাদত বজায় রাখবেন।
পরিবারকে ইসলামী মূল্যবোধে গড়ে তুলবেন।

একজন মুসলমানের চরিত্র তার ইসলামি পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই, মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, আমানতদারি, সত্যবাদিতা ও ন্যায়বিচার ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


বিদেশে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করার ক্ষেত্রে দায়িত্ব

যদি কোনো দেশে মুসলমানকে মসজিদ নির্মাণ, নামাজ, রোজা, ইসলামি শিক্ষা এবং ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেই সুযোগের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

একই সঙ্গে মুসলমানেরও দায়িত্ব হলো দেশের আইন মেনে চলা এবং অন্য মানুষের অধিকারকে সম্মান করা।

ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে অন্যের প্রতি অন্যায় করার অধিকার নয়।

বরং ইসলামি আদর্শ হলো—

নিজের ধর্ম পালন করা এবং অন্যের বৈধ অধিকার সম্মান করা।


অভিবাসন কি কখনো মুসলমানের জন্য ওয়াজিব হতে পারে?

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হতে পারে।

যদি কোনো মুসলমান এমন পরিবেশে থাকেন যেখানে তিনি নিজের ফরজ দ্বীন পালন করতে পারছেন না এবং অন্যত্র যাওয়ার বাস্তব সক্ষমতা রয়েছে, তাহলে স্থানান্তর করা তার ওপর ওয়াজিব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূরা আন-নিসা ৯৭ নম্বর আয়াত এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তবে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি না জেনে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর “তোমার জন্য হিজরত ফরজ” এমন ফতোয়া দেওয়া উচিত নয়।

কারণ শরিয়তের হুকুম ব্যক্তির বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে।


অভিবাসন কি কখনো হারাম হতে পারে?

হ্যাঁ।

যেমন—

হারাম উদ্দেশ্যে যাওয়া

যদি বিদেশে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হয় হারাম কাজে জড়ানো।

দ্বীন ধ্বংসের প্রবল আশঙ্কা

যদি ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানেন যে সেখানে গিয়ে তিনি নিজের ফরজ দ্বীন পালন করতে পারবেন না এবং বিকল্প থাকার সুযোগও রয়েছে।

অবৈধ পদ্ধতিতে প্রবেশ

জাল কাগজ, প্রতারণা বা অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম।

গুরুতর ও অযৌক্তিক জীবনঝুঁকি

শুধু অর্থনৈতিক লাভের জন্য নিজের জীবনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিশ্চিত বিপদের মধ্যে ফেলা।

তাই “বিদেশে যাওয়া” নিজে এককভাবে হালাল বা হারাম নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী হুকুম পরিবর্তিত হতে পারে।


অভিবাসন কি কখনো মুস্তাহাব বা উত্তম হতে পারে?

হ্যাঁ, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

যদি কোনো ব্যক্তি—

  • নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখতে পারেন;
  • হালাল উপার্জনের সুযোগ পান;
  • উন্নত শিক্ষা অর্জন করতে পারেন;
  • নিজের দ্বীন পালন করতে পারেন;
  • সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারেন;

তাহলে তার জন্য বিদেশে যাওয়া বৈধ ও কল্যাণকর সিদ্ধান্ত হতে পারে।

তবে এটিকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য “অবশ্যই বিদেশে যেতে হবে” এমন ধারণায় পরিণত করা যাবে না।


উন্নত দেশ মানেই কি সুখী জীবন?

এখানেও ভারসাম্য জরুরি।

উন্নত দেশে ভালো রাস্তা, উন্নত চিকিৎসা, শক্তিশালী অর্থনীতি বা ভালো চাকরির সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু একজন মুসলমানের সুখের সংজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক নয়।

পরিবার, ঈমান, মানসিক শান্তি, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং আখিরাত—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়—

“আমি সেখানে কত টাকা উপার্জন করব?”

বরং প্রশ্ন করা উচিত—

“আমি সেখানে কেমন মানুষ হব?”

“আমার সন্তানরা কেমনভাবে বড় হবে?”

“আমি কি সেখানে আল্লাহর ইবাদত ঠিকভাবে করতে পারব?”

“আমার উপার্জন কি হালাল হবে?”

এগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


বিদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য বাস্তব কিছু পরামর্শ

নামাজকে জীবনের কেন্দ্র করুন

কর্মব্যস্ততার কারণে নামাজ বাদ দেওয়া উচিত নয়।

হালাল উপার্জনকে অগ্রাধিকার দিন

শুধু বেশি বেতন নয়; আয়ের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখুন

মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।

সন্তানদের ইসলাম শেখান

বাড়িতে কোরআন, নামাজ, ইসলামী আদব ও নৈতিক শিক্ষা চালু রাখুন।

ভালো প্রতিবেশী হন

অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

আইন মেনে চলুন

আইন ভঙ্গ করে মুসলমানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।

নিজের সংস্কৃতি ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য বুঝুন

প্রতিটি সাংস্কৃতিক রীতি হারাম নয়; আবার প্রতিটি প্রচলিত কাজও ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোনটি ধর্মীয় বিধান আর কোনটি স্থানীয় সংস্কৃতি—তা জ্ঞান দিয়ে বুঝতে হবে।


তাহলে চূড়ান্ত শরিয়তি সিদ্ধান্ত কী?

সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়:

উন্নত দেশে মাইগ্রেশন বা অভিবাসন নিজে হারাম নয়।

একজন মুসলমান বৈধ উদ্দেশ্যে অমুসলিম বা উন্নত দেশে যেতে পারেন এবং সেখানে বসবাস করতে পারেন, যদি—

১. তার উদ্দেশ্য বৈধ হয়;
২. তার দ্বীন ও ঈমান নিরাপদ থাকে;
৩. ফরজ ইবাদত পালন করতে পারেন;
৪. হারাম কাজে জড়িত না হন;
৫. বৈধ পথে দেশটিতে প্রবেশ করেন;
৬. আইন ও বৈধ চুক্তি মেনে চলেন;
৭. নিজের ও পরিবারের ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকেন।

সমকালীন ফিকহি আলোচনাতেও অমুসলিম দেশে বসবাসের বৈধতার ক্ষেত্রে মূলত দ্বীন পালন ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্যদিকে যদি কোনো জায়গায় বসবাসের কারণে একজন মুসলমানের ঈমান ও ফরজ দ্বীন রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং অন্যত্র যাওয়ার সক্ষমতা থাকে, তাহলে স্থানান্তরের বিষয়টি তার জন্য জরুরি হয়ে উঠতে পারে।


উপসংহার

ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবী শুধু মুসলিম ও অমুসলিম দেশের সরল বিভাজনে মানুষের জীবন পরিচালনার একমাত্র মানদণ্ড নয়। বরং মুসলমান কোথায় থাকছেন, কেন থাকছেন, কীভাবে উপার্জন করছেন, তার দ্বীন কতটা নিরাপদ এবং তার পরিবার কীভাবে বেড়ে উঠছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

একজন মুসলমান যদি ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো উন্নত দেশে বৈধভাবে বসবাস করেন এবং সেখানে নিজের ঈমান, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম ও ইসলামী নৈতিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলে শুধু অমুসলিম দেশে বসবাস করার কারণে তাকে শরিয়তবিরোধী বলা যায় না। সমকালীন দারুল ইফতার ফতোয়াতেও এ ধরনের বসবাসকে নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ বলা হয়েছে।

তবে একজন মুসলমানের উচিত বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের উদ্দেশ্য, উপার্জনের পদ্ধতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং আইনগত অবস্থান বিবেচনা করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উন্নত জীবন মানেই শুধু বেশি অর্থ নয়; একজন মুসলমানের প্রকৃত সাফল্য হলো দুনিয়ার বৈধ কল্যাণ অর্জনের পাশাপাশি আখিরাতের সফলতার জন্য ঈমান ও আমলকে নিরাপদ রাখা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:১০০

সুতরাং বৈধ উদ্দেশ্যে, বৈধ পদ্ধতিতে, দ্বীন রক্ষা করে উন্নত দেশে অভিবাসী হওয়া মূলত জায়েজ হতে পারে। আর ব্যক্তির বিশেষ পরিস্থিতিতে হুকুম ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফতোয়ার প্রয়োজন হলে তার বাস্তব পরিস্থিতি একজন যোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে তুলে ধরা উত্তম।

আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।


কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স

  • সূরা আন-নিসা — ৪:৯৭–১০০
  • সূরা আল-বাকারা — ২:১৯৫
  • সূরা আল-মায়িদা — ৫:১
  • সূরা আল-হুজুরাত — ৪৯:১৩
  • সূরা আল-মুমতাহিনা — ৬০:৮
  • সূরা আত-তাহরিম — ৬৬:৬
  • সূরা আলে ইমরান — ৩:১৮৫

হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স

  • সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১ — নিয়ত সম্পর্কিত হাদিস
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৭ — নিয়ত সম্পর্কিত হাদিস
  • সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২০৭২ — নিজের হাতের উপার্জনের মর্যাদা
  • সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৩১৮৯ — “লা হিজরাতা বাদাল ফাতহ”
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩৫৩ — “লা হিজরাতা বাদাল ফাতহ”

গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি সূত্র

সমকালীন মিসরের দারুল ইফতা অমুসলিম দেশে ভ্রমণ ও বসবাসকে ব্যক্তির উদ্দেশ্য, দ্বীন ও নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেছে।

অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে জাল কাগজ, অবৈধ প্রবেশ, অনুমতি ছাড়া অবস্থান এবং জীবনকে অযৌক্তিক ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়গুলোকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে।

২০২৫ সালের একটি ফতোয়ায় অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণকেও নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ বলা হয়েছে, যদি তা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও ফরজ ইবাদতে বাধা সৃষ্টি না করে।

নোট: এটি সাধারণ ইসলামি জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, ব্যক্তিগত ফতোয়া নয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাইগ্রেশন, নাগরিকত্ব বা বিদেশে স্থায়ী বসবাসের বিষয়ে শরিয়তি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি একজন যোগ্য আলেম/মুফতির কাছে তুলে ধরা উচিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

TOP