একটি ক্ষুদ্র মাছির মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব উপাস্যের অসহায়ত্ব এবং একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার সত্য স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সত্য উপলব্ধি করানোর জন্য অসংখ্য দৃষ্টান্ত ও উপমা উপস্থাপন করেছেন। কখনো মাকড়সার ঘরের মাধ্যমে মিথ্যা আশ্রয়ের দুর্বলতা, কখনো আলো ও অন্ধকারের মাধ্যমে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য, আবার কখনো প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে তাঁর অসীম ক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। সূরা আল-হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াতও এমনই এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
সূরা আল-হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াত
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ ۚ إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ ۖ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ۚ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ
বাংলা অর্থ: “হে মানুষ! একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের ডাকো, তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা এ উদ্দেশ্যে সবাই একত্র হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তারা তা তার কাছ থেকে উদ্ধারও করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়—উভয়েই কত দুর্বল!” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৩)
সূত্র: কুরআন ডট কম—সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৩ ও তাফসির ইবনে কাসির
‘হে মানুষ!’—সমগ্র মানবজাতির প্রতি এক গভীর আহ্বান
আয়াতটির সূচনা হয়েছে ‘ইয়া আইয়ুহান নাস’—অর্থাৎ ‘হে মানুষ!’ সম্বোধনের মাধ্যমে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, জাতি কিংবা ভূখণ্ডের মানুষকে আলাদাভাবে সম্বোধন করা হয়নি; বরং সমগ্র মানবজাতিকে চিন্তা ও উপলব্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে।
এরপর আল্লাহ বলেন, ‘একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে, অতএব তা মনোযোগ দিয়ে শোনো।’ এই নির্দেশের মধ্যে রয়েছে গভীর তাৎপর্য। মানুষ অনেক সময় প্রচলিত বিশ্বাস, সামাজিক রীতি কিংবা পূর্বপুরুষদের অনুসৃত পথকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করে। অথচ সত্য উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন বিবেক, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি আন্তরিক মনোযোগ।
এই আয়াত মানুষকে সেই চিন্তাশীল অবস্থানে আহ্বান করে, যেখানে সে নিজের বিশ্বাসের ভিত্তি পরীক্ষা করবে এবং বুঝতে চেষ্টা করবে—যাকে সে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করছে, তার প্রকৃত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কতটুকু।
কেন একটি মাছিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে?
আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন একটি প্রাণীর কথা উল্লেখ করেছেন, যাকে মানুষ সাধারণত ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বলে বিবেচনা করে। মাছি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত একটি প্রাণী। তার আকার ছোট, শক্তি সীমিত এবং মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় তাকে সহজেই তাড়িয়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু এই পরিচিত প্রাণীটিকেই কুরআন এমন এক দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে, যা মানুষের বিশ্বাসের মৌলিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মানুষ যদি কোনো কিছুকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তার মধ্যে এমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকার ধারণা থাকতে হবে, যা উপাসনার উপযোগী। অথচ আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকা হয়, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়—এমনকি সবাই একত্র হলেও নয়।
এখানে মূল শিক্ষা মাছির আকার বা বাহ্যিক গুরুত্ব নিয়ে নয়; বরং সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নিয়ে। কোনো সৃষ্টি যত শক্তিশালী, বিশাল কিংবা মানুষের কাছে সম্মানিতই হোক না কেন, সে নিজেই সৃষ্টির অধীন। প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ তাআলা।
সবাই একত্র হলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না
আয়াতের এই অংশটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: ‘তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা এ উদ্দেশ্যে সবাই একত্র হয়।’
এখানে এককভাবে অক্ষমতার পাশাপাশি সম্মিলিত অক্ষমতার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করা হয়, তাদের সংখ্যা যতই হোক, তাদের সম্মিলিত শক্তি যত বড়ই মনে হোক, তা তাদের স্রষ্টার মর্যাদায় উন্নীত করতে পারে না।
মানুষ প্রযুক্তি, জ্ঞান, গবেষণা ও শিল্পকলার মাধ্যমে বহু জটিল বস্তু নির্মাণ করতে পারে। জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে জীবনের নানা প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুর উপাদান ব্যবহার করে নির্মাণ করা এবং স্বাধীনভাবে সৃষ্টির অস্তিত্ব দান করা এক বিষয় নয়। কুরআনের এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য মানুষের গবেষণা বা জ্ঞানচর্চাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ক্ষমতা ও প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার পার্থক্য স্পষ্ট করা।
তাফসির ইবনে কাসিরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, উপাস্য হিসেবে গৃহীত মূর্তি ও অন্য সত্তাগুলো সবাই একত্র হলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাদের অক্ষমতা এবং আল্লাহর একক সৃষ্টিকর্তা হওয়ার সত্য তুলে ধরা হয়েছে।
মাছি কিছু ছিনিয়ে নিলে তা উদ্ধার করতে না পারার তাৎপর্য
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আরও গভীর একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তা মাছির কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না।
প্রাচীন আরবের মূর্তিপূজারী সমাজে উপাস্য হিসেবে বিবেচিত মূর্তির সামনে সুগন্ধি, খাদ্য কিংবা অন্যান্য উপহার রাখা হতো। তাফসির ইবনে কাসিরে এই অংশ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন উপহার থেকে মাছির কিছু নিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যে উপাস্যকে মানুষ নিজের প্রয়োজন পূরণের আশায় আহ্বান করে, সে নিজের সামনে থাকা সামান্য জিনিসও রক্ষা করতে পারে না।
এখানে দৃষ্টান্তের শক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে সত্তা নিজের অসহায়ত্ব দূর করতে পারে না, তার কাছে সর্বময় ক্ষমতা প্রত্যাশা করার ভিত্তি কোথায়? যে নিজের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া বস্তু ফিরিয়ে আনতে পারে না, তার কাছে সর্বশক্তিমান স্রষ্টার মতো সাহায্য প্রত্যাশা করা যুক্তিসংগত নয়।
এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক মূর্তিপূজারী সমাজের সমালোচনা নয়; বরং উপাসনা, নির্ভরতা এবং চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তার সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন।
‘দুর্বল প্রার্থনাকারী ও প্রার্থনার পাত্র’—বাক্যটির ব্যাখ্যা
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘দুর্বল প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়—উভয়েই।’
আরবি ‘আদ-দা’ইফ’ অর্থ দুর্বল এবং ‘আত-তালিব’ ও ‘আল-মাতলুব’ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যা তাফসিরে বিভিন্নভাবে আলোচিত হয়েছে। ইবনে কাসিরে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে একটি ব্যাখ্যায় প্রার্থনার পাত্রকে মূর্তি এবং যার কাছ থেকে কিছু উদ্ধার করতে চাওয়া হচ্ছে তাকে মাছি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি ব্যাখ্যায় প্রার্থনাকারীকে উপাসক এবং প্রার্থনার পাত্রকে উপাস্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে শব্দের প্রয়োগগত পার্থক্য থাকলেও মূল শিক্ষা একই: আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতার বিশ্বাস স্থাপন করা হয়, তারা নিজেরাই সীমাবদ্ধ ও অসহায়। অতএব তাদের এমন মর্যাদা দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।
পরবর্তী আয়াতের সঙ্গে সম্পর্ক: আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা উপলব্ধি
সূরা আল-হাজ্জের ৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা উপলব্ধি করেনি; নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী। (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৪)
৭৩ নম্বর আয়াতের দৃষ্টান্ত এবং ৭৪ নম্বর আয়াতের ঘোষণা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রথমে মানুষের সামনে অসহায় উপাস্যের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে; এরপর আল্লাহর প্রকৃত ক্ষমতা ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এখানে তাওহিদের মৌলিক শিক্ষা স্পষ্ট: সৃষ্টিকর্তা, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং চূড়ান্ত উপাসনার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ। মানুষের জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা তাকে সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে না। সবকিছুর অস্তিত্ব ও সামর্থ্য আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল।
এই আয়াত থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
প্রথমত, বিশ্বাসের ভিত্তি হতে হবে সত্য ও আল্লাহর নির্দেশনা। কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক প্রচলন কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুসরণ করে কোনো বিশ্বাসকে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, সৃষ্টির ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। মানুষ কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টি যত উন্নত হোক না কেন, তাকে আল্লাহর সমকক্ষ ভাবার কোনো ভিত্তি নেই।
তৃতীয়ত, আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধির জন্য গভীর জ্ঞান বা জটিল উদাহরণ সব সময় প্রয়োজন হয় না। একটি ক্ষুদ্র মাছির মতো পরিচিত প্রাণীর মাধ্যমেও মানুষ সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা ও নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তা করতে পারে।
চতুর্থত, উপাসনা ও চূড়ান্ত নির্ভরতা কেবল আল্লাহর প্রতি নিবেদিত হওয়া উচিত। মানুষের জীবনে অন্য মানুষের সহযোগিতা, চিকিৎসা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বৈধ উপায়ের গুরুত্ব রয়েছে; কিন্তু এগুলোকে আল্লাহর স্বাধীন ও সর্বময় ক্ষমতার সমতুল্য মনে করা যাবে না।
পঞ্চমত, কুরআনের দৃষ্টান্ত শুধু পাঠ করার জন্য নয়, তা নিয়ে চিন্তা করার জন্যও। আয়াতের শব্দ, প্রেক্ষাপট ও তাফসির বোঝার মাধ্যমে একজন পাঠক নিজের বিশ্বাসকে আরও সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।
উপসংহার
সূরা আল-হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াত একটি ক্ষুদ্র মাছির মাধ্যমে মানুষের সামনে এক বিশাল সত্য উন্মোচন করেছে। যে প্রাণীকে মানুষ সামান্য বলে মনে করে, সেই প্রাণীকেই দৃষ্টান্ত বানিয়ে আল্লাহ তাআলা বুঝিয়েছেন যে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা ও সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা এক বিষয় নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্য যাদের উপাসনা করা হয়, তারা সবাই একত্র হলেও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারে না; এমনকি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে গেলেও তা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা তাদের নেই।
এই দৃষ্টান্তের চূড়ান্ত বার্তা হলো তাওহিদ—আল্লাহর একত্ব, তাঁর একক সৃষ্টিকর্তা হওয়া এবং একমাত্র তাঁরই উপাসনার যোগ্যতা। একজন চিন্তাশীল মানুষের জন্য এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়; এটি নিজের বিশ্বাস, নির্ভরতা ও জীবনের উদ্দেশ্যকে পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান।
নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স লিংক
১. পবিত্র কুরআন — সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৭৩
আয়াতের আরবি পাঠ, অনুবাদ ও তাফসির।
২. তাফসির ইবনে কাসির
মাছির দৃষ্টান্ত, মূর্তির অসহায়ত্ব এবং আয়াতের ব্যাখ্যা।
৩. The Quranic Arabic Corpus
আয়াতটির একাধিক ইংরেজি অনুবাদ ও আরবি শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
৪. তাফসিরে মাওদূদী
আয়াত ৭৩–৭৪-এর ব্যাখ্যা ও তাওহিদের তাৎপর্য।
