আবিসিনিয়ায় হিজরত

ইসলামের প্রথম হিজরত , রাসূল ﷺ-এর ঐতিহাসিক দোয়া, জাফর ইবনে আবি তালিবের সাহসী ভাষণ, এবং নাজাশির ন্যায়বিচারের পূর্ণ বিবরণ।

“হে আল্লাহ! এই দুজনের মধ্যে যে আপনার কাছে বেশি প্রিয়, তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন—আবু জাহেল অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাব।” (জামে তিরমিজি, ৩৬৮১)

এই দোয়াটি করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল ﷺ, মক্কার সেই কঠিনতম দিনগুলোতে। নবুয়তের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। দিনরাত অক্লান্ত দাওয়াত, অপমান সহ্য, পাথরের আঘাত আর বয়কটের হুমকির পরও মুসলিমদের সংখ্যা তখনও হাতে গোনা। সীরাত গ্রন্থের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী তাঁরা ছিলেন মাত্র শখানেক কিংবা তার কিছু বেশি। ঈমানের দৃঢ়তায় তাঁরা পুরো মক্কার চেয়েও বলীয়ান, কিন্তু সংখ্যায় ও প্রভাবে নিতান্তই দুর্বল।

ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ সবসময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করে। একজন নেতৃস্থানীয় মানুষ সত্য গ্রহণ করলে তাঁর পেছনে বহু মানুষ সাহস পায়। তাই সময় এসেছিল মক্কার এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে ইসলামের ছায়াতলে আনার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার। আর রাসূল ﷺ বেছে নিলেন এমন দুজনকে, যাঁরা তখন ইসলামের সবচেয়ে কঠোর শত্রু।

দুই বিপরীত মেরুর মানুষ: আবু জাহেল ও ওমর ইবনুল খাত্তাব

আবু জাহেলের প্রকৃত নাম ছিল আমর ইবনে হিশাম। বুদ্ধিমত্তা, বাগ্মিতা ও সম্পদের কারণে কুরাইশের লোকেরা তাকে সম্মান করে ডাকত ‘আবুল হাকাম’, অর্থাৎ প্রজ্ঞার পিতা। কিন্তু সত্যের প্রশ্নে সে ছিল সম্পূর্ণ অন্ধ। অহংকার, গোত্রীয় হিংসা এবং মুসলিমদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে মুসলিমদের কাছে সে পরিচিত হয়ে উঠল ‘আবু জাহেল’ নামে—অজ্ঞতার পিতা। জ্ঞানের অধিকারী হয়েও যে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, তার জন্য এর চেয়ে যথার্থ উপাধি আর কী হতে পারে?

অন্যদিকে ওমর ইবনুল খাত্তাব ছিলেন প্রজ্ঞা, যুক্তিবোধ, সাহস আর ন্যায়পরায়ণতার জন্য সুপরিচিত। কুরাইশের দূত হিসেবে বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে আলোচনায় তাঁকেই পাঠানো হতো। অথচ ইসলামের প্রথম দিনগুলোতে তিনিই ছিলেন মুসলিমদের অন্যতম কঠোর প্রতিপক্ষ। সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত আছে, বনু মুআম্মিল গোত্রের দাসী লুবাইনাহ ইসলাম গ্রহণ করলে ওমর তাঁকে নির্মমভাবে প্রহার করতেন। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে থামলে বলতেন, “ভেবো না দয়া করে থেমেছি; ক্লান্ত হয়েছি বলে থেমেছি।”

দুজনেই ইসলামের প্রতি সমান শত্রুভাবাপন্ন। তবু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের ব্যাপারে আশা ছাড়েননি। তিনি তাঁদের ধ্বংস কামনা করেননি, বরং হেদায়েতের দোয়া করেছেন। এখানেই নববী চরিত্রের মহত্ত্ব: শত্রুর জন্যও কল্যাণের প্রার্থনা। পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করেছে, আল্লাহ এই দোয়া কবুল করেছিলেন ওমরের ক্ষেত্রে। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই কঠোর মানুষটি পরিণত হলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রক্ষকে, আর তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলিমরা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কাবার পাশে নামাজ আদায়ের সাহস পেলেন।

নির্যাতনের মক্কা: কেন হিজরতের প্রয়োজন হলো

নবুয়তের পঞ্চম বছরে মক্কায় মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে। বিলাল ইবনে রাবাহকে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দেওয়া হতো। আম্মার ইবনে ইয়াসিরের পরিবারকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হতো, আর এই নির্যাতনেই শহীদ হন সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা, ইসলামের প্রথম শহীদ। দুর্বল, দাস ও আশ্রয়হীন মুসলিমদের জন্য মক্কা হয়ে উঠেছিল এক উন্মুক্ত কারাগার।

এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের এক নতুন পথের সন্ধান দিলেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বললেন, “তোমরা যদি আবিসিনিয়ায় চলে যাও, সেখানে এমন এক রাজা আছেন, যাঁর রাজ্যে কারও প্রতি জুলুম করা হয় না। সেটি সত্যের ভূমি। আল্লাহ তোমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তির পথ না করা পর্যন্ত সেখানে থাকো।”

আবিসিনিয়ার পথে: ইসলামের প্রথম হিজরত

এভাবেই সংঘটিত হলো ইসলামের ইতিহাসের প্রথম হিজরত, আবিসিনিয়ায়, যা বর্তমান ইথিওপিয়া ও তার আশপাশের অঞ্চল। নবুয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাসে প্রথম দলটি গোপনে শুয়াইবা বন্দর থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করে। সীরাত গ্রন্থ অনুযায়ী এই দলে ছিলেন বারোজন পুরুষ ও চারজন নারী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উসমান ইবনে আফফান এবং তাঁর স্ত্রী, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা।

একবার ভাবুন সেই দৃশ্য। রাতের অন্ধকারে চুপিসারে ঘর ছাড়ছেন কিছু মানুষ। পেছনে পড়ে থাকছে বাবা-মা, ভাই-বোন, ব্যবসা, সম্পদ আর জন্মভূমির স্মৃতি। সামনে অচেনা সমুদ্র, অজানা ভাষা, অপরিচিত মানুষ। কোনো নিশ্চয়তা নেই, কোনো আশ্বাস নেই, আছে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা। এই ত্যাগই প্রমাণ করে, সাহাবীদের কাছে দ্বীনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই ছিল না।

কিছুদিন পর দ্বিতীয় ও বৃহত্তর দলটি রওনা হলো। এবার দলে ছিলেন প্রায় তিরাশি জন পুরুষ এবং আঠারো-উনিশজন নারী, যাঁদের মুখপাত্র ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। কুরাইশের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে এত বড় দল নিয়ে যাত্রা করা ছিল আরও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।

আর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে? তিনি হিজরতকারীদের সঙ্গে যাননি। যেখানে বিপদ সবচেয়ে তীব্র, তিনি রয়ে গেলেন ঠিক সেখানেই—মক্কার বুকে, শত্রুর মাঝখানে, প্রতিদিনের হত্যাচেষ্টার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। দায়িত্ব থেকে তিনি কখনো পিছু হটেননি। পরবর্তীকালে মদিনায় হিজরতের সময়ও তিনি ছিলেন সর্বশেষদের একজন। প্রকৃত নেতা নিজে নিরাপদে থেকে অনুসারীদের বিপদে ঠেলে দেন না; বরং অনুসারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজে থাকেন সামনের সারিতে।

কুরাইশের ষড়যন্ত্র: আবিসিনিয়ায় দূত প্রেরণ

প্রথম দিকে কুরাইশরা ব্যাপারটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তাদের ধারণা ছিল, কিছু ঝামেলাপূর্ণ মানুষ শহর ছেড়ে গেছে, ভালোই হয়েছে। কিন্তু যখন একের পর এক দল আবিসিনিয়ায় পাড়ি দিতে লাগল, তখন তাদের মনে আতঙ্ক জাগল। যদি সেখানে মুসলিমরা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে? যদি আবিসিনিয়ার রাজা ও জনগণ তাদের পক্ষে দাঁড়ায়? যদি এই নতুন ধর্ম মক্কার সীমানা পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হয়?

কুরাইশ নেতারা তাদের পরামর্শসভায় বসে সিদ্ধান্ত নিল, যেভাবেই হোক মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতে হবে। এই দায়িত্বে পাঠানো হলো দুজন অভিজ্ঞ দূতকে: আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিআহ। আমর ছিলেন কুরাইশের সবচেয়ে ধুরন্ধর কূটনীতিকদের একজন। বাণিজ্যের সূত্রে নাজাশি ও তাঁর দরবারের সঙ্গে আগে থেকেই তাঁর পরিচয় ছিল, এবং তিনি জানতেন কীভাবে দরবারের মন জয় করতে হয়।

দরবারে চক্রান্ত: আমর ইবনুল আসের কৌশল

উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা, যিনি নিজেও এই হিজরতে অংশ নিয়েছিলেন, পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, দূতেরা মক্কা থেকে নিয়ে গিয়েছিল আবিসিনিয়ার মানুষের প্রিয় উপহার, বিশেষ করে উৎকৃষ্ট চামড়া। রাজার সঙ্গে দেখা করার আগে তারা দরবারের প্রত্যেক প্রধান যাজক ও কর্মকর্তাকে আলাদা করে উপহার দিল এবং অনুরোধ করল, রাজা যেন মুসলিমদের কোনো কথা না শুনেই তাদের হাতে তুলে দেন।

এরপর তারা নাজাশির সামনে উপস্থিত হয়ে বলল, “হে রাজা! আমাদের দেশের কিছু নির্বোধ যুবক আপনার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা নিজেদের জাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে, অথচ আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা এমন এক নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছে, যা আমরাও চিনি না, আপনিও চেনেন না। তাদের গোত্রের নেতারা আমাদের পাঠিয়েছেন তাদের ফিরিয়ে নিতে।” উপহারপ্রাপ্ত যাজকেরা সঙ্গে সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলল, তাদের ফিরিয়ে দেওয়াই উচিত।

কিন্তু নাজাশি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই প্রজ্ঞাবান ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। উপহার বা চাটুকারিতায় প্রভাবিত না হয়ে তিনি রেগে বললেন, “না, আল্লাহর কসম! যারা আমার আশ্রয়ে এসেছে, আমার দেশে উঠেছে এবং অন্য সবার ওপর আমাকে বেছে নিয়েছে, তাদের কথা না শুনে আমি কাউকে তাদের হাতে তুলে দেব না।” তিনি মুসলিমদের দরবারে ডেকে পাঠালেন।

জাফর ইবনে আবি তালিবের ঐতিহাসিক ভাষণ

রাজার ডাক পেয়ে মুসলিমরা পরামর্শে বসলেন। রাজার সামনে কী বলবেন? সিদ্ধান্ত হলো, পরিণাম যা-ই হোক, রাসূলুল্লাহ ﷺ যা শিখিয়েছেন, তা-ই বলা হবে। মুখপাত্র হিসেবে দাঁড়ালেন জাফর ইবনে আবি তালিব।

কিছু বর্ণনায় এসেছে, জাফর প্রথমে আমরের কাছে তিনটি প্রশ্ন রাখলেন: আমরা কি কারও পলাতক দাস? আমরা কি কারও রক্ত ঝরিয়েছি? আমরা কি কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছি? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে আমরকে স্বীকার করতে হলো, না। এভাবেই প্রমাণিত হলো, মুসলিমরা অপরাধী নন; তাঁদের একমাত্র “অপরাধ” তাঁদের বিশ্বাস।

এরপর জাফর রাজাকে উদ্দেশ করে যে ভাষণ দিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তব্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বললেন, “হে রাজা! আমরা ছিলাম অজ্ঞ এক জাতি। আমরা মূর্তিপূজা করতাম, মৃত পশু খেতাম, অশ্লীলতায় লিপ্ত থাকতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতাম, আর আমাদের মধ্যে শক্তিশালীরা দুর্বলকে গ্রাস করত।”

“এমন অবস্থায় আল্লাহ আমাদের মাঝ থেকেই একজন রাসূল পাঠালেন, যাঁর বংশ, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা আমরা ভালো করেই জানি। তিনি আমাদের আহ্বান জানালেন এক আল্লাহর ইবাদত করতে এবং আমাদের ও আমাদের পূর্বপুরুষদের পূজিত পাথর ও মূর্তি পরিত্যাগ করতে। তিনি আদেশ দিলেন সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে এবং অন্যায় রক্তপাত ও হারাম থেকে বিরত থাকতে।”

“আমরা তাঁকে বিশ্বাস করেছি এবং তাঁর আনীত বার্তা অনুসরণ করেছি। এ কারণেই আমাদের জাতি আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, নির্যাতন চালাল এবং আমাদের ধর্ম থেকে ফিরিয়ে মূর্তিপূজায় নিতে চাইল। যখন তারা আমাদের ওপর জুলুমের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আমরা আপনার দেশে চলে এলাম, অন্য সবার ওপর আপনাকে বেছে নিলাম এবং আপনার আশ্রয়ে থাকতে চাইলাম। হে রাজা! আমরা আশা করি, আপনার কাছে আমাদের ওপর জুলুম করা হবে না।”

সূরা মারিয়াম ও নাজাশির অশ্রু

নাজাশি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের নবী আল্লাহর কাছ থেকে যা এনেছেন, তার কিছু কি তোমার কাছে আছে?” জাফর বললেন, “হ্যাঁ।” রাজা বললেন, “আমাকে পড়ে শোনাও।”

জাফর তখন তিলাওয়াত শুরু করলেন সূরা মারিয়ামের প্রথম অংশ:

كهيعص ۝ ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا

অর্থ: “কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ। এটি তোমার প্রতিপালকের সেই রহমতের বিবরণ, যা তিনি তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি করেছিলেন।” (সূরা মারিয়াম, ১৯:১–২)

নবী জাকারিয়ার বার্ধক্যে সন্তান লাভের প্রার্থনা, ইয়াহিয়ার জন্ম, আর মারিয়ামের পবিত্রতা ও ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্মের কাহিনি যখন দরবারে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হলো। উম্মে সালামার বর্ণনা অনুযায়ী, নাজাশি এমনভাবে কাঁদলেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল, আর তাঁর যাজকেরাও এত কাঁদলেন যে তাঁদের সামনে খোলা ধর্মগ্রন্থ ভিজে গেল।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নাজাশি বললেন, “নিশ্চয়ই এই বাণী এবং ঈসা যা নিয়ে এসেছিলেন, তা একই আলোর উৎস থেকে নির্গত।” এরপর তিনি দুই কুরাইশ দূতের দিকে ফিরে বললেন, “তোমরা চলে যাও! আল্লাহর কসম, আমি কখনোই এদের তোমাদের হাতে তুলে দেব না।”

অনেক মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, কুরআনের এই আয়াতে সত্য শুনে অশ্রুসিক্ত হওয়া যে খ্রিস্টানদের কথা বলা হয়েছে, নাজাশি ও তাঁর সঙ্গীরা তাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: “আর তারা যখন রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বাণী শোনে, তখন তুমি দেখবে, সত্য চিনতে পারার কারণে তাদের চোখ অশ্রুতে উপচে পড়ছে।” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮৩)

“এখানেই শেষ নয়”: আমরের দ্বিতীয় চাল

প্রথম দিনের পরাজয় আমর ইবনুল আসকে দমাতে পারল না। দরবার থেকে বেরিয়ে অপমানে ও ক্ষোভে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, আগামীকাল এমন কথা বলবেন, যাতে মুসলিমদের মূল উপড়ে যায়। তাঁর সঙ্গী আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিআহ, যিনি তুলনামূলক নরম মনের ছিলেন, বললেন, “এমন করো না। তারা আমাদের বিরোধিতা করলেও আমাদেরই আত্মীয়।” কিন্তু আমর তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

আমর জানতেন, খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামকে ঈশ্বরের পুত্র বা উপাস্য মনে করে, অথচ ইসলামে তিনি আল্লাহর একজন মহান বান্দা ও রাসূল। তাঁর হিসাব ছিল সরল: রাজা যখন জাফরের মুখে শুনবেন যে মুসলিমরা ঈসাকে ঈশ্বর মানেন না, তখন একজন খ্রিস্টান শাসক হিসেবে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন এবং মুসলিমদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবেন।

পরদিন আমর রাজার কাছে গিয়ে বললেন, “হে রাজা! এরা ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে এক ভয়ংকর কথা বলে। তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করুন।”

সত্যের প্রশ্নে আপসহীন জাফর

রাজা আবার ডেকেছেন এবং ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তাঁদের বিশ্বাস জানতে চেয়েছেন—এই খবরে সাহাবীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ল। উম্মে সালামা বলেন, এর আগে এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তাঁদের সামনে আসেনি। তাঁরা পরস্পর আলোচনা করলেন, রাজা যদি জিজ্ঞেস করেন, কী উত্তর দেওয়া হবে?

সিদ্ধান্ত ছিল দৃঢ় ও আপসহীন: “আল্লাহর কসম! আল্লাহ যা বলেছেন এবং আমাদের নবী ﷺ যা নিয়ে এসেছেন, আমরা সেটাই বলব, ফলাফল যা-ই হোক।” এখানে কৌশলের নামে সত্যকে বিকৃত করার কোনো সুযোগ ছিল না। আশ্রয় হারানোর ঝুঁকি, বিতাড়নের আশঙ্কা, এমনকি মক্কায় ফিরে আবার নির্যাতনের সম্ভাবনা—সব জেনেও তাঁরা সত্যের ওপর অবিচল থাকলেন।

দরবারে প্রবেশ করতেই নাজাশি গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “ঈসা ইবনে মারিয়াম সম্পর্কে তোমরা কী বলো?” পুরো দরবার নিস্তব্ধ। আমর ইবনুল আস হয়তো বিজয়ের মুহূর্তের অপেক্ষায়।

জাফর শান্ত ও স্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “আমরা তাঁর সম্পর্কে সেটাই বলি, যা আমাদের নবী ﷺ নিয়ে এসেছেন: তিনি আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল, তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত রূহ এবং তাঁর সেই বাণী, যা তিনি কুমারী ও পবিত্র মারিয়ামের প্রতি প্রেরণ করেছিলেন।”

একটি কাঠির সমানও কম-বেশি নয়

উত্তর শুনে নাজাশি মাটিতে হাত বাড়িয়ে একটি ছোট কাঠি তুলে নিলেন। তারপর বললেন, “আল্লাহর কসম! তুমি যা বললে, ঈসা ইবনে মারিয়াম তার চেয়ে এই কাঠিটুকুও বেশি ছিলেন না।”

রাজার এই ঘোষণায় চারপাশের যাজক ও সভাসদেরা অসন্তোষে গুঞ্জন তুলল। কিন্তু নাজাশি দৃঢ়ভাবে বললেন, “তোমরা অসন্তুষ্ট হলেও এটাই সত্য।” এরপর মুসলিমদের উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন, “যাও, তোমরা আমার দেশে সম্পূর্ণ নিরাপদ। যে তোমাদের গালি দেবে, তাকে জরিমানা করা হবে। সোনার পাহাড়ের বিনিময়েও আমি তোমাদের কাউকে কষ্ট দিতে চাই না।”

এরপর তিনি দূতদের সব উপহার ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন, “এদের উপহার এদের ফিরিয়ে দাও, আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহ যখন আমাকে আমার রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন তিনি আমার কাছ থেকে কোনো ঘুষ নেননি; তাহলে আমি কেন তাঁর ব্যাপারে ঘুষ নেব?”

কুরাইশের দুই দূত চরম অপমান ও ব্যর্থতা নিয়ে দরবার ছাড়ল। তাদের সব চক্রান্ত ধুলোয় মিশে গেল। উম্মে সালামা বলেন, এরপর তাঁরা আবিসিনিয়ায় সর্বোত্তম প্রতিবেশীর সান্নিধ্যে, সর্বোত্তম আশ্রয়ে বসবাস করতে লাগলেন।

ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়

এই ঘটনার পরিণতি আরও বিস্ময়কর। যে আমর ইবনুল আস একসময় মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতে আবিসিনিয়ায় গিয়েছিলেন, তিনি নিজেই পরে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মিসর বিজয়ের মহান সেনাপতিতে পরিণত হন। বর্ণনা আছে, তাঁর ইসলাম গ্রহণে নাজাশির উপদেশেরও ভূমিকা ছিল। আর নাজাশি, যাঁর আসল নাম ছিল আসহামা, তিনি নিজেও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানান এবং তাঁর জন্য গায়েবানা জানাজার নামাজ আদায় করেন। (সহিহ বুখারি, ১২৪৫)

প্রথম হিজরতের শিক্ষা

আবিসিনিয়ার হিজরত কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি প্রতিটি যুগের মুসলিমের জন্য শিক্ষার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার।

প্রথমত, দ্বীন রক্ষার জন্য ত্যাগ। সাহাবীরা ঘর, সম্পদ ও প্রিয়জন ছেড়েছেন, কিন্তু ঈমান ছাড়েননি। বিশ্বাসের মূল্য তাঁদের কাছে জীবনের সব আরামের চেয়ে বেশি ছিল।

দ্বিতীয়ত, সত্যের প্রশ্নে আপসহীনতা। রাজাকে খুশি করার সুযোগ ছিল, কথা ঘুরিয়ে বলার পথ খোলা ছিল। কিন্তু জাফর ও তাঁর সঙ্গীরা সত্যকে সামান্যও বিকৃত করেননি। আর আল্লাহ সেই সত্যবাদিতাকেই তাঁদের নিরাপত্তার মাধ্যম বানিয়ে দিলেন।

তৃতীয়ত, ন্যায়বিচারের সর্বজনীন মূল্য। নাজাশি মুসলিম ছিলেন না, তবু তাঁর ন্যায়পরায়ণতার কারণেই রাসূল ﷺ তাঁর দেশকে আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ন্যায় যেখানেই থাকুক, তা সম্মানের যোগ্য।

চতুর্থত, শত্রুর জন্যও হেদায়েতের আশা। যে আমর মুসলিমদের ফিরিয়ে নিতে এসেছিলেন, যে ওমর মুসলিমদের প্রহার করতেন, তাঁরাই পরে হয়ে উঠলেন ইসলামের অগ্রসেনানী। মানুষের হৃদয় আল্লাহর হাতে; তাই কারও ব্যাপারে চূড়ান্ত হতাশ হওয়ার অধিকার আমাদের নেই।

উপসংহার

এভাবেই ইসলামের প্রথম হিজরত পরিণত হলো ন্যায়বিচার ও সত্যের এক বিজয়গাথায়। একদিকে ছিল কুরাইশের অর্থ, উপহার, কূটনীতি আর প্রোপাগান্ডা; অন্যদিকে ছিল কিছু নিঃস্ব, আশ্রয়প্রার্থী মানুষের সত্যনিষ্ঠ কণ্ঠ আর আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা। বিজয়ী হলো সত্য।

আজকের পৃথিবীতেও যখন সত্য বলার মূল্য দিতে হয়, যখন সুবিধার জন্য নীতি বিসর্জনের প্রলোভন আসে, তখন জাফর ইবনে আবি তালিবের সেই দৃঢ় উচ্চারণ আমাদের পথ দেখায়: পরিণাম যা-ই হোক, সত্যই বলব। আর নাজাশির দরবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো শাসক ইতিহাসে চিরকাল সম্মানিত থাকেন।

মহান আল্লাহ আমাদের সাহাবীদের মতো ঈমানের দৃঢ়তা, জাফরের মতো সত্যবাদিতা এবং নাজাশির মতো ন্যায়পরায়ণতা দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র

১. জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৬৮১ (ওমর বা আবু জাহেলের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করার দোয়া): https://sunnah.com/tirmidhi:3681

২. মুসনাদে আহমাদ, উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনা (নাজাশির দরবারের পূর্ণ ঘটনা): https://en.tohed.com/hadith/musnad-ahmad/chapter/1004/sub/36018/

৩. সহিহ বুখারি, হাদিস ১২৪৫ (নাজাশির গায়েবানা জানাজা): https://sunnah.com/bukhari:1245

৪. সূরা মারিয়াম (১৯), প্রথম অংশ: https://quran.com/19

৫. সূরা আল-মায়িদা, ৫:৮২–৮৩: https://quran.com/5/82-83

৬. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ (আবিসিনিয়ায় হিজরত অধ্যায়) এবং সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতূম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।