পঞ্চম পর্ব: রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সমর্থন-সমালোচনা এবং ইরানের ভবিষ্যতের সন্ধিক্ষণ
নাজাফ ও কারবালায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইরাক, লেবানন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের শিয়া প্রতিনিধি, ধর্মীয় আলেম এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেখানে উপস্থিত হন। আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, কয়েক ডজন দেশের প্রতিনিধি তেহরানের মূল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অথবা পরবর্তী ধর্মীয় আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নিবিড় আলোচনা চলতে থাকে।
শেষপর্যন্ত বহু দিনের এই শোকযাত্রার সমাপ্তি নির্ধারিত হয় মাশহাদে, যেখানে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের নিকটে খামেনিকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। মাশহাদ শুধু তার জন্মস্থানই নয়; এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নগরী। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা বিবেচনা করে সেখানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মাশহাদে দাফনের সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত প্রতীকী—একদিকে এটি তার ব্যক্তিগত জীবনের সূচনাস্থলে ফিরে যাওয়া, অন্যদিকে শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক চূড়ান্ত সংযোগ স্থাপন।
কিন্তু শেষযাত্রা শেষ হলেও প্রকৃত প্রশ্ন তখনও রয়ে যায়—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর ইরান কোন পথে এগোবে? নতুন নেতৃত্ব কি তার নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি পরিবর্তনের সূচনা করবে? মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, পারমাণবিক আলোচনার ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে নতুন রূপ নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর তখনও অনিশ্চিত ছিল, আর সেই অনিশ্চয়তাই খামেনির শেষযাত্রাকে কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ইতিহাসের সূচনালগ্নে পরিণত করে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রা যতটা আবেগের, ততটাই মূল্যায়নেরও একটি মুহূর্ত। দীর্ঘ কয়েক দশকের নেতৃত্ব শেষে একজন রাষ্ট্রনায়ক ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলে তার কর্মকাণ্ডকে নতুন করে বিচার করতে শুরু করে গবেষক, ইতিহাসবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষ। খামেনির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তার মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক মহলে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতে থাকে—আলী খামেনির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কী? তিনি কি মূলত ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে টিকিয়ে রাখা একজন দৃঢ় নেতা, নাকি এমন একজন শাসক যার দীর্ঘ শাসনামলে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল? বাস্তবতা হলো, এই দুই ধরনের মূল্যায়নই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান এবং ইতিহাসে তার অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্বপূর্ণ।
তার সমর্থকদের মতে, ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণের সময় ইরান ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে থাকা একটি রাষ্ট্র। তাদের যুক্তি হলো, খামেনির নেতৃত্বে ইরান নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। সমর্থকদের ভাষায়, তিনি এমন একটি নীতি অনুসরণ করেন যার লক্ষ্য ছিল বিদেশি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইরানের সরকারি বক্তব্যেও বহুবার বলা হয়েছে যে, দেশের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব ছিল নির্ধারক।
অন্যদিকে সমালোচকদের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, পশ্চিমা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বহু সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর চাপ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও খামেনির দীর্ঘ শাসনামলের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। রয়টার্স, এপি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম উল্লেখ করেছে যে, তার শেষযাত্রার সময় যেমন লাখো মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন, তেমনি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সংস্কারের প্রত্যাশাও সমাজের একটি অংশে স্পষ্ট ছিল।

Leave a Reply