ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে ‘গাজওয়ায়ে বদর’ বা বদরের যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত ছিল না; এটি ছিল সত্য ও অসত্যের (হক ও বাতিল) মধ্যকার প্রথম অসীম সাহসিকতার পরিচয় এবং বিশ্বাসের এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি যখন সবেমাত্র রচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এমন এক মহাসংগ্রামের, যা চিরতরে পরিবর্তন করে দিয়েছিল আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃশ্যপট।
১. মদিনার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা
মদিনায় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত গোয়েন্দা ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছিলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মদিনা শহরের সম্ভাব্য যেকোনো বিপজ্জনক অবস্থা সম্পর্কে পূর্বেই সতর্ক হওয়া এবং চারপাশের শত্রুভাবাপন্ন এলাকার রাজনৈতিক ও সামরিক সংবাদের খোঁজ রাখা।
হিজরতের দ্বিতীয় বছরে এই শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এসে পৌঁছায়—আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মক্কার কুরাইশরা এক বিশাল বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে ফিরছে।
এখানে একটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন: এই কাফেলাটি কিন্তু শুধুই তাদের নিজস্ব অর্জিত পণ্য দিয়ে গঠিত ছিল না। হিজরতের সময়ের করুণ ঘটনার কথা স্মরণ করুন। মুসলিমরা যখন অত্যাচারিত হয়ে মক্কা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন নিজেদের অর্জিত সকল ঘরবাড়ি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ মক্কাতেই ফেলে আসতে হয়েছিল। পরবর্তীতে কুরাইশরা জোরপূর্বক সেসব সম্পদ দখল করে নেয় এবং এই বাণিজ্যিক কাফেলায় যুক্ত করে বিপুল অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে বিক্রি করতে পাঠায়। অর্থাৎ, মুমিনদের রক্ত পানি করা কষ্টার্জিত সম্পদই তাদের শত্রুদের হাতে অস্ত্র ও অর্থ হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছিল।
এমনকি হিজরতের তীব্র সংকটের মুহূর্তেও রহমত ও ন্যায়ের প্রতীক রাসূলুল্লাহ (সা:) মুশরিকদের গচ্ছিত আমানতের কথা ভোলেননি; সেগুলো তাদের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ কুরাইশরা এমন নৈতিকতার ছিটেফোঁটাও দেখায়নি। তারা মুহাজিরদের সমস্ত সম্পদ অকাতরে দখল করেছিল।
এবার সময় এসেছিল মুশরিকদের এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়ার যে—প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে! যেসব অত্যাচারী মুসলিমদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তাদের বোঝানো জরুরি ছিল যে তারা আর যা খুশি তা-ই করতে পারবে না। অন্যায়ের শারীরিক প্রতিরোধ না করলে জালেম কখনো থামে না। তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলাটির গতিবিধি লক্ষ্য করতে একজন গোয়েন্দা পাঠালেন।
২. অভিযানের আহ্বান ও সাহাবীদের অভূতপূর্ব ত্যাগ
গোয়েন্দা সংবাদ পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“যাদের আরোহণের জন্য পশু রয়েছে, তারা যেন চড়ে আমাদের সাথে অভিযানে অংশ নেয়।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সাথে সম্ভাব্য মোকাবেলার সার্বিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। সাহাবায়ে কেরাম এই অভিযানে অংশ নিতে এতটাই ব্যাকুল ছিলেন যে, অনেক পরিবারে পিতা ও পুত্রের মধ্যে লটারি করতে হয়েছিল কে অভিযানে যাবে আর কে ঘরে থাকবে! তাদের প্রত্যেকের একটাই আকাঙ্ক্ষা ছিল—আল্লাহর পথে শাহাদাতের সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করা।
অল্প সময়ের মধ্যেই ৩১৩ জনের একটি বাহিনী সমবেত হলো। তাদের মধ্যে বেশ কিছু কিশোর ও কমবয়সী তরুণও উপস্থিত ছিল। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা অতিরিক্ত কমবয়সী ছিল, তাদের সেনাদলে যোগ দেওয়ার অনুমতি না দিয়ে ভালোবেসে মদিনায় ফেরত পাঠালেন।
১৬ বছরের তরুণ সেনানী: উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা:)
সেই তরুণদের মধ্যে উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা:) নামে ১৬ বছরের এক কিশোরও ছিল। কম বয়স সত্ত্বেও তার হৃদয়ে ছিল শাহাদাতের তীব্র তামান্না। সে নিজেকে অন্য সাহাবীদের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছিল, যেন রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর চোখে না পড়ে এবং তাকে ফেরত না পাঠানো হয়। কিন্তু কোমলহৃদয় নবীজির চোখ এড়ানো সম্ভব হয়নি। তিনি তাকে ডেকে বললেন, “তোমাকেও ফিরে যেতে হবে।”
উমাইর ছিল খাটো গড়নের, আর তখন পর্যন্ত সে কখনো কোমরে তলোয়ারও বাঁধেনি। কিন্তু তার ছোট দেহে ছিল পর্বতের মতো অটল সাহস। রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে ফিরিয়ে দিতে চাইলে উমাইর কান্নায় ভেঙে পড়ে। এই তরুণ যোদ্ধার চোখের পানি ও অবিচল দৃঢ়তা দেখে রাহমাতুললিল আলামীন শেষ পর্যন্ত তাকে বাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেন।
অনুমতি পাওয়া মাত্রই তার বড় ভাই সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা:) পরম স্নেহে ছোট ভাইয়ের কোমরে তলোয়ার বেঁধে দিলেন। উমাইর যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন, খাটো হওয়ার কারণে তার তরবারিটি মাটিতে ঘষে ঘষে দাগ ফেলে যাচ্ছিল। আর সেই অদম্য তরুণই পরবর্তীতে বদরের যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করে জান্নাতবাসী হন।
পারিবারিক দায়িত্ব ও ত্যাগ
ঠিক এই ঐতিহাসিক মুহূর্তেই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় কন্যা হযরত রুকাইয়াহ (রা:) কঠিন অসুস্থতায় ভুগছিলেন। কন্যা গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে নবীজি নিজে অভিযানে যাওয়া থেকে বিরত হননি। তবে তিনি তাঁর জামাতা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা:)-কে মদিনায় রেখে যান স্ত্রীর সেবাশুশ্রূষা করার জন্য।
৩. বদরের অভিমুখে যাত্রা ও নবীজির বিনয়
যাবতীয় প্রস্তুতি শেষে ৩১৩ জনের এই ঈমানী কাফেলা প্রখর রোদের মধ্য দিয়ে বদরের দিকে যাত্রা শুরু করল। বদর এলাকাটি কয়েকটি পানির কূপের জন্য সুপরিচিত ছিল এবং বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো পানীয় জলের সংস্থানের জন্য প্রায়শই এই পথ ব্যবহার করত।
মুসলিম বাহিনীর সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল চরম। পুরো বাহিনীর জন্য আরোহী পশু ছিল মাত্র ২টি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলী (রা:) এবং মারছাদ ইবনে আবী মারছাদ (রা:)—এই তিনজন একটি উট পালাক্রমে চড়তেন।
যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাঁটার পালা আসত, তখন অন্য দুই সাহাবী আকুল হয়ে বলতেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি উটে উঠুন, আপনার বদলে আমরা হেঁটে যাব।”
কিন্তু সাম্য ও ইনসাফের প্রতীক বিশ্বনবী (সা:) হেসে জবাব দিতেন,
“হাঁটার শক্তিতে তোমরা আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও, আর তোমাদের মতোই আমারও আল্লাহর রহমত ও সওয়াবের প্রয়োজন রয়েছে।”
দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন—অনেকের পায়ে জুতো পর্যন্ত নেই, তারা তপ্ত বালুর ওপর খালি পায়ে হাঁটছে। নবীজির হৃদয় কেঁদে উঠল। তিনি হাত তুলে রবের দরবারে দোয়া করলেন:
“হে আল্লাহ! এই সৈনিকদের বহন করার মতো কোনো বাহন নেই, আপনি তাদের বাহনের ব্যবস্থা করুন। হে আল্লাহ! এদের পায়ে পরার মতো জুতো নেই এবং এরা ভীষণ ক্ষুধার্ত; আপনি তাদের পোশাক, খাদ্য ও শক্তির সংস্থান করে দিন।”
তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলেন সত্যি, কিন্তু তাদের আত্মায় জ্বলছিল ঈমানের এক আলোকশিখা।
৪. কুরাইশদের অহংকার ও যুদ্ধপ্রস্তুতি
মুসলিম বাহিনী এগোচ্ছে শুনে আবু সুফিয়ান অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ল। সে ভালো করেই জানত যে পথেই মুসলিমরা তাকে ঘিরে ধরতে পারে। সে কালবিলম্ব না করে একজন দ্রুতগামী দূতকে মক্কায় পাঠাল এবং নিজে কাফেলার পথ পরিবর্তন করে লোহিত সাগরের উপকূলীয় নিরাপদ পথ ধরে এগিয়ে গেল।
মক্কায় পৌঁছে সেই দূত জামাকাপড় ছিঁড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“হে কুরাইশবাসীরা! মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তোমাদের বাণিজ্য কাফেলায় হামলা করতে আসছে। তোমাদের ধন-সম্পদ লুটে যাবে! দ্রুত আবু সুফিয়ানের সাহায্যে বেরিয়ে পড়ো!”
এই খবরে মক্কাজুড়ে এক চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হলো, কারণ প্রায় প্রতিটি কুরাইশ পরিবারের অর্থ সেই কাফেলায় খাাটানো ছিল। তারা অতি দ্রুত ১,০০০ জন যোদ্ধার এক সুবিশাল বাহিনী গড়ে তুলল। এতে ছিল ১০০ জন সুসজ্জিত অশ্বারোহী এবং ৭০০টি উট। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল ইসলামের চরম শত্রু আবু জাহেল। (তবে আবু লাহাব অসুস্থতার অজুহাতে নিজে না গিয়ে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে পাঠায়)।
কুরাইশ বাহিনী ঢাক-ঢোল ও বাজনা বাজিয়ে অহংকারের সাথে বদরের দিকে এগোতে লাগল। পথিমধ্যে আবু সুফিয়ানের বার্তা এসে পৌঁছাল:
“কাফেলা ও মালামাল নিরাপদে মক্কায় পৌঁছে গেছে। তাই তোমরা মক্কায় ফিরে এসো।”
কাফেলা নিরাপদ হওয়ায় কুরাইশ বাহিনীর অনেকেই যুদ্ধ না করে ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দম্ভ ও হিংসায় অন্ধ আবু জাহেল তা হতে দিল না। সে বলল:
“আমরা কখনোই ফিরব না! আমরা বদরে যাব, সেখানে তিন দিন অবস্থান করব, উট জবাই করব, মদ্যপান করব এবং দাসীরা আমাদের বিনোদন দেবে। পুরো আরব বিশ্ব জানুক আমাদের ক্ষমতা কতটা, যাতে তারা চিরকাল কুরাইশদের ভয় করে চলে!”
৫. পরম পরামর্শ ও সাহাবীদের অবিচল ঈমান
কুরাইশদের সুসজ্জিত বিশাল বাহিনী বদরের দিকে আসছে এবং বাণিজ্যিক কাফেলা হাতছাড়া হয়ে গেছে—এই সংবাদ পেয়ে মহানবী (সা:) সাহাবীদের নিয়ে এক জরুরী পরামর্শ সভা (শূরা) ডাকলেন।
প্রথমে মুহাজিরদের পক্ষ থেকে হযরত মিকদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ (রা:) দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক বক্তব্য দিলেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! আমরা বনি ইসরাইলের মতো বলব না, যারা মুসাকে বলেছিল—’তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে থাকি।’ বরং আমরা আপনার ডান-বাম, সামনে-পেছনে থেকে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত যুদ্ধ করব। আপনার রব আপনাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন, আপনি তা-ই করুন; আমরা আপনার সঙ্গেই আছি।”
এই কথা শুনে নবীজি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তবে তিনি মদিনার আনসারদের মতামতও জানতে চাইলেন, কারণ আকাবার বায়আতে তারা মদিনার ভেতরে নবীজিকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু মদিনার বাইরে এসে তারা যুদ্ধ করবে কি না, তা জানা প্রয়োজন ছিল।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আনসারদের নেতা হযরত সাদ ইবনে মুআজ (রা:) দাঁড়িয়ে আবেগপ্লুত কণ্ঠে বললেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি এবং আপনার আনুগত্যের দৃঢ় অঙ্গীকার করেছি। আপনি যদি আমাদের নিয়ে এই সাগরেও ঝাঁপ দিতে বলেন, আমরা দ্বিধাহীনভাবে আপনার সাথে সাগরে ঝাঁপ দেব! আমাদের একজন লোকও পেছাবে না। আল্লাহ আজ্জাওয়াজাল আপনাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন, আপনি তা-ই পালন করুন।”
সাহাবীদের এই অবিচল ও অতুলনীয় ঈমানী দৃঢ়তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল উদ্বেগ দূর হয়ে গেল। তিনি খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে বললেন:
“সুসংবাদ নাও! আল্লাহ তাআলা আমাকে দুটি বিষয়ের একটির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—বাণিজ্য কাফেলা অথবা স্পষ্ট বিজয়। আল্লাহর কসম! আমি যেন এখনই দেখতে পাচ্ছি শত্রুরা কোথায় কোথায় নিহত হয়ে লুটিয়ে পড়বে!”
৬. রণকৌশল ও হুবাব ইবনে আল-মুনযির (রা:)-এর পরামর্শ
বদরের প্রান্তরে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নির্দিষ্ট স্থানে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। তখন যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ তরুণ সাহাবী হযরত হুবাব ইবনে আল-মুনযির (রা:) বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! এখানে শিবির স্থাপন কি ওহীর নির্দেশ, নাকি এটি আপনার নিজস্ব সামরিক কৌশল?”
রাসূলুল্লাহ (সা:) জবাব দিলেন, “এটি ওহী নয়, আমার নিজস্ব সামরিক কৌশল।”
তখন হুবাব (রা:) একটি অসাধারণ প্রস্তাব দিলেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! তবে এটি উপযুক্ত স্থান নয়। চলুন আমরা কুরাইশদের সবচেয়ে কাছের পানির কূপটির কাছে গিয়ে অবস্থান নিই। সেখানে একটি বড় জলাধার তৈরি করে আমরা পানি জমা করব এবং পেছনের বাকি সব কূপ বন্ধ করে দেব। এর ফলে যুদ্ধের সময় আমরা পর্যাপ্ত পানি পাব, অথচ শত্রুরা এক ফোটা পানির জন্যও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়বে।”
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো দ্বিধা ছাড়াই এই তরুণ সাহাবীর চমৎকার পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেন। এটি ছিল উম্মতের জন্য এক মহান শিক্ষা—নেতা হওয়া সত্ত্বেও যোগ্য পরামর্শকে সম্মান জানানোর আদর্শ।
এরপর নবীজি যুদ্ধক্ষেত্র সাজালেন। তিনি সৈনিকদের সুনির্দিষ্ট সারিতে দাঁড় করালেন—পেছনে তীরন্দাজ এবং সামনে বর্ষাধারীদের অবস্থান দিলেন। তিনি কঠোর নির্দেশ দিলেন:
“আমার নির্দেশ ছাড়া কেউ আক্রমণ করবে না। শত্রু অনেক নিকটে না এলে অযথা তীর ছুড়ে তীর নষ্ট করবে না। তলোয়ার শুধু মুখোমুখি সরাসরি লড়াইয়ে ব্যবহার করবে।”
৭. রবের দরবারে মোনাজাত ও আসমানী সাহায্য
যুদ্ধের আগের রাতে পুরো মুসলিম বাহিনী যখন বিশ্রামে ঘুমাচ্ছিল, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারারাত জেগে সেজদায় ক্রন্দনরত অবস্থায় রবের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছিলেন:
“হে আল্লাহ! আপনার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ! আজ যদি এই ক্ষুদ্র মুমিন দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কেয়ামত পর্যন্ত এই পৃথিবীতে আপনার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না!”
নবীজির এই আকুল প্রার্থনার জবাবে আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে অবতীর্ণ করলেন সূরা আল-আনফালের ৯ম আয়াত:
“(স্মরণ করো) যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলে, তখন তিনি সাড়া দিয়েছিলেন—’আমি তোমাদের এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করব, যারা একের পর এক আসবে।'”
আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশ্বস্ত বান্দাদের একা ফেলে দেননি; ফেরেশতাদের অদৃশ্য বাহিনী পাঠিয়ে মুমিনদের হৃদয়কে প্রশান্ত ও শক্তিশালী করেছিলেন।
৮. ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ (মুবারাযাহ)
১৭ই রমজান, ১৭ই মার্চ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ। দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। কাফেরদের ৯৫০ জনের বিপরীতে ৩১৩ জন মুসলিম। একদিকে অহংকার ও গান-বাজনার গর্জন, অন্যদিকে শুধু তাকবিরের ধ্বনি—“আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!”
তৎকালীন আরবের যুদ্ধের রীতি অনুযায়ী মূল যুদ্ধ শুরুর আগে দ্বিমুখী লড়াই বা ‘মুবারাযাহ’ অনুষ্ঠিত হতো।
কুরাইশদের পক্ষ থেকে তাদের সবচেয়ে নামকরা তিন যোদ্ধা—উতবা ইবনে রাবিয়াহ, তার ভাই শাইবা এবং ছেলে ওয়ালিদ অহংকার নিয়ে সামনে এলো। আনসারদের মধ্য থেকে আউফ, মুআওয়েজ ও আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) তাদের মোকাবিলা করতে গেলে উতবা ব্যঙ্গ করে বলল, “হে মুহাম্মদ! এদের সরিয়ে আমাদের সমকক্ষ কুরাইশদের পাঠাও!”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিজ পরিবারের তিনজনকে ডাকলেন:
১. হযরত হামযাহ ইবনে আবদিল মুত্তালিব (রা:)
২. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা:)
৩. হযরত উবায়দাহ ইবনে আল-হারিছ (রা:)
মুহূর্তের মধ্যেই দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হলো। চোখের পলকে হযরত হামযাহ (রা:) শাইবাকে এবং হযরত আলী (রা:) ওয়ালিদকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। তবে প্রবীণ উবায়দাহ (রা:) এবং উতবার মধ্যে কঠিন লড়াই হচ্ছিল এবং দুজনই মারাত্মক আহত হন। তখন হামযাহ ও আলী (রা:) এগিয়ে গিয়ে উতবাকে খতম করেন এবং রক্তাক্ত উবায়দাহ (রা:)-কে উদ্ধার করে নবীজির তাঁবুতে নিয়ে আসেন।
প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে হযরত উবায়দাহ (রা:) শাহাদাতের কোলে ঢলে পড়ার মুহূর্তে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি শহীদের মর্যাদা পেয়েছি?”
নবীজি বললেন, “হ্যাঁ, আপনি নিশ্চিতভাবে শহীদ।” এক তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি ইন্তেকাল করলেন।
৯. মূল যুদ্ধ ও আবু জাহেলের পরিণতি
নিজদের প্রধান তিন বীরের করুণ মৃত্যু দেখে কুরাইশরা থমকে গেল। আবু জাহেল চিৎকার করে বাহিনীকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করল এবং পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের নির্দেশ দিল।
শুরু হলো সর্বাত্মক যুদ্ধ। স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তলোয়ার হাতে সাহাবীদের সাথে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছিলেন। হযরত আলী (রা:) পরবর্তীতে বলেছিলেন,
“বদরের দিন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা:)। তিনি শত্রুর এত কাছাকাছি ছিলেন যে আমরা তাঁর আড়ালে আশ্রয় নিতাম।”
হযরত হামযাহ, হযরত আলী ও হযরত ওমর (রা:)-এর তলোয়ারের আঘাতে কাফেরদের সারি তছনছ হয়ে যেতে লাগল।
আবু আল-বাখতারীর ঘটনা
যুদ্ধের পূর্বে নবীজি নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন আবু আল-বাখতারীকে হত্যা না করা হয়, কারণ মক্কায় বয়কটের সময় সে মুসলিমদের গোপনে সাহায্য করেছিল। নবীজি তার সেই উপকারের কৃতজ্ঞতা ভুলে যাননি।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে যখন সাহাবী মুজাজ্জির (রা:) তাকে হত্যা না করে এড়িয়ে যেতে চাইলেন, তখন আবু আল-বাখতারী জেদ ধরে আক্রমণ চালায়। বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে মুজাজ্জির (রা:) তাকে হত্যা করেন।
আবু জাহেলের পতন
অবশেষে অহংকারী আবু জাহেলের পরিণতি নেমে এলো। আনসারদের দুই অতি তরুণ ভাই—মুআজ ইবনে আফরা (রা:) এবং মুআজ ইবনে আমর (রা:) আবু জাহেলকে চিনে নিয়ে তার ওপর বাজপাখির মতো ঝাপিয়ে পড়ল এবং তাকে মাটিতে ফেলে মারাত্মকভাবে আহত করল। পরবর্তীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) তার শিরচ্ছেদ করে সত্যের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করেন।
১০. বিজয়ের মহিমান্বিত সমাপ্তি
যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমুঠো ধুলো ও বালি হাতে নিয়ে শত্রুপক্ষের দিকে ছুড়ে মেরে বললেন—“শাহাতিল উজুহ” (চেহারাগুলো বিকৃত হোক)। মহান আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে সেই বালি প্রতিটি কাফেরের চোখে গিয়ে আঘাত করল। চরম বিশৃঙ্খলা ও আতঙ্কে কুরাইশ বাহিনী রণাঙ্গন ছেড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে শুরু করল।
- কাফেরদের ক্ষয়ক্ষতি: ৭০ জন নিহত (যার মধ্যে আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা অন্তর্ভুক্ত) এবং ৭০ জন বন্দি।
- মুসলিমদের শাহাদাত: মাত্র ১৪ জন সাহাবী (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাতের অমিয় পিয়ালা পান করেন।
উপসংহার: বদর যুদ্ধের শিক্ষা
বদরের যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বিজয়ের মূল চাবিকাঠি সৈন্য সংখ্যা বা অস্ত্রের আধুনিকতায় নয়, বরং খাঁটি ঈমান, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার মধ্যে নিহিত।
আজকের যুগেও যদি মুসলিম উম্মাহ বদরের সেই সাহাবীদের মতো ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রিত হতে পারে, তবে মহান আল্লাহর নুসরাত ও বিজয় আজও সুনিশ্চিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের বদরের সাহাবায়ে কেরামের ঈমানী ত্যাগ ও শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।


আলহামদুলিল্লাহ এমন ইসলামিক ইতিহাস জানার আনন্দই অন্যরকম ।
নবী মুহাম্মদ ﷺ কি কোরআন নিজেই রচনা করেছিলেন? এই মিথ্যাচারের কঠিন জবাব!
নবী মুহাম্মদ ﷺ কি কোরআন নিজেই রচনা করেছিলেন? এই মিথ্যাচারের কঠিন জবাব!