ভূমিকা
এখনই শিঙায় ফু দেওয়া হবে। সময় ঘনিয়ে এসেছে আর এই সেই অন্তিম মুহূর্ত শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবী আর এই মহাবিশ্বের ধ্বংস হওয়ার সময় এসে গেছে। আসমান আর জমিন আর আগের মতো নেই। সবকিছু ভেঙে পড়ছে এক এক করে। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে, জানে না কি করবে এখন। পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে কি ঘটতে যাচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছে সবাই। এটি যেন ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়ানক কিছু। পর্বতসমূহ কাঁপছে, সমুদ্র ফুসে উঠেছে। পৃথিবীপৃষ্ঠের সবকিছু একের পর এক চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে। আর চারিদিকে বাড়তে ও ছড়াতে শুরু করেছে ভয়ানক ও বিভৎস আতঙ্কের ছায়া। আকাশে একের পর এক তারা খসে পড়ছে। মানুষ চিৎকার করে যেদিকে পারে সেদিকে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এখন আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কেননা পরীক্ষার সময় এখন সমাপ্ত হয়েছে। আর তারা একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যাচ্ছে।
এখন আমরা পবিত্র কুরআনের আয়াত থেকে জানবো এবং একে একে ব্যাখ্যা করবো কি কি ঘটবে সেদিন।
শিঙায় ফুৎকার এবং পৃথিবী ধ্বংসের সূচনা
সূর নামক শিঙায় ফু দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী ধ্বংস হতে শুরু করবে।
একবার যখন ফেরেশতা ইসরাফিল (আঃ) এটিতে ফু দিয়ে দিবেন, এমন ধরনের বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটবে যে পৃথিবী, তারকা রাজি এমনকি গ্যালাক্সি সমূহেরও অস্তিত্ব থাকবে না।
কুরআন দৃশ্যগুলোকে নিম্নরূপে ব্যাখ্যা করে: যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে—একটি মাত্র ফুৎকার, এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে ও চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে একটি মাত্র ফুৎকারে, সেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও বিক্ষিপ্ত হবে।
সেই দিনের আতঙ্কের কথা আরও অনেক আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে: সেদিন জমিন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ বিক্ষিপ্ত, বহমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে। সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব যেমন গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র। যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। তোমাদের প্রতি করা আমার ওয়াদা নিশ্চিত, নিশ্চয়ই আমি তা পূর্ণ করবই। অতএব, তোমরা কিরূপে আত্মরক্ষা করিবে যদি তোমরা সেদিনকে অস্বীকার করো, যেদিন কিশোরদেরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে? সেদিন আসমান হবে বিদীর্ণ, তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
এই আয়াতগুলো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে যে, এই দিনটি অন্য দিনের মতো হবে না। আমাদের চারপাশে যে মহাবিশ্বকে দেখতে পাই, তার ধ্বংসের দিন সেটি। প্রতিটি মানুষের যেমন তার সমাপ্তির একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, এই বিশাল সৃষ্টি যাকে মহাবিশ্ব বলে, তারও ধ্বংসের নির্দিষ্ট দিন রয়েছে।
কিয়ামতের দিনে সূর্য, নক্ষত্র, পর্বত ও সমুদ্রের কী হবে?
আরেকটি আয়াতে এই ঘটনাগুলো আমাদের জানায় যে, এটি শেষ দিবস, যার বর্ণনা এভাবে দেওয়া হয়েছে: যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, আর নক্ষত্ররাজি তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে খসে পড়বে, আর পর্বতগুলোকে যখন সঞ্চালিত করা হবে; যখন পূর্ণগর্ভা উটট্রিগুলো উপেক্ষিত হবে, আর যখন বন্য পশুগুলো একত্র করা হবে, যখন সমুদ্রকে উত্তাল করা হবে।
সুতরাং না আকাশ, আর না পৃথিবী নিজ নিজ অক্ষে টিকে থাকবে।
যেদিকেই ফিরে তাকাবেন, আপনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে পাবেন। তীব্র ভূমিকম্প জমিনকে প্রকম্পিত করবে, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ছড়িয়ে পড়বে, গভীর ফাটল থেকে ছড়িয়ে পড়া গলিত তরল সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে তুলবে। অবিশ্বাস্য গতিতে পৃথিবী ঘোরার কারণে পর্বতগুলো তুলায় পরিণত হবে, সমুদ্রগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যাবে, আর সবগুলো সমুদ্র মিলে একটি বিশাল অতল সমুদ্রে পরিণত হবে।
কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর দিনটি আসতে আর কত সময় বাকি? ১০০ বছর? ১০ বছর? নাকি তারও কম?
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের জানিয়েছেন যে, এই দিনটি আসার আগে অনেক নিদর্শন দেখা যাবে—কিছু ছোট আর কিছু বড় বড় নিদর্শন। এখন চলুন কিছু ছোট নিদর্শন এ বিষয়ে আলোচনা করা যাক, এরপর আমরা বড়গুলো নিয়ে কথা বলবো। আর সবশেষে আপনি সিদ্ধান্ত নিবেন সেই সময় কি কাছে, না এখনো অনেক দূরে?
কিয়ামতের ছোট নিদর্শন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর আগমন
প্রথম ছোট নিদর্শনটি হচ্ছে আমাদের নবী (সাঃ)-এর পৃথিবীতে আগমন। কারণ তিনি আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী। অনেকগুলো সূত্রে এটিকে প্রথম ছোট নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
অন্য কথায়, এই বিদ্যালয়ে যাকে আমরা দুনিয়া বলি, তার শেষ শিক্ষক এসে চলে গেছেন। তাহলে আমাদের গ্র্যাজুয়েশন কি খুব দূরে হবে?
কুরআনের গুরুত্ব কমে যাওয়া
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে মানুষের জীবনে কুরআনের গুরুত্ব কমে যাবে।
বাস্তবে আজ আমরা যখন চারদিকে তাকাই, আমরা পরিষ্কারভাবে দেখি সবদিকে তাই ঘটে চলেছে। অনেক মানুষ পার্থিব জগতে এত বেশি নিমগ্ন যে তারা কুরআনের একটি পৃষ্ঠা খুলতেও ভুলে যায়।
“আমি কাজের জীবন নিয়ে এত ব্যস্ত যে কুরআন পড়ার সময়ই পাই না।”
“শেষবার এ কুরআন খুলে পড়েছি আমি সেই শৈশবে মক্তবে কুরআন শিক্ষাকালীন।”
হয়তো আপনিও তাদেরই একজন।
নামাজের প্রতি অবহেলা
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে নামাজ পড়া উঠে যাবে। কত অল্প লোক নামাজ পড়ে তা দেখার জন্য আপনার স্কুল কিংবা অফিসের আশেপাশে তাকিয়ে দেখুন।
“ভাইয়েরা, আমি মসজিদে যাচ্ছি। আমার সাথে কেউ নামাজ পড়তে যাবে?”
যতই কিয়ামতের দিন ঘনিয়ে আসছে, ততই নামাজ পড়া লোকের সংখ্যা কমছে।
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে মসজিদগুলো অতিরিক্ত সুসজ্জিত হবে, কিন্তু নামাজ পড়াকে অবহেলা করা হবে।
আল-মালহামা আল-কুবরা
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে আল-মালহামা আল-কুবরা—এক ভয়াবহ মহাযুদ্ধ। এই যুদ্ধও কিয়ামতের অন্যতম একটি লক্ষণ।
কোন যুদ্ধকে মালহামা বলা হয়েছে সে বিষয়ে স্কলারদের মাঝে নানান মত রয়েছে বা ইতিমধ্যে এই যুদ্ধ হয়ে গেছে কিনা। আমরা যে বড় বড় যুদ্ধসমূহ দেখেছি গত ১০০ শতাব্দীতে—যেমন প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সেগুলোও কিয়ামতের নিদর্শন হতে পারে।
কিয়ামতের অন্যান্য ছোট নিদর্শন
এখন বাকি ছোট নিদর্শনগুলো একনজরে দেখা যাক।
পৃথিবীর শেষ সময়ে এক আল্লাহয় বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা এবং ঈমানের ভিত্তিসমূহ ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকবে। ঈমান ও আকিদার বিষয়গুলোকে মানুষ আর গুরুত্ব দেবে না।
সুদের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়বে, ব্যবসায় সততা হারিয়ে যাবে। লোকেরা হালাল উপায়ে নাকি হারাম উপায়ে টাকা উপার্জন করছে সেটি নিয়ে মাথা ঘামাবে না।
ব্যভিচার ও অ্যালকোহলের মতো বড় পাপ সর্বত্র বেশি বেশি ছড়িয়ে পড়বে। বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ধরনের অ্যালকোহল ছড়িয়ে পড়বে, এর মধ্যে কিছু অংশকে হালাল ভাবা হবে।
অভদ্রতা এবং খোলামেলা পোশাক সব জায়গায় দেখা যাবে, লোকদের মাঝে চক্ষু লজ্জা কমে যাবে।
মানুষ অনেক বেশি কৃপণ এবং লোভী হয়ে পড়বে। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাবে, বয়স্করা তরুণদের প্রতি করুণা ও মারা দেখাবে না, আর তরুণরা বয়স্কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে না।
লোকেদের বিয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাবে আর অবৈধ সন্তানের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
জিহাদ এবং দাওয়ার কার্যক্রম থেমে যাবে। ধর্ম ছাড়া বাকি সব বিষয়ে জ্ঞান চর্চা করা হবে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বাধাগ্রস্ত হবে, পৃথিবীজুড়ে বন্যা, ভূমিকম্প এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগ বেড়ে যাবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ অদৃশ্য হয়ে যাবে, খুনের সংখ্যা বেড়ে যাবে।
বড় বড় ভবন তৈরি হবে, কদর এবং শেষ বিচার দিবসকে অস্বীকার করা হবে।
তো যেমনটি দেখতে পাচ্ছেন, কিয়ামতের প্রায় সব ছোট নিদর্শনসমূহ ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। এই নিদর্শনগুলো পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয় যে মানবতা সর্বশেষ স্তরে পৌঁছে গেছে।
পৃথিবী ধ্বংসের বড় নিদর্শন
এখন চলুন দেখে নেই পৃথিবী ধ্বংসের বড় নিদর্শনগুলো।
দাব্বাত আল-আরদের আগমন
অন্যতম বড় নিদর্শন হচ্ছে দাব্বাত আল-আরদের আগমন।
“পালাইয়া যাও! কি হচ্ছে এসব? আল্লাহু আকবার!”
তো এর অর্থ কি?
দাব্বাত আল-আরদ একটি জীবের নাম, যেটিকে কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে দেখা যাবে। এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে একটি জীবন্ত প্রাণী যা জমিনে হেঁটে বেড়ায়।
এই আয়াত আমাদের জানায় যে মাটির ভিতর থেকে একটি পশু বের হবে। এটির উল্লেখ এভাবে করা হয়েছে:
“আর যখন ঘোষিত শাস্তি তাদের উপরে এসে যাবে, তখন আমি মাটির গহ্বর হতে বের করব এক জীব, যা তাদের সাথে কথা বলবে এজন্য যে মানুষ আমার নিদর্শনে অবিশ্বাসী।”
প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার بدیع الزمان سعید نورسی (বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসী) বলেছেন, দাব্বাত আল-আরদ কোনো একক জীবের নাম নয়, বরং এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রজাতি হবে।
যেকোনো শতাব্দীর তুলনায় শুধু গত এক শতাব্দীতে অসংখ্য নতুন রোগ এবং জীবাণুর আবির্ভাব ঘটেছে। গাছ খেয়ে নেওয়া পোকার মতন সেসব জীবাণু মানবদেহের মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষের ঈমান কতটা দুর্বল সে বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহ থেকে তারা কত দূরে সরে গিয়েছে। আর ঠিক এ কারণেই একের পর এক দুর্যোগ তাদের ঘন ঘন আঘাত করছে।
এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন:
“মানুষ আমাদের নিদর্শনসমূহে নিশ্চিত বিশ্বাস করতো না।”
অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন, এটি শুধু একটি ব্যাখ্যা মাত্র।
ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব
আরেকটি বড় নিদর্শন হচ্ছে ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব।
এই মানবগোষ্ঠী দুটি সাধারণ মানুষদের প্রচণ্ড রকম ক্ষতি করবে এবং পৃথিবীজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে জুলকারনাইন একটি প্রাচীর তৈরি করেছেন বলে এই অনিষ্টকারী জাতিগুলো মানুষকে আঘাত করতে পারছে না। কিন্তু কিয়ামত যখন চলে আসবে, তারা ফিরে আসবে এবং মানুষদের ক্ষতি সাধন করবে।
উত্তরের পার্বত্য এলাকায় কোনো সামরিক অভিযানের সময় জুলকারনাইন একদল লোকের মাঝে এসে পড়েন, যারা ইয়াজুজ এবং মাজুজ নামে দুটি অনিষ্টকারী এবং আক্রমণাত্মক গোষ্ঠীর ব্যাপারে অভিযোগ করেছিল।
“ও জুলকারনাইন, ইয়াজুজ এবং মাজুজ আমাদের ভূমি নষ্ট করছে। আপনি কি সঠিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আমাদের ও তাদের মাঝে একটি প্রাচীর তৈরি করে দিবেন?”
তাদের অনুরোধে জুলকারনাইন সেই অঞ্চলে একটি প্রাচীর তৈরি করে দিয়েছিলেন।
প্রাচীরটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ইয়াজুজ এবং মাজুজ আর সেটি অতিক্রম করতে পারেনি, এমনকি তারা এতে একটি গর্তও করতে পারবে না।
জুলকারনাইন বলেছিলেন যে প্রাচীরটি একমাত্র ধ্বংস হবে যখন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময় আসবে। আর এটি কিয়ামতের অন্যতম একটি বড় নিদর্শন।
কিছু মতানুসারে এই গোষ্ঠী দুটি হলো মাঞ্চুরিয়ান এবং মঙ্গোল জাতি।
কয়েক শতাব্দী পর তাদের বংশধরেরা আবার মানুষের ক্ষতি করবে। কিয়ামতের আগে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতো একই রকম নিষ্ঠুরতা চালাবে।
অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
দাজ্জালের আগমন
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে দাজ্জালের আগমন।
কিছু বর্ণনায় দাজ্জালের আগমনকে পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
অনেক হাদিসে দাজ্জালকে মিথ্যাবাদী, প্রতারক এবং ভণ্ড নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে খারাপকে ভালো এবং মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করবে।
একটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি তারা সংখ্যায় ৩০ জন হবে, তাদের মধ্য থেকে দুজন দাজ্জালের কিয়ামতের সময় বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
একজন হলো সেই প্রধান দাজ্জাল, আর অন্য দাজ্জাল মুসলিমদের ভিতর থেকে উঠে আসবে, তার নাম সুফিয়ানি।
কিছু বর্ণনানুসারে সুফিয়ানি ইসলামকে বিকৃত করার চেষ্টা করবে এবং মানুষের পরকাল ধ্বংস করতে চাইবে—অবিশ্বাস এবং হারামকে ভণ্ডামি পূর্ণভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
অন্যদিকে প্রধান দাজ্জাল মুসলমান এবং অমুসলমানদের তার প্রচারিত মতবাদের মাধ্যমে ঈমান ও ইসলাম থেকে দূরে ধাবিত করবে।
মাহদীর আগমন
আরেকটি প্রধান নিদর্শন হলো মাহদীর আগমন, যিনি হবেন আমাদের নবী (সাঃ)-এর বংশধর।
মাহদী আল্লাহর নির্দেশিত একজন বান্দা হিসেবে বর্ণিত হয়েছেন, যিনি মানুষকে তাদের স্রষ্টার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।
তিনি উদ্ধার করবেন ঈমানহীনতায় ডুবতে থাকা আর যারা তাদের ঈমান নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিভ্রান্তিতে ভুগবে সেসব মানুষদের।
তিনি আমাদেরকে অন্ধকার এবং দাজ্জাল-সুফিয়ানির মতো বিপদের হাত থেকেও রক্ষা করবেন।
ঈসা (আঃ)-এর পৃথিবীতে ফিরে আসা
আরেকটি মহান নিদর্শন হচ্ছে যীশু (আঃ) নামে যিনি পরিচিত, ঈসা (আঃ)-এর আসমান থেকে নেমে আসা।
অনেক হাদিসে বলা হয়েছে ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে নেমে আসবেন কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে আর ইসলামের শাসন কার্যকর করবেন।
যখন তিনি একজন নবী ছিলেন, ইহুদিরা তাকে ফাঁদে ফেলে ক্রুশবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা কিছু করে ওঠার আগেই আল্লাহ জান্নাতে উঠিয়ে নিয়ে তাকে রক্ষা করেন।
মাহদীর আগমনের পর ঈসা (আঃ) আসমান থেকে শুধুমাত্র একজন শাসক হিসেবে নেমে আসবেন।
শেষে দাজ্জালকে ধ্বংস করার আন্দোলনে সাড়া দিয়ে তিনি ইমাম মাহদীর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন এবং দাজ্জালকে নিজ হাতে হত্যা করবেন।
দুখানের আগমন
আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে দুখান।
দুখানের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ধোঁয়া।
কিছু কিছু মতানুসারে শেষ বিচারের দিন যখন চলে আসবে, আসমান থেকে ধোঁয়া এসে পুরো পৃথিবী ঢেকে ফেলবে, যেটি ৪০ দিন স্থায়ী হবে।
সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে
আরেকটি বড় নিদর্শন হচ্ছে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।
যখন এই ঘটনাটি ঘটবে, সকল প্রত্যক্ষদর্শী পরিষ্কাররূপে বুঝে যাবে পৃথিবী তার শেষ সময়ে চলে এসেছে।
কিন্তু ততক্ষণে অনুশোচনা এবং পরীক্ষার দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তো এই উপলব্ধি তাদের কোনো উপকারে আসবে না।
সবগুলো নিদর্শনের মাঝে সবচেয়ে সুস্পষ্ট নিদর্শন হবে এটি।
কিয়ামত আসার সময় নিয়ে আমাদের করণীয়
এইসব নিদর্শন থেকে আমরা বুঝতে পারি শেষ বিচারের দিন খুবই নিকটে।
কিন্তু কখনো কখনো আমরা একটি ব্যাপার ভুলে যাই—একজন ব্যক্তির কিয়ামত হলো তার মৃত্যু।
আর তাই আমাদের সত্যিই যে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত তা হলো নিজেদের কিয়ামতের জন্য প্রস্তুত হওয়া।
গুরুত্বপূর্ণ হলো এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করা, ঠিক যেমনটা আমাদের প্রভু এই আয়াতে বলেছেন:
“তারা শুধু এই অপেক্ষাই করছে যে কিয়ামত আকস্মিকভাবে তাদের উপরে এসে পড়ুক। বস্তুত কিয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসেই পড়েছে। কিন্তু কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কিভাবে?”
এই কথাটির মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে গভীর শিক্ষা।
আমরা কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময় জানি না। আমরা জানি না পৃথিবীর শেষ কখন হবে। কিন্তু আমরা প্রত্যেকে জানি যে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন একদিন শেষ হবে।
তাই কিয়ামতের দিন কখন আসবে—১০০ বছর পর, ১০ বছর পর, নাকি তারও আগে—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমার মৃত্যু যদি আজই আসে, আমি কি প্রস্তুত?
পরিবর্তনের শুরু হোক আজ থেকেই
যদি ভিডিওটি আপনার কাছে এসে পৌঁছায়, তবে নিশ্চিত থাকবেন এটি কোনো এক্সিডেন্ট নয়।
আল্লাহ এটি আপনার সামনে এনেছেন এবং শেষ পর্যন্ত দেখার তৌফিক দিয়েছেন।
কেন করেছেন জানেন?
কারণ তিনি চান যেন আপনার জীবনে পরিবর্তন আসুক।
তো এরপরও কি আপনি তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি ছোট পদক্ষেপ নিবেন না?
এখন আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
যদি আপনি নামাজ না পড়েন, এই মুহূর্তই হোক আপনার নামাজের প্র্যাকটিসের সূচনা।
বিজ্ঞাপনমুক্ত আমাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যের সালাত অ্যাপের মাধ্যমে আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের ধারাবাহিক অংশ করে তুলতে পারবেন।
যদি আপনার ঈমানকে আরও শক্তিশালী করতে চান ও ইসলামিক জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান, আমরা এই চ্যানেলে আপনার জন্য অসংখ্য ভিডিও তৈরি করেছি।
আপনি একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে গুছিয়ে সেসব ভিডিও দেখতে পারেন।
আপনার যদি আরবিতে কুরআন পড়তে অসুবিধা হয়, তাহলে আমাদের বানানরীতি ‘লামআলিফ’ কুরআন অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারেন, যেটির মাধ্যমে আপনি দ্রুত, সহজে এবং বিনামূল্যে আরবি শিখতে পারবেন।
আর আপনি যদি কুরআনের অর্থ আরও গভীরভাবে জানতে চান, আপনি আমাদের তাফসীর অ্যাপ ‘কপগিট’ ডাউনলোড করতে পারেন।
মনে রাখবেন, একবার নিজের জন্য লক্ষ্য ঠিক করলে সেই লক্ষ্য যত ছোটই হোক না কেন, আপনার জীবনে পরিবর্তন আসতে শুরু করবে।
পুনরুত্থানের দিন
এরপর আসছে পুনরুত্থান।
সেই দিন প্রায় এসে গেছে, যে দিন ঠোঁটকে সিল করে দেওয়া হবে আর হাত কথা বলতে শুরু করবে এবং পা সাক্ষ্য দেবে, কোনো কিছুই গোপন থাকবে না।
শেষ বিচারের দিন পুরো মানবজাতিকে পুনরুত্থিত করা হবে আর কঠিন কষ্টের সময়ে প্রবেশ করবে।
তো সেই দীর্ঘ দিনটিতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে?
এই প্রশ্নই আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কারণ কিয়ামতের আলোচনা শুধু পৃথিবীর ধ্বংসের আলোচনা নয়; এটি মানুষের নিজের পরিণতির কথাও মনে করিয়ে দেয়।
সেদিন মানুষ তার নিজের কর্মের সামনে দাঁড়াবে। দুনিয়ার ব্যস্ততা, সম্পদ, ক্ষমতা, পরিচিতি, অহংকার কিংবা পার্থিব সাফল্য কোনো কিছুই তাকে সেই বাস্তবতা থেকে আড়াল করতে পারবে না।
আজ যে সময় আমাদের হাতে রয়েছে, সেটিই প্রস্তুতির সময়।
আজ নামাজ পড়ার সুযোগ আছে। আজ তওবা করার সুযোগ আছে। আজ কুরআন পড়ার সুযোগ আছে। আজ নিজের জীবন পরিবর্তন করার সুযোগ আছে।
কিন্তু পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে গেলে আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।
তাই কিয়ামতের দিন কেমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তর জানার পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা প্রয়োজন:
আমি কি সেই দিনের জন্য প্রস্তুত?
আমি কি আমার রবের সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত?
আমার আজকের জীবন কি আমার আগামী দিনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি তৈরি করছে?
কিয়ামতের নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করার প্রকৃত উদ্দেশ্য ভয় সৃষ্টি করা নয়; বরং মানুষকে সচেতন করা, নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখানো এবং সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসার সুযোগটি কাজে লাগাতে উৎসাহিত করা।
সময় চলে যাচ্ছে।
পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী।
আর প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত কিয়ামত তার মৃত্যুর সঙ্গে শুরু হয়।
তাই শেষ সময় কখন আসবে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি আজ থেকেই নিজের প্রস্তুতি শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন করার, সঠিক পথে ফিরে আসার এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

