তৃতীয় পর্ব: তেহরান থেকে কুম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদ—শেষ বিদায়ের দীর্ঘ পথ
শেষযাত্রার প্রতিটি ধাপ ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। ইরান সরকার রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রধান সড়কগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়, ড্রোন নজরদারি চালু হয় এবং বিদেশি প্রতিনিধিদল ও সংবাদমাধ্যমের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অনুষ্ঠানগুলো সরাসরি সম্প্রচার করে, আর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শত শত সাংবাদিক ঘটনাস্থল থেকে প্রতিবেদন পাঠান। রয়টার্স জানায়, শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, চিকিৎসা সহায়তা এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছিল, কারণ কয়েক মিলিয়ন মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা আগেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শায়িত অবস্থায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হলে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি, ধর্মীয় শিক্ষার্থী, প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি কর্মকর্তা, বিপ্লবী গার্ডের সদস্য এবং সাধারণ নাগরিক সেখানে উপস্থিত হন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে, অনেকের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, আবার অনেকের হাতে ছিল কুরআন এবং খামেনির প্রতিকৃতি। কেউ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দোয়া পাঠ করছিলেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আয়োজনে বিপ্লব-পরবর্তী ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর চিত্রও প্রদর্শন করা হয়, যাতে খামেনির দীর্ঘ নেতৃত্বকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা যায়।
এই শোকানুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উপস্থিতি। বিভিন্ন দেশ প্রতিনিধি পাঠায় এবং একাধিক সরকার আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা প্রদান করে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকেরা ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। ফলে খামেনির শেষযাত্রা কেবল একটি জাতীয় বিদায় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।
তেহরানে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রা এমন এক রূপ ধারণ করে, যা আধুনিক ইরানের ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। ইসলামি রীতি অনুযায়ী দ্রুত দাফন সম্পন্ন করার পরিবর্তে ইরান সরকার কয়েক দিনব্যাপী একটি রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে, যাতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র এবং শিয়া বিশ্বের ঐতিহাসিক নগরীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল ধর্মীয় কারণই নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। সরকার চেয়েছিল ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ, শিয়া ধর্মীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা দেশ-বিদেশে পৌঁছে দিতে। সে কারণে তেহরানের পর কুমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এরপর ইরাকের পবিত্র শিয়া নগরী নাজাফ ও কারবালায় বিশেষ দোয়া এবং সর্বশেষ জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে দাফনের পরিকল্পনা করা হয়।
রাজধানী তেহরানে শেষযাত্রার দিন সকাল থেকেই বিপুল মানুষের ঢল নামে। রেভল্যুশন স্কয়ার থেকে আজাদি স্কয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত প্রধান সড়ক মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহু মানুষ হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা, কালো শোকের পতাকা এবং কুরআন শরিফ বহন করছিলেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কুরআন তিলাওয়াত, শোকগাঁথা এবং বিপ্লব-পরবর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তের ভিডিওচিত্র প্রচার করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শত শত সাংবাদিক পুরো শোভাযাত্রা সরাসরি কভার করেন। দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই শোভাযাত্রা শুধু একটি জানাজা ছিল না; এটি ছিল ইরানের পক্ষ থেকে জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার একটি প্রকাশ্য প্রদর্শন।

Leave a Reply