সুরা আর-রহমান পবিত্র কুরআনের ৫৫তম সূরা, আল্লাহর অপার দয়ার এক জীবন্ত দলিল। সৃষ্টিজগতের বিস্ময়, মানুষের প্রতি অনুগ্রহ এবং পরকালের প্রতিদান—সবকিছুর মাঝখানে একটি প্রশ্ন বারবার প্রতিধ্বনিত হয়, যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তোলে।

ভূমিকা: একই প্রশ্ন কেন বারবার ফিরে আসে?

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ

উচ্চারণ: ফাবিআইয়্যি আ-লা-ই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান।

অর্থ: “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?” (সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৩)

এই আয়াতটি সূরায় মোট ৩১ বার এসেছে। আল্লাহ চাইলে একবারই প্রশ্নটি করতে পারতেন। তবু কেন এই পুনরাবৃত্তি? কারণ আল্লাহ প্রজ্ঞাময়, তাঁর বাণীর একটি শব্দও অনর্থক নয়। এই পুনরাবৃত্তি আসলে মানুষের ঘুমন্ত বিবেকের দরজায় বারবার কড়া নাড়া।

মানুষ যা পায়নি, তা নিয়ে দিনরাত ভাবে; অথচ যা পেয়েছে, তা অবলীলায় ভুলে যায়। একটি ব্যর্থতা তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, অথচ হাজারো প্রাপ্তি থেকে যায় চোখের আড়ালে। সূরা আর-রহমান মানুষকে ঠিক এই অভ্যাসের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং সরাসরি প্রশ্ন করে—তুমি কি সত্যিই কৃতজ্ঞ?

সূরার সূচনা: দয়া দিয়েই শুরু

সূরাটির নামই আর-রহমান, অর্থাৎ পরম দয়াময়। শুরুতেই আল্লাহ ঘোষণা করেন:

الرَّحْمَٰنُ ۝ عَلَّمَ الْقُرْآنَ ۝ خَلَقَ الْإِنسَانَ ۝ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ

অর্থ: “পরম করুণাময়। তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।” (সূরা আর-রহমান, ৫৫:১–৪)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষের সৃষ্টির কথা বলার আগেই কুরআন শিক্ষার কথা এসেছে। এতে স্পষ্ট হয়, নিয়ামত কেবল খাদ্য, সম্পদ বা আরাম-আয়েশ নয়; জ্ঞান, ভাষা, চিন্তাশক্তি এবং সঠিক পথ চেনার সামর্থ্যই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি, নিজের দেহের একটি অঙ্গও নিজে গড়েনি, প্রকৃতির কোনো নিয়মও সে নির্ধারণ করেনি। তবু সে এই সৃষ্টিজগতে বাস করছে, জ্ঞান অর্জন করছে, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবার সুযোগ পাচ্ছে। এই উপলব্ধি অহংকারের প্রাচীর ভেঙে দেয় এবং মানুষকে বিনয়ী করে তোলে।

পুনরাবৃত্তির রহস্য: জানা আর উপলব্ধি করা এক নয়

সূরাটিতে যখনই নতুন কোনো নিয়ামতের বর্ণনা আসে, প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। প্রতিটি নিয়ামতের পর এই বিরতি পাঠককে থামতে এবং নিজের জীবন যাচাই করতে বাধ্য করে।

প্রথমবার মানুষ হয়তো কেবল তথ্যটি গ্রহণ করে। দ্বিতীয়বার নিজের জীবনের সঙ্গে তার সংযোগ খুঁজে পায়। আরও গভীরে গেলে বুঝতে পারে, যেসব বিষয়কে সে এত দিন “স্বাভাবিক” ভেবে এসেছে, তার প্রতিটিই তার বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, “তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করো, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১৮) সূরা আর-রহমানের পুনরাবৃত্তি যেন সেই অগণিত নিয়ামতের সামনে মানুষকে বারবার দাঁড় করিয়ে দেয়।

তবে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। আয়াতটি ঠিক ৩১ বারই কেন এসেছে, তার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিল ছাড়া চূড়ান্ত দাবি করা উচিত নয়। পুনরাবৃত্তির মধ্যে স্মরণ, সতর্কতা ও চিন্তার আহ্বান রয়েছে—এটুকু স্পষ্ট। আয়াতের অর্থ বদলায় না; বদলায় পাঠকের উপলব্ধির গভীরতা।

শ্বাস-প্রশ্বাস, সুস্থতা ও অবসর: যে নিয়ামত আমরা টেরই পাই না

আমরা প্রতিদিন শ্বাস নিই, দেখি, শুনি, হাঁটি—কোনো চিন্তা ছাড়াই। অথচ শ্বাস নিতে কষ্ট হলে তবেই বুঝি স্বাভাবিক নিঃশ্বাস কত বড় দান। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হলে তবেই উপলব্ধি করি, পৃথিবীকে দেখতে পারা কত বিরাট অনুগ্রহ।

ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও অসংখ্য অঙ্গের নিখুঁত সমন্বয়ে আমাদের জীবন চলছে। বিজ্ঞান এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেয়, আর একজন মুমিন এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে খুঁজে পান স্রষ্টার নিদর্শন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।” (সহিহ বুখারি, ৬৪১২) অর্থাৎ যে নিয়ামত হাতে আছে, তার মূল্যই মানুষ সবচেয়ে কম বোঝে। সবকিছু হারিয়ে ফেলার অপেক্ষা না করে সুস্থ ও সক্ষম থাকা অবস্থাতেই এই সামর্থ্যকে ভালো কাজে, অন্যের সেবায় এবং দায়িত্ব পালনে ব্যবহার করাই প্রকৃত কৃতজ্ঞতা।

কুরআন: হেদায়েতের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত

সম্পদ থাকলেই জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় না। জ্ঞান থাকলেই তা ন্যায়ের পথে ব্যবহৃত হয় না। ক্ষমতা থাকলেই দায়িত্ববোধ জন্মায় না। এই শূন্যতা পূরণ করে কুরআন।

কুরআন মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, ইবাদত, নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, মানবিক দায়িত্ব এবং পরকালের জবাবদিহি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য চেনায় এবং প্রতিনিয়ত জীবনকে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানায়।

তাই কুরআনের নিয়ামতের শোকর আদায় মানে কেবল তিলাওয়াত নয়; এর অর্থ বোঝা, নির্দেশনা মেনে চলা এবং সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া ও ন্যায়বিচারকে নিজের চরিত্রে প্রতিষ্ঠা করা।

সূর্য, চাঁদ, সমুদ্র ও প্রকৃতি: সৃষ্টির বিস্ময় এবং আমাদের দায়িত্ব

সূরা আর-রহমানে আল্লাহ সূর্য ও চাঁদের সুনির্দিষ্ট হিসাবে চলা (৫৫:৫), আকাশ ও ভারসাম্য (৫৫:৭–৯), দুই সমুদ্রের মিলন ও তাদের মাঝের অন্তরাল (৫৫:১৯–২০), মুক্তা ও প্রবাল (৫৫:২২) এবং পাহাড়সম নৌযানের (৫৫:২৪) কথা উল্লেখ করেছেন।

সূর্য পৃথিবীতে আলো ও তাপ দেয়, উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া সচল রাখে। চাঁদের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন যুগ যুগ ধরে মানুষকে সময় গণনায় সাহায্য করেছে। সমুদ্র দেয় খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও যাতায়াতের পথ; নদী দেয় কৃষির পানি ও সভ্যতার ভিত্তি।

এই সূরাতেই আল্লাহ বলেছেন, “তিনি ভারসাম্য স্থাপন করেছেন, যাতে তোমরা ভারসাম্যে সীমালঙ্ঘন না করো।” (৫৫:৭–৮) প্রযুক্তি মানুষকে প্রকৃতি ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু সীমাহীন করেনি। নদী দূষণ, বন উজাড়, পানির অপচয় এবং সম্পদের দায়িত্বহীন ব্যবহার সেই ভারসাম্য ভেঙে দেয়, আর তার চড়া মূল্য দিতে হয় মানুষকেই।

তাই প্রকৃতিকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে স্বীকার করার অনিবার্য দাবি হলো তাকে রক্ষা করা। পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা কৃতজ্ঞতারই একটি বাস্তব রূপ।

খাদ্য, পানি ও জীবিকা: প্রতিটি লোকমায় অনুগ্রহের চিহ্ন

একটি বাটি ভাত আমাদের সামনে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে কৃষকের ঘাম, জমির উর্বরতা, সেচের পানি, অনুকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ এক উৎপাদন প্রক্রিয়া। একটি ফলের জন্য প্রয়োজন বীজ, মাটি, পানি ও আলো—যার কোনোটিই মানুষ নিজে সৃষ্টি করেনি।

আল্লাহ বলেন, “মানুষ যেন তার খাদ্যের দিকে লক্ষ করে।” এরপর বৃষ্টি, শস্য, আঙুর, জলপাই, খেজুর ও নানা উদ্ভিদের কথা উল্লেখ করেছেন। (সূরা আবাসা, ৮০:২৪–৩২) সূরা আর-রহমানেও ফলমূল, খেজুর, খোসাযুক্ত শস্য ও সুগন্ধি উদ্ভিদের কথা এসেছে। (৫৫:১১–১২)

খাবার নষ্ট করা, পানির অপচয় করা কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্টে উদাসীন থাকা কৃতজ্ঞতার পরিপন্থী। বিপরীতে সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবীকে খাওয়ানো এবং অপচয় রোধ করাই শোকরের বাস্তব প্রকাশ। জীবিকার ক্ষেত্রেও একই কথা: উপার্জনের সুযোগ একটি নিয়ামত, আর সেই উপার্জন সৎ পথে করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা সেই নিয়ামতের দাবি।

‘তোমরা উভয়ে’: জিন ও মানুষের প্রতি সম্বোধন

আয়াতের “রাব্বিকুমা” ও “তুকাযযিবান” শব্দ দুটি আরবি দ্বিবচন, অর্থাৎ এখানে দুই পক্ষকে সম্বোধন করা হয়েছে। মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই দুই পক্ষ হলো জিন ও মানুষ। সূরার পরবর্তী অংশে “হে দুই ভারী সৃষ্টি” (৫৫:৩১) এবং “হে জিন ও মানবসম্প্রদায়” (৫৫:৩৩) বলে এই সম্বোধন আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে একটি হৃদয়স্পর্শী হাদিস রয়েছে। জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করলে তাঁরা নীরব রইলেন। তখন তিনি বললেন, আমি জিনদের রাতে এই সূরা তিলাওয়াত করেছিলাম, তারা তোমাদের চেয়ে উত্তম জবাব দিয়েছিল। যখনই আমি এই আয়াতটি পড়তাম, তারা বলত:

لَا بِشَيْءٍ مِنْ نِعَمِكَ رَبَّنَا نُكَذِّبُ فَلَكَ الْحَمْدُ

“হে আমাদের রব! আমরা তোমার কোনো নিয়ামতকেই অস্বীকার করি না, সকল প্রশংসা তোমারই।” (জামে তিরমিজি, ৩২৯১)

এই হাদিস দেখিয়ে দেয়, প্রশ্নটি নিছক শোনার জন্য নয়; এটি জবাব দাবি করে। আর সেই জবাব শুধু মুখে নয়, জীবনের প্রতিটি আচরণে দিতে হয়।

অভাবের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্য

জীবনে সুখ-দুঃখ দুটোই আসে। সমস্যা নিয়ে ভাবা স্বাভাবিক, কিন্তু সমস্যা যখন দৃষ্টির পুরোটা দখল করে নেয়, তখন জীবনের ভালো দিকগুলো আর চোখে পড়ে না।

ধরা যাক, একজন মানুষের চাকরি আছে, পরিবার আছে, মাথার ওপর ছাদ আছে, খাবারের নিশ্চয়তা আছে। কিন্তু প্রত্যাশিত পদোন্নতি হলো না। সেই একটি ব্যর্থতা তার পুরো দিনকে অন্ধকার করে দিতে পারে, অথচ জীবনের অসংখ্য প্রাপ্তি তখনো অটুট।

এর অর্থ এই নয় যে কষ্টকে তুচ্ছ করতে হবে। দারিদ্র্য, অসুস্থতা, শোক ও অন্যায় বাস্তব সমস্যা, যার সমাধানে চেষ্টা, সহযোগিতা ও ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কৃতজ্ঞতা মানে কষ্ট অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও প্রাপ্তিকে চেনা এবং সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের অবিরাম তুলনাও এই ভারসাম্য নষ্ট করে। অন্যের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ভালো, কিন্তু সেই কারণে নিজের জীবনকে ব্যর্থ ভাবা আত্মঘাতী। কিছু অপূর্ণতা থাকা মানে সবকিছু শূন্য হয়ে যাওয়া নয়।

কৃতজ্ঞতা কি শুধু মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা?

আলহামদুলিল্লাহ বলা কৃতজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ, তবে ইসলামে শোকরের ধারণা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এর তিনটি স্তর রয়েছে।

অন্তরের কৃতজ্ঞতা: জীবন, সামর্থ্য, জ্ঞান ও সম্পদকে নিজের কৃতিত্ব নয়, আল্লাহর দান হিসেবে উপলব্ধি করা।

মুখের কৃতজ্ঞতা: আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তাঁর অনুগ্রহের কথা স্মরণ ও প্রকাশ করা। আল্লাহ বলেন, “আর তোমার রবের নিয়ামতের কথা বর্ণনা করো।” (সূরা আদ-দুহা, ৯৩:১১)

কাজের কৃতজ্ঞতা: সম্পদ হালাল পথে উপার্জন ও কল্যাণে ব্যয় করা, জ্ঞানকে মানুষের উপকারে লাগানো, সুস্থতাকে ভালো কাজে ব্যবহার করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করা।

মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাও এর অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ হয় না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ হয় না।” (সুনানে আবু দাউদ, ৪৮১১)

আর কৃতজ্ঞতার প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সুস্পষ্ট:

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

অর্থ: “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।” (সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭)

এই বৃদ্ধিকে কেবল অর্থসম্পদে সীমাবদ্ধ করা ভুল। হেদায়েত, প্রশান্তি, বরকত এবং জীবনের নানা কল্যাণও এই প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত।

নিয়ামত মানেই দায়িত্ব

প্রতিটি নিয়ামতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দায়িত্ব। অন্যায়ভাবে উপার্জিত বা মানুষের অধিকার হরণে ব্যবহৃত সম্পদ কৃতজ্ঞতা নয়, অকৃতজ্ঞতার প্রমাণ। মানুষকে প্রতারিত করার কাজে ব্যবহৃত জ্ঞান নিয়ামতের অপমান। দুর্বলকে নিপীড়নে ব্যবহৃত ক্ষমতা সুস্পষ্ট জুলুম।

একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যে তার অধ্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষকের নির্দেশনা ও অন্যদের সহযোগিতাও সেখানে ভূমিকা রাখে। একজন ব্যবসায়ীর সাফল্যের পেছনে তার পরিশ্রমের পাশাপাশি কর্মীদের অবদানও থাকে। নিজের পরিশ্রমের স্বীকৃতি আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং কৃতজ্ঞ মানুষ সাফল্যে অহংকারী নয়, বিনয়ী হয়।

সূরা আর-রহমান নিজেই এই নীতির সারকথা ঘোষণা করেছে: “উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে?” (৫৫:৬০) যে আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়েছে, তার দায়িত্ব সেই অনুগ্রহকে কল্যাণে রূপান্তরিত করা।

প্রতিদিনের জীবনে কৃতজ্ঞতা চর্চার উপায়

কৃতজ্ঞতা এমন একটি গুণ, যা সচেতন অনুশীলনে ক্রমেই গভীর হয়। এর জন্য বিশেষ কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন দিনের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করুন; শরীর, পরিবার, আশ্রয় ও জীবনের সুযোগগুলো স্মরণ করুন। খাবারের সময় কৃতজ্ঞ হোন, অপচয় এড়িয়ে চলুন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবীর সঙ্গে ভাগ করে নিন।

দিনের শেষে কিছুক্ষণ নিজেকে প্রশ্ন করুন: আজ কী ভালো ঘটেছে? কে আমাকে সাহায্য করেছে? কোন কাজটি করতে পেরেছি? কোন ভুল থেকে শিখেছি?

সপ্তাহে অন্তত একবার অর্থসহ সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করুন এবং প্রতিবার আয়াতটি এলে থেমে মনে মনে জবাব দিন: “হে আমাদের রব, আমরা তোমার কোনো নিয়ামতকেই অস্বীকার করি না।”

সূরা আর-রহমানের ৩১টি প্রশ্ন: প্রতিটির আগের আয়াতসহ আরবি ও বাংলা অনুবাদ

নিচে সূরা আর-রহমানে প্রশ্নটি যতবার এসেছে, প্রতিবারের আগে আল্লাহ কোন নিয়ামত, সতর্কবাণী বা প্রতিদানের কথা উল্লেখ করেছেন, তা আরবি মূল পাঠ ও বাংলা অনুবাদসহ তুলে ধরা হলো। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রশ্নটি প্রতিবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে নতুন করে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।

প্রশ্ন ১ (আয়াত ১৩)

প্রসঙ্গ: আল্লাহর দয়া, কুরআন শিক্ষা, মানুষের সৃষ্টি, সূর্য-চাঁদ, ভারসাম্য, পৃথিবী ও খাদ্য

الرَّحْمَٰنُ ﴿١﴾

অনুবাদ (১): পরম করুণাময়।

عَلَّمَ الْقُرْآنَ ﴿٢﴾

অনুবাদ (২): তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন।

خَلَقَ الْإِنسَانَ ﴿٣﴾

অনুবাদ (৩): তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ।

عَلَّمَهُ الْبَيَانَ ﴿٤﴾

অনুবাদ (৪): তিনি তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।

الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ ﴿٥﴾

অনুবাদ (৫): সূর্য ও চাঁদ চলে নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী।

وَالنَّجْمُ وَالشَّجَرُ يَسْجُدَانِ ﴿٦﴾

অনুবাদ (৬): আর তৃণলতা ও বৃক্ষ তাঁকে সিজদা করে।

وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ ﴿٧﴾

অনুবাদ (৭): তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড (ভারসাম্য),

أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ ﴿٨﴾

অনুবাদ (৮): যাতে তোমরা মানদণ্ডে সীমালঙ্ঘন না করো।

وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ ﴿٩﴾

অনুবাদ (৯): আর ন্যায্যভাবে ওজন প্রতিষ্ঠা করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।

وَالْأَرْضَ وَضَعَهَا لِلْأَنَامِ ﴿١٠﴾

অনুবাদ (১০): আর পৃথিবীকে তিনি স্থাপন করেছেন সৃষ্টিকুলের জন্য।

فِيهَا فَاكِهَةٌ وَالنَّخْلُ ذَاتُ الْأَكْمَامِ ﴿١١﴾

অনুবাদ (১১): এতে রয়েছে ফলমূল এবং আবরণবিশিষ্ট খেজুর গাছ,

وَالْحَبُّ ذُو الْعَصْفِ وَالرَّيْحَانُ ﴿١٢﴾

অনুবাদ (১২): আর খোসাযুক্ত শস্য ও সুগন্ধি উদ্ভিদ।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿١٣﴾

প্রশ্ন (১৩): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২ (আয়াত ১৬)

প্রসঙ্গ: মানুষ ও জিনের সৃষ্টি

خَلَقَ الْإِنسَانَ مِن صَلْصَالٍ كَالْفَخَّارِ ﴿١٤﴾

অনুবাদ (১৪): তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পোড়ামাটির মতো শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে,

وَخَلَقَ الْجَانَّ مِن مَّارِجٍ مِّن نَّارٍ ﴿١٥﴾

অনুবাদ (১৫): আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াহীন অগ্নিশিখা থেকে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿١٦﴾

প্রশ্ন (১৬): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৩ (আয়াত ১৮)

প্রসঙ্গ: দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের প্রতিপালক

رَبُّ الْمَشْرِقَيْنِ وَرَبُّ الْمَغْرِبَيْنِ ﴿١٧﴾

অনুবাদ (১৭): তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের প্রতিপালক।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿١٨﴾

প্রশ্ন (১৮): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৪ (আয়াত ২১)

প্রসঙ্গ: দুই সমুদ্রের মিলন ও অন্তরাল

مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ يَلْتَقِيَانِ ﴿١٩﴾

অনুবাদ (১৯): তিনি প্রবাহিত করেছেন দুই সমুদ্র, যারা পরস্পর মিলিত হয়;

بَيْنَهُمَا بَرْزَخٌ لَّا يَبْغِيَانِ ﴿٢٠﴾

অনুবাদ (২০): উভয়ের মাঝে রয়েছে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করে না।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٢١﴾

প্রশ্ন (২১): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৫ (আয়াত ২৩)

প্রসঙ্গ: মুক্তা ও প্রবাল

يَخْرُجُ مِنْهُمَا اللُّؤْلُؤُ وَالْمَرْجَانُ ﴿٢٢﴾

অনুবাদ (২২): উভয় থেকে বের হয় মুক্তা ও প্রবাল।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٢٣﴾

প্রশ্ন (২৩): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৬ (আয়াত ২৫)

প্রসঙ্গ: সমুদ্রে চলমান নৌযান

وَلَهُ الْجَوَارِ الْمُنشَآتُ فِي الْبَحْرِ كَالْأَعْلَامِ ﴿٢٤﴾

অনুবাদ (২৪): সমুদ্রে পাহাড়ের মতো উঁচু চলমান নৌযানগুলো তাঁরই নিয়ন্ত্রণে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٢٥﴾

প্রশ্ন (২৫): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৭ (আয়াত ২৮)

প্রসঙ্গ: সবকিছুর বিনাশ ও আল্লাহর চিরস্থায়িত্ব

كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ﴿٢٦﴾

অনুবাদ (২৬): ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, সবই নশ্বর।

وَيَبْقَىٰ وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ﴿٢٧﴾

অনুবাদ (২৭): চিরস্থায়ী থাকবে শুধু তোমার প্রতিপালকের সত্তা, যিনি মহিমাময় ও মহানুভব।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٢٨﴾

প্রশ্ন (২৮): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৮ (আয়াত ৩০)

প্রসঙ্গ: সমগ্র সৃষ্টি তাঁর কাছে প্রার্থী

يَسْأَلُهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ ﴿٢٩﴾

অনুবাদ (২৯): আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থনা করে। প্রতিদিন তিনি কোনো না কোনো মহান কাজে রত।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٠﴾

প্রশ্ন (৩০): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৯ (আয়াত ৩২)

প্রসঙ্গ: হিসাব গ্রহণের ঘোষণা

سَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَ الثَّقَلَانِ ﴿٣١﴾

অনুবাদ (৩১): হে মানুষ ও জিন! অচিরেই আমি তোমাদের হিসাব গ্রহণে মনোনিবেশ করব।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٢﴾

প্রশ্ন (৩২): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১০ (আয়াত ৩৪)

প্রসঙ্গ: আকাশ ও পৃথিবীর সীমা অতিক্রমের চ্যালেঞ্জ

يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَن تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانفُذُوا ۚ لَا تَنفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ ﴿٣٣﴾

অনুবাদ (৩৩): হে জিন ও মানবসম্প্রদায়! আকাশ ও পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করতে পারলে অতিক্রম করো; কিন্তু (আল্লাহর দেওয়া) শক্তি ছাড়া তোমরা তা পারবে না।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٤﴾

প্রশ্ন (৩৪): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১১ (আয়াত ৩৬)

প্রসঙ্গ: অগ্নিশিখা ও ধোঁয়ার শাস্তি

يُرْسَلُ عَلَيْكُمَا شُوَاظٌ مِّن نَّارٍ وَنُحَاسٌ فَلَا تَنتَصِرَانِ ﴿٣٥﴾

অনুবাদ (৩৫): তোমাদের উভয়ের প্রতি পাঠানো হবে অগ্নিশিখা ও ধোঁয়া (মতান্তরে গলিত তামা), তখন তোমরা আত্মরক্ষা করতে পারবে না।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٦﴾

প্রশ্ন (৩৬): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১২ (আয়াত ৩৮)

প্রসঙ্গ: কিয়ামতের দিন আকাশ বিদীর্ণ হওয়া

فَإِذَا انشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ ﴿٣٧﴾

অনুবাদ (৩৭): যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং তা লাল চামড়া বা গলিত তেলের মতো রক্তবর্ণ হয়ে যাবে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٣٨﴾

প্রশ্ন (৩৮): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৩ (আয়াত ৪০)

প্রসঙ্গ: সেদিন জিজ্ঞাসার প্রয়োজন থাকবে না

فَيَوْمَئِذٍ لَّا يُسْأَلُ عَن ذَنبِهِ إِنسٌ وَلَا جَانٌّ ﴿٣٩﴾

অনুবাদ (৩৯): সেদিন কোনো মানুষ বা জিনকে তার অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন হবে না।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٤٠﴾

প্রশ্ন (৪০): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৪ (আয়াত ৪২)

প্রসঙ্গ: অপরাধীদের চিহ্ন

يُعْرَفُ الْمُجْرِمُونَ بِسِيمَاهُمْ فَيُؤْخَذُ بِالنَّوَاصِي وَالْأَقْدَامِ ﴿٤١﴾

অনুবাদ (৪১): অপরাধীদের চেনা যাবে তাদের চিহ্ন দেখে; অতঃপর তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে নেওয়া হবে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٤٢﴾

প্রশ্ন (৪২): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৫ (আয়াত ৪৫)

প্রসঙ্গ: জাহান্নাম ও ফুটন্ত পানি

هَٰذِهِ جَهَنَّمُ الَّتِي يُكَذِّبُ بِهَا الْمُجْرِمُونَ ﴿٤٣﴾

অনুবাদ (৪৩): এটিই সেই জাহান্নাম, যাকে অপরাধীরা মিথ্যা বলত।

يَطُوفُونَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ حَمِيمٍ آنٍ ﴿٤٤﴾

অনুবাদ (৪৪): তারা জাহান্নামের আগুন ও ফুটন্ত পানির মাঝে ছোটাছুটি করবে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٤٥﴾

প্রশ্ন (৪৫): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৬ (আয়াত ৪৭)

প্রসঙ্গ: আল্লাহকে ভয়কারীর জন্য দুটি জান্নাত

وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ ﴿٤٦﴾

অনুবাদ (৪৬): আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٤٧﴾

প্রশ্ন (৪৭): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৭ (আয়াত ৪৯)

প্রসঙ্গ: ঘন শাখাপল্লব

ذَوَاتَا أَفْنَانٍ ﴿٤٨﴾

অনুবাদ (৪৮): উভয়ই ঘন শাখাপল্লবে ভরপুর।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٤٩﴾

প্রশ্ন (৪৯): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৮ (আয়াত ৫১)

প্রসঙ্গ: দুটি প্রবহমান ঝরনা

فِيهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيَانِ ﴿٥٠﴾

অনুবাদ (৫০): উভয়ের মধ্যে রয়েছে দুটি প্রবহমান ঝরনা।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٥١﴾

প্রশ্ন (৫১): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ১৯ (আয়াত ৫৩)

প্রসঙ্গ: জোড়ায় জোড়ায় ফল

فِيهِمَا مِن كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ ﴿٥٢﴾

অনুবাদ (৫২): উভয়ের মধ্যে রয়েছে প্রত্যেক ফলের দুই প্রকার।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٥٣﴾

প্রশ্ন (৫৩): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২০ (আয়াত ৫৫)

প্রসঙ্গ: রেশমি শয্যা ও নাগালের ফল

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ ۚ وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ ﴿٥٤﴾

অনুবাদ (৫৪): তারা হেলান দিয়ে বসবে এমন শয্যায়, যার আস্তরণ পুরু রেশমের; আর দুই জান্নাতের ফল থাকবে হাতের নাগালে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٥٥﴾

প্রশ্ন (৫৫): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২১ (আয়াত ৫৭)

প্রসঙ্গ: সংযত দৃষ্টির সঙ্গিনী

فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ ﴿٥٦﴾

অনুবাদ (৫৬): সেখানে থাকবে সংযত দৃষ্টির সঙ্গিনীগণ, যাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন স্পর্শ করেনি।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٥٧﴾

প্রশ্ন (৫৭): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২২ (আয়াত ৫৯)

প্রসঙ্গ: ইয়াকুত ও প্রবালের সৌন্দর্য

كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوتُ وَالْمَرْجَانُ ﴿٥٨﴾

অনুবাদ (৫৮): তারা যেন ইয়াকুত (পদ্মরাগমণি) ও প্রবাল।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٥٩﴾

প্রশ্ন (৫৯): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৩ (আয়াত ৬১)

প্রসঙ্গ: উত্তম কাজের উত্তম প্রতিদান

هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ ﴿٦٠﴾

অনুবাদ (৬০): উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে?

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٦١﴾

প্রশ্ন (৬১): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৪ (আয়াত ৬৩)

প্রসঙ্গ: আরও দুটি জান্নাত

وَمِن دُونِهِمَا جَنَّتَانِ ﴿٦٢﴾

অনুবাদ (৬২): এ দুটি ছাড়াও রয়েছে আরও দুটি জান্নাত।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٦٣﴾

প্রশ্ন (৬৩): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৫ (আয়াত ৬৫)

প্রসঙ্গ: গাঢ় সবুজ উদ্যান

مُدْهَامَّتَانِ ﴿٦٤﴾

অনুবাদ (৬৪): গাঢ় সবুজে উভয়ই প্রায় কালচে।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٦٥﴾

প্রশ্ন (৬৫): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৬ (আয়াত ৬৭)

প্রসঙ্গ: দুটি উচ্ছলিত ঝরনা

فِيهِمَا عَيْنَانِ نَضَّاخَتَانِ ﴿٦٦﴾

অনুবাদ (৬৬): উভয়ের মধ্যে রয়েছে দুটি উচ্ছলিত ঝরনা।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٦٧﴾

প্রশ্ন (৬৭): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৭ (আয়াত ৬৯)

প্রসঙ্গ: ফলমূল, খেজুর ও ডালিম

فِيهِمَا فَاكِهَةٌ وَنَخْلٌ وَرُمَّانٌ ﴿٦٨﴾

অনুবাদ (৬৮): উভয়ের মধ্যে রয়েছে ফলমূল, খেজুর ও ডালিম।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٦٩﴾

প্রশ্ন (৬৯): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৮ (আয়াত ৭১)

প্রসঙ্গ: সচ্চরিত্রা ও সুন্দরী সঙ্গিনী

فِيهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ ﴿٧٠﴾

অনুবাদ (৭০): সেখানে থাকবে সচ্চরিত্রা ও সুন্দরী সঙ্গিনীগণ।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٧١﴾

প্রশ্ন (৭১): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ২৯ (আয়াত ৭৩)

প্রসঙ্গ: তাঁবুতে সুরক্ষিত হুর

حُورٌ مَّقْصُورَاتٌ فِي الْخِيَامِ ﴿٧٢﴾

অনুবাদ (৭২): তাঁবুতে সুরক্ষিত আয়তলোচনা হুর।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٧٣﴾

প্রশ্ন (৭৩): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৩০ (আয়াত ৭৫)

প্রসঙ্গ: পবিত্র ও অস্পৃষ্টা সঙ্গিনী

لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ ﴿٧٤﴾

অনুবাদ (৭৪): তাদের আগে কোনো মানুষ বা জিন তাদের স্পর্শ করেনি।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٧٥﴾

প্রশ্ন (৭৫): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

প্রশ্ন ৩১ (আয়াত ৭৭)

প্রসঙ্গ: সবুজ গালিচা ও মনোরম বিছানা

مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ ﴿٧٦﴾

অনুবাদ (৭৬): তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ গালিচা ও মনোরম মূল্যবান বিছানায়।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ﴿٧٧﴾

প্রশ্ন (৭৭): “অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

সূরার সমাপ্তি (আয়াত ৭৮)

تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ﴿٧٨﴾

অনুবাদ (৭৮): মহিমাময় ও মহানুভব তোমার প্রতিপালকের নাম অতি বরকতময়।

লক্ষণীয়, প্রথম আটটি প্রশ্ন এসেছে সৃষ্টিজগতের নিয়ামতের পর, পরের সাতটি এসেছে কিয়ামত ও জাহান্নামের সতর্কবাণীর পর, আর শেষ ষোলোটি এসেছে জান্নাতের প্রতিদানের বর্ণনার পর। অর্থাৎ নিয়ামত, সতর্কতা ও পুরস্কার—তিন প্রেক্ষাপটেই মানুষকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি করা হয়েছে।

উপসংহার: সমস্যা নিয়ামতের অভাব নয়, উপলব্ধির অভাব

সূরা আর-রহমানের ৩১ বার ফিরে আসা প্রশ্নটি আসলে আমাদের আত্মসমালোচনার আয়না। এত নিয়ামতের বর্ণনা শোনার পরও মানুষ কেন বারবার ভুলে যায়? কেন যা হারিয়েছে তার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অথচ যা পেয়েছে তার মূল্য বোঝে না?

উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অভ্যাসে। পরিচিত বিষয়কে আমরা স্বাভাবিক ধরে নিই, আর মন ঝুঁকে পড়ে অভাব ও অপূর্ণতার দিকে। অথচ যে শ্বাস নিচ্ছি, যে আলোয় পৃথিবী দেখছি, যে খাবারে বেঁচে আছি, যে জ্ঞান অর্জন করছি—সবই আল্লাহর অনুগ্রহ।

নিয়ামত সম্পর্কে সচেতন হওয়া মানে দুঃখমুক্ত জীবন নয়। এর অর্থ দুঃখের মধ্যেও সত্যকে স্বীকার করা, প্রাপ্তির মূল্য বোঝা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং সামর্থ্যকে কল্যাণের পথে কাজে লাগানো।

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ

“অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: আমার জীবনে এমন কত নিয়ামত আছে, যেগুলোকে এতটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি যে কৃতজ্ঞ হতেও ভুলে গেছি? হয়তো সব সমস্যার সমাধান আজই হবে না, সব প্রত্যাশাও পূরণ হবে না। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি আজ থেকেই বদলানো যায়: অভাবের পাশে প্রাপ্তিকে দেখা, অভিযোগের পাশে কৃতজ্ঞতাকে জায়গা দেওয়া।

মহান আল্লাহ আমাদের তাঁর নিয়ামত চেনার, আন্তরিকভাবে শোকর আদায় করার এবং প্রাপ্ত সামর্থ্যকে ন্যায় ও কল্যাণের পথে ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র

১. সূরা আর-রহমান (৫৫), সম্পূর্ণ সূরা: https://quran.com/55

২. সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৩ (পুনরাবৃত্ত আয়াত): https://quran.com/55/13

৩. সূরা আর-রহমান, ৫৫:১–৪: https://quran.com/55/1-4

৪. সূরা আর-রহমান, ৫৫:৭–৯ (ভারসাম্য): https://quran.com/55/7-9

৫. সূরা আর-রহমান, ৫৫:৬০: https://quran.com/55/60

৬. সূরা আন-নাহল, ১৬:১৮: https://quran.com/16/18

৭. সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭: https://quran.com/14/7

৮. সূরা আবাসা, ৮০:২৪–৩২: https://quran.com/80/24-32

৯. সূরা আদ-দুহা, ৯৩:১১: https://quran.com/93/11

১০. জামে তিরমিজি, হাদিস ৩২৯১ (জিনদের জবাব): https://sunnah.com/tirmidhi:3291

১১. সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২ (সুস্থতা ও অবসর): https://sunnah.com/bukhari:6412

১২. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৮১১ (মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা): https://sunnah.com/abudawud:4811

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।