দুই বিপরীত মেরুর মানুষ: আবু জাহেল ও ওমর ইবনুল খাত্তাব

আবু জাহেলের প্রকৃত নাম ছিল আমর ইবনে হিশাম। তাঁকে আলাদা করত তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও সম্পদ—মানুষ তাঁকে ডাকত ‘আবুল হাকাম’, অর্থাৎ জ্ঞানের পিতা। কিন্তু সত্যের প্রতি তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধ। এই অন্ধত্ব আর মুসলিমদের ওপর তাঁর নির্মম নির্যাতনই তাঁকে আল্লাহর কাছে পরিণত করল ‘আবু জাহেল’-এ—অজ্ঞতার পিতা।

অন্যদিকে ওমর ইবনুল খাত্তাবকে চেনা যেত তাঁর প্রজ্ঞা, যুক্তিবোধ, সাহস আর ন্যায়পরায়ণতায়। তবু ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে কঠোর বিরোধীদের একজন। মুসলিমদের প্রতি তাঁর আচরণ ছিল ভয়াবহ নিষ্ঠুর—তিনি নারী সাহাবী লুবাইনাহ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নির্যাতন করতেন শুধু ইসলাম গ্রহণের অপরাধে। মারতে মারতে ক্লান্ত হলে থেমে বলতেন, “মনে করো না আমি দয়া দেখাচ্ছি, শক্তি ফিরে পেলে আবার শুরু করব, তুমি ইসলাম না ছাড়া পর্যন্ত থামব না।”

দুজনেই ইসলামের প্রতি সমান শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন। তবু রাসূলুল্লাহ ﷺ আশা ছাড়েননি; তাঁর রহমত এতটাই গভীর ছিল যে এই কঠোর হৃদয়ের মানুষদের জন্যও হেদায়েতের দোয়া করেছিলেন।

আবিসিনিয়ার পথে: প্রথম হিজরত

মক্কায় মুসলিমরা যখন চরম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন সাহাবীদের ডেকে বললেন, “তোমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহ আবার তোমাদের একত্র করবেন।” সাহাবীরা জানতে চাইলেন কোথায় যাবেন। তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন—”ওখানে,” সমুদ্রের ওপারের সেই ভূখণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে। “আবিসিনিয়ার রাজার শাসনে কারও ওপর জুলুম হয় না, ওটি ন্যায়ের ভূমি। আশা করা যায়, সেখানে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বস্তি রাখবেন।”

এভাবেই ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত সংঘটিত হলো আবিসিনিয়ায়—বর্তমান ইথিওপিয়া। রজব মাসে ১৫ জন সাহাবী শোয়াইবাহ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করলেন সেই কাঙ্ক্ষিত ভূমির উদ্দেশ্যে। একবার ভাবুন—নিজের প্রিয়জন, ঘর, জন্মভূমি ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দেওয়া কতটা কঠিন ছিল! কিন্তু সাহাবীদের কাছে দ্বীনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই ছিল না।

প্রথম দলের কয়েক মাস পর দ্বিতীয় একটি দলও রওনা হলো, এবার নেতৃত্বে ছিলেন জাফর ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। এই দলে ছিলেন ১০১ জন, যাদের মধ্যে ১৮ জন নারী। যারা মক্কায় থেকে গেলেন, তাঁদের অবস্থাও ছিল আরও কঠিন। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে? তিনি হিজরতকারীদের দলে ছিলেন না—যেখানে বিপদ সবচেয়ে তীব্র, তিনি ছিলেন ঠিক সেখানেই, সামনের সারিতে, নিরবচ্ছিন্ন হত্যাচেষ্টার ঝুঁকি নিয়েও নিজের দায়িত্ব থেকে কখনো পিছু হটেননি। পরে মদিনায় হিজরতেও তিনি ছিলেন সর্বশেষদের একজন।

কুরাইশের ষড়যন্ত্র ও দারুন নাদওয়ার বৈঠক

প্রথম দলটিকে কুরাইশরা প্রথমে তেমন পাত্তা দেয়নি—”আমরাই তো চাইছিলাম ওদের থেকে মুক্তি পেতে,” বলে তারা উদাসীন থেকেছে। কিন্তু ক্রমাগত মানুষ আবিসিনিয়ায় চলে যেতে দেখে তাদের মনে ভয় জাগল—যদি আবিসিনিয়ার মানুষও ইসলাম গ্রহণ করে? যদি সাহাবীরা সেখানে এমন শক্তি পেয়ে যান যা আর থামানো যাবে না?

আতঙ্কিত হয়ে তারা জড়ো হলো দারুন নাদওয়ায়—দারুল আরকামের ঠিক বিপরীত এক জায়গা, যেখানে আলোর বদলে ষড়যন্ত্রের অন্ধকার ছড়াত। সিদ্ধান্ত হলো, চালাকি আর প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতেই হবে। এই দায়িত্বে পাঠানো হলো দক্ষ কূটনীতিক আমর ইবনুল আসকে, যিনি নাজাশিকে আগে থেকেই ভালোভাবে চিনতেন এবং জানতেন কীভাবে দরবারের মন জয় করতে হয়।

আমর ইবনুল আস বনাম জাফর ইবনে আবি তালিব

মূল্যবান উপহার নিয়ে আমর প্রথমে দরবারের কর্মকর্তাদের পক্ষে টেনে নিলেন, যাতে রাজা সরাসরি মুসলিমদের কথা না শোনেন। এরপর নাজাশির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এই মানুষেরা আমাদের ধর্মও ছেড়েছে, আপনার ধর্মেও ঢোকেনি; তারা মরিয়ম-তনয় ঈসা আলাইহিস সালামকে ইলাহ মানে না—তাই তাদের আমাদের হাতে তুলে দিন।

কিন্তু নাজাশি ছিলেন প্রজ্ঞাবান শাসক। উপহারে প্রভাবিত না হয়ে তিনি মুসলিমদের নিজ মুখে কথা বলার সুযোগ দিলেন। জাফর ইবনে আবি তালিব সাহস ও সত্যনিষ্ঠা নিয়ে দাঁড়ালেন। প্রথমে তিনটি প্রশ্নে প্রমাণ করলেন তাঁরা কোনো অপরাধী নন—না পলাতক দাস, না রক্তপাতকারী, না কারও সম্পদ আত্মসাৎকারী।

তারপর তিনি বর্ণনা করলেন ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের অন্ধকার—মূর্তিপূজা, অশ্লীলতা, দুর্বলের ওপর জুলুম—এবং কীভাবে আল্লাহ তাঁদের মাঝ থেকেই এক সৎ, বিশ্বস্ত নবী পাঠিয়েছেন, যিনি শিখিয়েছেন সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা, আত্মীয়তার বন্ধন এবং প্রতিবেশীর অধিকার। এই বার্তা গ্রহণ করার কারণেই তাঁদের নিজ স্বজনরা তাঁদের ওপর নির্যাতন শুরু করে, আর সেই কারণেই তাঁরা দেশত্যাগ করে নাজাশির ন্যায়বিচারের আশ্রয়ে এসেছেন।

সূরা মারিয়াম ও নাজাশির অশ্রু

নাজাশি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁদের নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ওহী এনেছেন কি না। জাফর তখন সূরা মারিয়ামের প্রথম কয়েক আয়াত তেলাওয়াত করলেন—নবী জাকারিয়া, ইয়াহিয়া এবং মরিয়ম আলাইহিমুস সালামের কাহিনি। খ্রিস্টান রাজা ও তাঁর যাজকেরা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, আর প্রতিটি আয়াতের সাথে তাঁদের চোখ ভিজে উঠল। নাজাশি বলে উঠলেন, “নিঃসন্দেহে এটা একই উৎস থেকে এসেছে, যে উৎস থেকে ঈসা আলাইহিস সালামকে দেওয়া হয়েছিল।”

এরপর তিনি আমর ইবনুল আস ও তাঁর সঙ্গীর দিকে ফিরে দৃঢ়স্বরে বললেন— “এখনই বেরিয়ে যাও, দুজনেই! আল্লাহর কসম, আমি কখনোই তাদের তোমাদের হাতে তুলে দেব না। আর কেউ তাদের স্পর্শও করতে পারবে না।”

আমর ইবনুল আস চূর্ণ-বিচূর্ণ এক পরাজয় স্বীকার করল। তার সব চেষ্টা শেষ হয়ে নিরাশায় ভরে গেল তার হৃদয়। রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে তার ভেতরটা আগুন হয়ে উঠল। সে কিছুতেই এভাবে হাল ছেড়ে দিতে চাইল না, সে ভাবল—

“এখানেই শেষ নয়।”

আমর জানত, খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস ওয়াসাল্লামকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বা ইলাহ মনে করে। অন্যদিকে ইসলামে তাকে মানা হয় আল্লাহর একজন মহান বান্দা ও রাসুল হিসেবে। আমর ভেবেছিল, জাফরের মুখ থেকে যখন রাজা শুনবেন যে মুসলিমরা ঈসা (আঃ)-কে খোদা মানেন না, তখন খ্রিস্টান রাজা হিসেবে নাজাশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন এবং মুসলিমদের তার দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবেন।

সাহাবীরা যখন শুনলেন রাজা তাদের আবার ডেকেছেন এবং ঈসা আলাইহিস ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তাদের আকীদা জানতে চেয়েছেন, তখন তাদের মধ্যে কিছুটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল।

কেউ কেউ বললেন—

“আমরা কি রাজাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কিছুটা ঘুরিয়ে কথা বলব?”

কিন্তু জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) দৃঢ়তার সাথে বললেন—

“আল্লাহর কসম! আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের যা শিখিয়েছেন, আমরা সত্যটাই বলব। এতে ফলাফল যাই হোক না কেন, আমরা সত্য থেকে এক চুলও সরব না।”

সাহাবীরা পুনরায় রাজার দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রাজা নাজাশি জাফর (রাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন—

“ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে তোমাদের নবী ও তোমাদের ধর্ম কী বলে?”

পুরো দরবার তখন নিস্তব্ধ। কুরাইশ দূত আমর ইবনুল আস এক কোণে দাঁড়িয়ে বিজয়ের হাসি হাসার জন্য অপেক্ষা করছিল।

জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) অত্যন্ত শান্ত ও স্পষ্ট কণ্ঠে জবাব দিলেন—

“আমরা তাঁর সম্পর্কে সেটাই বলি, যা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন। আমরা বলি—তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসুল, তাঁর রুহ, এবং তাঁর সেই ‘কালেমা’ (বাণী), যা তিনি কুমারী ও পবিত্র সাধ্বী নারী মারিয়ামের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।”

কথাগুলো শুনে রাজা নাজাশি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর তিনি মাটি থেকে একটি ছোট্ট কাঠি বা তিলক তুলে নিলেন। দরবারের যাজকদের দিকে তাকিয়ে এবং পরে জাফরের দিকে ফিরে অত্যন্ত আবেগভরে বললেন—

“আল্লাহর কসম! তোমরা ঈসা (আঃ) সম্পর্কে যা বললে, তিনি এর চেয়ে এই একটি কাঠির পরিমাণও বেশি বা কম ছিলেন না! তোমরা যা বলেছ, সেটাই সত্য।”

রাজার এই কথা শুনে তাঁর দরবারের খ্রিস্টান যাজক ও পাদ্রিরা অসন্তোষে ফোঁসফোঁস করে উঠল। কিন্তু নাজাশি তাদের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন এবং সাহাবীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন—

“তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকো। যে তোমাদের গালি দেবে বা কষ্ট দেবে, তাকে জরিমানা করা হবে। আমাকে যদি সোনার পাহাড়ও দেওয়া হয়, তাও আমি তোমাদের কাউকে কষ্ট দেব না।”

এরপর রাজা নাজাশি কুরাইশ দূত আমর ইবনুল আসের আনা সমস্ত মূল্যবান উপহারসামগ্রী ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন—

“এদের উপহার এদের ফিরিয়ে দাও! আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহ যখন আমাকে এই রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তিনি আমার কাছ থেকে কোনো ঘুষ নেননি। তবে আমি কেন আল্লাহর বান্দাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেব?”

আমর ইবনুল আস এবং তার সঙ্গী চরম অপমানিত ও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলো। তাদের সব চক্রান্ত ধুলোয় মিশে গেল, আর আবিসিনিয়ায় সাহাবীদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হলো।


এভাবেই ইসলামের প্রথম হিজরত পরিণত হলো এক ন্যায়বিচারের বিজয়গাথায়—যেখানে সত্যের কণ্ঠস্বর, ধৈর্য আর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা জয়ী হয়েছিল ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার বিরুদ্ধে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

TOP