আল-করানের চ্যালেঞ্জ

আল-কুরআনের চ্যালেঞ্জ

আল-কুরআনের চ্যালেঞ্জ : কল্পনা করুন এমন একটি বই, যা সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারে, আবার এতটাই গভীর যে বিদ্বানরা সারাজীবন এটি নিয়ে গবেষণা করেও শেষ করতে পারেন না। এমন একটি বই, যার শব্দ কখনো পুরোনো হয় না এবং যার সমতুল্য কিছু আজ পর্যন্ত কেউ রচনা করতে পারেনি। সেই বইটি হলো আল-কুরআন।

কুরআন সমগ্র মানবজাতিকে একটি চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। বাইরে থেকে চ্যালেঞ্জটি সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা পূরণ করা অসম্ভব। শত্রুরা যদি এই চ্যালেঞ্জে সফল হতে পারত, তাহলে খুব সহজেই ইসলামকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারত। তখন বদর, উহুদ কিংবা খন্দকের মতো কোনো যুদ্ধেরই প্রয়োজন হতো না।

আমরা এমন এক চ্যালেঞ্জের কথা বলছি, যার জবাব চৌদ্দ শতাব্দী ধরে কেউ দিতে পারেনি এবং যা আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। তাহলে চ্যালেঞ্জটি আসলে কী? চলুন, সেই সময়ে ফিরে যাই।

আরবের নীরবতা ও চ্যালেঞ্জের ধাপসমূহ

আরব ছিল কবিতা ও ভাষার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক ভূমি। সেখানে ছিলেন ভাষার বড় বড় পণ্ডিত আর বাগ্মিতার সম্রাটরা। কিন্তু হঠাৎ একদিন তাঁরা সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। এমনকি তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অহংকারী কণ্ঠটিও ভীত হয়ে পড়ল।

তাঁদের এই নীরবতার কারণ ছিল কুরআনের এই আয়াতগুলো: “তারা কি বলে, সে নিজেই এটি রচনা করেছে? বরং তারা ঈমান আনে না। তারা যদি সত্যবাদী হয়, তবে এর মতো একটি বাণী নিয়ে আসুক।” (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৩–৩৪)

বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: চ্যালেঞ্জে সাড়া দাও, নইলে চিরতরে পরাজয় মেনে নাও।

বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর। যে নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই ওহী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তিনি নিজে পড়তে বা লিখতে জানতেন না। জীবনে কখনো কবিতা বা সাহিত্যচর্চাও করেননি। তবুও আরবরা যে বিষয়ে সবচেয়ে দক্ষ ছিল, তিনি ঠিক সেই বিষয়েই তাদের চ্যালেঞ্জ করলেন।

এই লেখার শেষে আপনি বুঝতে পারবেন, কেন এই চ্যালেঞ্জের জবাব আজও কেউ দিতে পারেনি এবং কেন আল-কুরআন সকল গ্রন্থের মধ্যে অনন্য। তবে তার আগে ভাবুন তো, এই চ্যালেঞ্জের পর কী ঘটেছিল?

কুরআন যতবার তার চ্যালেঞ্জের পুনরাবৃত্তি করছিল, তাদের নীরবতা ততই অপমানজনক হয়ে উঠছিল। শুরুতে তাদের বলা হয়েছিল পুরো কুরআনের সমতুল্য কিছু নিয়ে আসতে। তারা চাইলে অতীতের সব গ্রন্থ ব্যবহার করতে পারত, সব কবি-সাহিত্যিককে একত্র করতে পারত, এমনকি নিজেদের দেবতাদের কাছেও সাহায্য চাইতে পারত।

যখন তারা তা পারল না, তখন বলা হলো অন্তত দশটি সূরার মতো কিছু আনতে (সূরা হূদ, ১১:১৩)। আর তাও না পারলে, অন্তত একটি সূরার মতো কিছু (সূরা আল-বাকারা, ২:২৩)।

কিন্তু তাদের নীরবতা শুধু ব্যর্থতা নয়, বরং লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াল। যে আরবরা নিজেদের ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে গর্ব করত, তাদের জন্য এই নীরবতা ছিল চরম অপমানের। শব্দ দিয়ে মোকাবিলা করতে না পেরে তারা তলোয়ার তুলে নিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হলো।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, এই চ্যালেঞ্জ শুধু মূর্তিপূজারীদের জন্য নয়। পৃথিবীর বহু ধর্ম ও মতবাদ ঐশী উৎসের দাবি করে, কিন্তু কোনো ধর্ম, মতবাদ বা মানুষ এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেনি। বিগত চৌদ্দ শতাব্দীতেও নয়, আজও নয়।

আজ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ ইসলাম অনুসরণ করে। তাহলে কুরআনের কোন বৈশিষ্ট্য একে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে? সত্যিই কি লক্ষ লক্ষ বইয়ের মধ্যে কুরআনের সমকক্ষ কোনো বই নেই?

আলেমরা বলেন, কুরআনের অলৌকিকতার চল্লিশটিরও বেশি দিক রয়েছে। এক লেখায় সবগুলো ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে চলুন, অন্তত চারটি দরজা খুলে দেখি:

  1. কুরআনের শক্তিশালী ও সুন্দর ভাষা
  2. এর বিস্ময়কর গভীরতা ও বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা
  3. শব্দের ধ্বনিগত প্রবাহ
  4. বিশ্বজগতের রহস্য নিয়ে কুরআনের বর্ণনা

প্রথম দরজা: কুরআনের শক্তিশালী ও সুন্দর ভাষা

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কুরআনের একটি মাত্র অক্ষরও অলৌকিকতা বহন করতে পারে? সূরা ইয়াসিনে বলা হয়েছে: “আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলমান। এটি মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ।” (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৮)

এই আয়াতে ‘লিমুস্তাকাররিন’ শব্দের শুরুতে থাকা ‘লাম’ (লি) অক্ষরটি একই বাক্যে তিনটি ভিন্ন অর্থ যোগ করে। ফলে আয়াতটি সূর্য সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

প্রথম অর্থ: কক্ষপথ। সূর্য তার নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে চলছে। আধুনিক গবেষণাও দেখায়, সূর্য মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রকে ঘিরে নিজ কক্ষপথে ঘুরছে।

দ্বিতীয় অর্থ: গন্তব্য। আয়াতটির অনুবাদ এভাবেও হতে পারে: সূর্য তার সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সূর্যের শক্তি একদিন ফুরিয়ে যাবে এবং সে তার শেষ পরিণতি পর্যন্ত চলতেই থাকবে। এটি সূর্যের পারমাণবিক জ্বালানির সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে।

তৃতীয় অর্থ: কারণ ও প্রভাব। সূর্যের গতি তার স্থিতিশীলতার একটি কারণ। এই গতি মহাকর্ষীয় ভারসাম্য তৈরি করে, যার ফলে পৃথিবীসহ গ্রহগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে টিকে থাকে।

তিনটি অর্থ একসঙ্গে বিবেচনা করলে দেখা যায়, আমাদের রব মাত্র একটি অক্ষরের মাধ্যমে সূর্যকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করেছেন। শব্দের এমন শক্তিশালী ব্যবহার কি অলৌকিক নয়?

বিজ্ঞান যা সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কার করছে, কুরআন তা ১৪০০ বছর আগেই বর্ণনা করেছে। একটি অক্ষরে যদি এত অর্থ থাকে, তবে পুরো গ্রন্থের গভীরতা কতখানি, তা কল্পনা করাও কঠিন। পরিচিত কোনো আয়াত পড়ে মনে হয় সবই জানা, কিন্তু হঠাৎ এক নতুন অর্থ চোখের সামনে খুলে যায়। এ যেন চোখের সামনে থাকা গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার মতো।

প্রতিটি শব্দ সর্বোচ্চ প্রজ্ঞায় নির্বাচিত

কুরআনের একটি শব্দও এলোমেলোভাবে বাছাই করা নয়। অগণিত সম্ভাবনার মধ্য থেকে প্রতিটি শব্দ নির্বাচিত হয়েছে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞায়। উদাহরণ হিসেবে এই আয়াতটি দেখুন: “আর যদি তোমার রবের শাস্তির সামান্য একটি ঝাপটাও তাদের স্পর্শ করে…” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৪৬)

আয়াতের বাকি অংশে এই শাস্তির প্রভাব বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে শাস্তির অতি সামান্য অংশের কথা বলেই এর ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, এই আয়াতের প্রায় প্রতিটি শব্দই ক্ষুদ্র, হালকা বা সামান্য কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে।

‘লা-ইন’ (যদি): ঘটনাটি কখন ঘটবে তা নিশ্চিত করে না বলে ‘যদি’-র মতো একটি অনিশ্চয়তাসূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

‘মাসসা’ (স্পর্শ করা): শাস্তি সরাসরি তাদের ওপর আপতিত হওয়ার কথা না বলে শুধু ‘স্পর্শ’ করার কথা বলা হয়েছে।

‘নাফহাহ’ (মৃদু ঝাপটা): অর্থাৎ শাস্তির একটি মৃদু ঝাপটাও তাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে। কষ্ট বা যন্ত্রণা বোঝাতে কোনো ভারী শব্দ নয়, বরং আরবি ভাষার সবচেয়ে হালকা শব্দগুলোর একটি বেছে নেওয়া হয়েছে।

‘রব’ (প্রতিপালক): আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশক কোনো নাম ব্যবহার না করে ‘রব’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ যিনি লালন-পালন করেন। এই নামটি করুণার অনুভূতি বহন করে।

অর্থাৎ প্রতিটি শব্দই মূল উদ্দেশ্য পূরণে সর্বোত্তম বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শাস্তির একটি মৃদু ঝাপটাই যদি ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট হয়, তবে পূর্ণ শাস্তি কতটা ভয়াবহ হবে? এটি সত্যিই এক অনন্য ভাষাশৈলী।

যা বলা হয়নি, তাতেও প্রজ্ঞা

হাজারো আলেম ব্যাখ্যা করেছেন, কুরআনের প্রতিটি শব্দ কতটা যত্নের সঙ্গে নির্বাচিত। কুরআনে শুধু যা বলা হয়েছে তা-ই নয়, যা বলা হয়নি সেখানেও রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। যেমন এই আয়াতটি: “আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আল-বাকারা, ২:৫)

এখানে মুমিনদের সাফল্যের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্য কী, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। ফলে আয়াতটি সব ধরনের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। কারও কাছে সাফল্য মানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি, কারও কাছে জান্নাতে প্রবেশ। কারও কাছে সাফল্য হলো পরকালে আল্লাহর দর্শন লাভ, আবার কারও কাছে দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তি।

পাঁচ বছর পর হয়তো আপনার কাছে সাফল্যের অর্থ বদলে যাবে। এভাবেই আয়াতটি বারবার আপনার আশাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, যেন প্রথমবার পড়ছেন। আর এ জন্য কুরআন কোনো অতিরিক্ত বাক্য, শব্দ বা অক্ষর ব্যবহার করেনি, শুধু একটি উন্মুক্ত অর্থবহ শব্দ বেছে নিয়েছে।

এই তিনটি উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, কুরআনের প্রতিটি শব্দ ও বর্ণ গভীর ও বিস্তৃত অর্থ বহন করে। তাহলে পূর্ণ বাক্য ও আয়াতগুলো কত গভীর অর্থ প্রকাশ করে? এ কারণেই কুরআনের ওপর হাজার হাজার তাফসির গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

দ্বিতীয় দরজা: বিস্ময়কর গভীরতা ও বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা

বিস্তৃত বিষয়বস্তু বলতে বোঝায়, কুরআনের আলোচনা শুধু নামাজ বা ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎ থেকে শুরু করে মানুষের মনস্তত্ত্ব পর্যন্ত আপনাকে নিয়ে যায়। এতে সমাজ, আইন, কূটনীতি, বিজ্ঞান, এমনকি মাথার ওপরের আকাশের তারা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

কুরআন অতীত জাতিগুলোর কাহিনি বলে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও সংবাদ দেয়, যার অনেকগুলো ইতোমধ্যে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মহাবিশ্বের সৃষ্টি থেকে বিচার দিবস, এমনকি মৃত্যুর পরের অনন্ত জীবন পর্যন্ত সবকিছু সম্পর্কে এটি আমাদের জানায়।

পরিবার-সম্পর্কিত কোনো আয়াত ভালোবাসা ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে পথনির্দেশ দেয়। আরেকটি আয়াত সুদ নিষিদ্ধ করে, যা মেনে চললে অর্থনৈতিক জুলুম দূর হয়। ঘৃণা, হিংসা ও বর্ণবাদের মতো সমস্যারও সমাধান দিয়েছে কুরআন। শত শত বছর পরেও মানুষ যেসব সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়নি, কুরআন কয়েকটি আয়াতেই তার পথ দেখিয়েছে।

যতবারই এই গ্রন্থ খুলবেন, নতুন কিছু পাবেন, আর প্রতিবারই কুরআন আপনাকে আরও বেশি দেবে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এর বিষয়বস্তু গভীর হলেও উপস্থাপন এতটাই সহজ যে যে-কেউ বুঝতে পারে। অন্য কোনো বইয়ে কি এমন ব্যাপকতা খুঁজে পাবেন?

তিনজন বিশেষজ্ঞের কথা ভাবুন: একজন আইনশাস্ত্রে জীবন উৎসর্গ করেছেন, একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানে, আর তৃতীয়জন মনোবিজ্ঞানে। প্রত্যেকেই নিজ ক্ষেত্রে তুখোড়। কিন্তু আপনি আইনজীবীকে মহাবিশ্বের রহস্য ব্যাখ্যা করতে বলবেন না, কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে মানুষের মনের গভীরতা মাপতে বলবেন না।

এটাই মানুষের মৌলিক সীমাবদ্ধতা। অথচ কুরআন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যায়, মানুষ কুরআনের নতুন নতুন অর্থ উপলব্ধি করে। পৃথিবীর সবকিছু সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়, কিন্তু কুরআন যেন আরও প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

অথচ যে নবী (সা.) আমাদের কাছে এই কুরআন পৌঁছে দিয়েছেন, তিনি নিজে পড়তে বা লিখতে জানতেন না (সূরা আল-আনকাবূত, ২৯:৪৮)। সুতরাং আবারও স্পষ্ট হয়, কেউ এই গ্রন্থের সমতুল্য কিছু আনতে পারবে না। এত কিছু ধারণ করার পরেও কুরআন কোনো নীরস বিশ্বকোষের মতো শোনায় না।

তৃতীয় দরজা: শব্দের ধ্বনিগত প্রবাহ

কুরআনের শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে এক শক্তিশালী ধ্বনিগত প্রবাহ। যেমন সূরা আল-আনআমে বলা হয়েছে: “আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করতে চান, তার অন্তরকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে দেন, যেন সে কষ্ট করে আকাশে আরোহণ করছে।” (সূরা আল-আনআম, ৬:১২৫)

আয়াতটি শুনলে মনে হয় কেউ যেন শ্বাস নিতে লড়াই করছে। ‘ইয়াস্সা”আদু’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে কণ্ঠে সেই কষ্ট অনুভূত হয়। মজার বিষয় হলো, তখনকার মানুষ জানত না যে ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতায় উঠলে অক্সিজেন কমে যায় এবং শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ একই আয়াতে লুকিয়ে আছে একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতাও।

সূরা আল-কামারের উদাহরণও বিবেচনা করুন। সূরাটিতে ৫৫টি আয়াত রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি আয়াত ‘র’ (রা) অক্ষরে শেষ হয়েছে। আরবিতে ‘কামার’ মানে চাঁদ, আর আরবি ‘র’ (ر) অক্ষরের আকৃতি দেখলে বাঁকা চাঁদের কথাই মনে পড়ে।

আরেকটি সুপরিচিত উদাহরণ সূরা আন-নাস। এই সূরায় শয়তানের গোপন কুমন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে, আর এর আয়াতগুলোর উচ্চারণ শুনলে মনে হয় যেন কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে। শয়তান যেভাবে গোপনে হৃদয়ে কুমন্ত্রণা দেয়, শব্দের উচ্চারণেই যেন তা অনুভব করা যায়।

কুরআনের ধ্বনিগত সৌন্দর্য একটি স্বতন্ত্র গবেষণার ক্ষেত্র। কেউ সন্দেহ পোষণ করলে মাত্র পাঁচ মিনিট মনোযোগ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুনলেই নিজের হৃদয়ে তা অনুভব করবেন।

এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা পুরো কুরআন শতবার পড়েছেন, তবুও বিরক্ত হননি। প্রতিবারই তাঁরা আধ্যাত্মিক আনন্দ নিয়ে নতুন করে শুরু করেন। অন্য কোনো বই কি এভাবে বারবার একই আগ্রহ নিয়ে পড়া যায়? কিছুদিন পরেই ক্লান্তি বা বিরক্তি চলে আসবে।

বিষয়টি শুধু পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার পুরো কুরআন মুখস্থ করেছেন, এমনকি পাঁচ বছরের শিশুরাও তা মুখস্থ করছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আল্লাহ কুরআন সাজিয়েছেন আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত অক্ষর ও শব্দ দিয়েই। কিন্তু এমন নিখুঁতভাবে সাজিয়েছেন যে ভাষার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, এটি কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না।

চতুর্থ দরজা: কুরআনে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক বিষয়

এবার সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক, কুরআনের কোন আয়াতে কোন বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে।

সূরা ও আয়াতবিষয়
আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ
আল-হাদিদ, ৫৭:২৫লোহা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়া
আয-যুমার, ৩৯:৬মাতৃগর্ভে তিন স্তরের অন্ধকারে শিশুর বিকাশ
আন-নূর, ২৪:৪০গভীর সমুদ্রের স্তরে স্তরে অন্ধকার
আন-নাবা, ৭৮:১২বায়ুমণ্ডলের স্তরসমূহ
আল-আনআম, ৬:১২৫উচ্চতায় বাতাসের চাপ ও অক্সিজেন কমে যাওয়া
আন-নাহল, ১৬:৬৮মধু উৎপাদনকারী মৌমাছি স্ত্রী-জাতীয়
আর-রাদ, ১৩:৩উদ্ভিদে পুরুষ ও স্ত্রী জোড়ার অস্তিত্ব
আল-আরাফ, ৭:৫৭মেঘের ওজন
আল-কিয়ামাহ, ৭৫:৪আঙুলের ছাপের অনন্যতা
আল-হিজর, ১৫:২২বায়ুর মাধ্যমে মেঘ সঞ্চার ও বৃষ্টি

এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক দৃষ্টান্ত।

ইতিহাসে অ্যারিস্টটল একটি সুপরিচিত নাম, যিনি বহু মানুষকে প্রভাবিত করেছেন। তিনি বিজ্ঞানের নানা শাখায় কথা বলেছেন, কিন্তু তাঁর অনেক ধারণাই আধুনিক বিজ্ঞানে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অথচ কুরআন সেই ভুল ধারণাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেনি।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক আইজ্যাক নিউটনও স্থির মহাবিশ্বের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে, ঠিক যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, শত শত বছর ধরে অগণিত বিজ্ঞানী একটি পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। অবশেষে চূড়ায় পৌঁছে তাঁরা দেখলেন, কুরআন শুরু থেকেই সেখানে ছিল।

উপসংহার

আল-কুরআনে কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকাই প্রমাণ করে যে এর সমকক্ষ আর কিছু নেই। কেউ যদি মনে করেন এটি নিছক মানুষের রচনা, তবে এমন একটি গ্রন্থ নিয়ে আসুন, যার প্রতিটি অক্ষরে কুরআনের মতো গভীরতা রয়েছে।

যেহেতু আল-কুরআন প্রকাশ্যে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করছে, তাই কুরআনেরই একটি আয়াত দিয়ে শেষ করছি: “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না, নাকি তাদের অন্তরে তালা লাগানো রয়েছে?” (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২৪)

পরবর্তী পর্ব: মৃত্যুর পরের জীবন

“আমাকে এখান থেকে বের করো!” “মান রব্বুকা? (তোমার রব কে?)”

পৃথিবীর শেষ দিন, কিয়ামতের দিন, জান্নাত ও জাহান্নাম… ধাপে ধাপে আমরা মৃত্যুর পরের জীবনকে এমনভাবে তুলে ধরব, যেন আমরা নিজেরাই সেই মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মৃত্যুর ঠিক আগের শেষ কয়েক সেকেন্ডে কী ঘটবে? কবরে আমরা কোন প্রশ্নের মুখোমুখি হব?

যেদিন পৃথিবীর শেষ দিন হবে, কিংবা যখন পুনরুত্থিত হয়ে সবাই হাশরের ময়দানে একত্রিত হব, সেদিন আমাদের অভিজ্ঞতা কেমন হবে? জান্নাত ও জাহান্নামে মানবজাতির জন্য কী অপেক্ষা করছে? মৃত্যুর পরের চিরস্থায়ী জীবন নিয়ে আপনার সব প্রশ্নের উত্তর থাকবে এই ধারাবাহিকে। প্রস্তুত থাকলে চলুন শুরু করি।

মৃত্যুর মুহূর্ত

যে দিনটি থেকে আপনি সারাজীবন পালিয়ে বেড়িয়েছেন, সেই দিনটি আজ উপস্থিত। যে দিনের কথা আপনি কখনো ভাবতেও চাননি, আজ সেই দিনেই আপনার ঘুম ভাঙল। আর তখনই মৃত্যুর ফেরেশতা আপনার দিকে এগিয়ে আসছেন।

চারদিকে ঘন অন্ধকার, ভোর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত। বুকের ব্যথা যেন আজ আপনাকে শেষ করে দেবে। শরীর নড়াচড়া করতে পারছে না, মনে প্রচণ্ড অস্থিরতা।

আপনার শৈশব, যৌবন আর বর্তমান পরিচয়, সবকিছু যেন এক ঝলকে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আপনি হাঁপাচ্ছেন, প্রাণপণে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, মনে হচ্ছে গলায় কিছু একটা আটকে আছে। “আমার এমন লাগছে কেন?” আপনি বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত, চারপাশে কী ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছেন না।

হঠাৎ আপনজনেরা আপনার চারপাশে জড়ো হলো। একজন আপনার হাত শক্ত করে ধরে আছেন, অন্যরা অশ্রুসিক্ত চোখে দোয়া পড়ছেন। কেউ আপনাকে পানি খাওয়াতে চাইছেন, কিন্তু তাঁর হাত কাঁপছে। তাঁদের চোখেমুখে অসহায়ত্ব আর বিষণ্নতা, চেহারায় নিঃশব্দ বিদায়ের ছায়া।

আপনার মনে হচ্ছে সময় যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। চারপাশের শব্দগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন পৃথিবী নিঃশব্দে আপনাকে বিদায় জানাচ্ছে। যেমনটি আল-কুরআনে বলা হয়েছে: “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)

আপনার চিন্তাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে, শরীরের নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। গলায় আটকে থাকা শ্বাসে পুরো দেহ যেন অবশ হয়ে পড়ছে। সেই মুহূর্তে মনে একটিই ভাবনা: মৃত্যুর পর কী ঘটবে? এই সময়কে বলা হয় সাকারাতুল মাউত, অর্থাৎ মৃত্যুযন্ত্রণার মুহূর্ত (সূরা ক্বাফ, ৫০:১৯)। আর ঠিক তখনই শুরু হয় শয়তানের সর্বশেষ আক্রমণ।

আপনি কি তখন ঈমান ধরে রাখতে পারবেন? নাকি অনেক হতভাগার মতো শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে ঈমানও হারিয়ে ফেলবেন? শরীরের পেশিগুলো শক্তি হারাচ্ছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, গায়ের রং ফ্যাকাশে ও নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক এই মুহূর্তেই শয়তান আপনার কাছে আসে।

প্রিয় নবী (সা.) প্রায়ই এই দোয়া করতেন: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, চাপা পড়া, পানিতে ডোবা ও আগুনে পোড়া থেকে। আর আশ্রয় চাই মৃত্যুর সময় শয়তান যেন আমাকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।” (সুনানে আবু দাউদ, ১৫৫২)

সেই মুহূর্তে শয়তানের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, আপনি যেন ঈমানহারা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।