সূরা আল মুলক

সূরা আল মুলক এ আল্লাহর চ্যালেঞ্জ : অন্ধ প্রশংসা নয়, পরীক্ষার আহ্বান

সূরা আল মুলক এ আল্লাহর চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ চৌদ্দশ বছরেরও বেশি আগে ঘোষিত হয়েছে, অথচ আজ পর্যন্ত মানব ইতিহাসে কেউ এতে জয়ী হতে পারেনি। পবিত্র কুরআনের ৬৭তম সূরা আল-মুলক, যার অর্থ সার্বভৌমত্ব বা রাজত্ব। ত্রিশ আয়াতের এই সূরাটি মুসলিম সমাজে অত্যন্ত পরিচিত। অনেকেই প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে এটি তিলাওয়াত করেন।

জামে তিরমিজির একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কুরআনে ত্রিশ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। সেই সূরাটি হলো তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক, অর্থাৎ সূরা মুলক।

কিন্তু এই সূরার ফজিলতের পাশাপাশি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর আহ্বান। এখানে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আমাদের অন্ধের মতো তাঁর প্রশংসা করতে বলছেন না। বরং তিনি বলছেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করো।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার নতুন একটি সেতু জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আগে তার প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করেন। তিনি খুঁজে দেখেন কোথাও ফাটল আছে কি না, কোনো জোড়া দুর্বল কি না, কোনো কাঠামো বেঁকে গেছে কি না। এই পরীক্ষাকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল হেলথ চেক।

সূরা মুলকে আল্লাহ মানুষকে ঠিক এমন একজন পরিদর্শকের আসনে বসিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট আকাশ, সাত স্তরের আসমান, পুরো মহাবিশ্ব সামনে রেখে তিনি বলছেন, পরীক্ষা করে দেখো। একটি মাত্র ত্রুটি খুঁজে বের করো। এই লেখায় আমরা সেই চ্যালেঞ্জের প্রতিটি শব্দ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।

আয়াতের বার্তা: সূরা মুলকের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াত

পবিত্র কুরআনে সূরা মুলকের তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন:

الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا ۖ مَّا تَرَىٰ فِي خَلْقِ الرَّحْمَٰنِ مِن تَفَاوُتٍ ۖ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ

অর্থ: “যিনি স্তরে স্তরে সাতটি আসমান সৃষ্টি করেছেন। পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসঙ্গতি দেখতে পাবে না। অতএব, দৃষ্টি ফেরাও, কোনো ফাটল দেখতে পাচ্ছ কি?” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩)

এর ঠিক পরের আয়াতে, অর্থাৎ চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে:

ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ

অর্থ: “তারপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফেরাও, সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে।” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:৪)

এই দুটি আয়াত একসাথে পড়লে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমে একটি দাবি: সৃষ্টিতে কোনো অসঙ্গতি নেই। তারপর একটি আহ্বান: নিজে পরীক্ষা করে দেখো। এরপর আরও জোরালো আহ্বান: আবার দেখো, বারবার দেখো। আর সবশেষে ফলাফলের ঘোষণা: তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, এখানে আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন “আর-রাহমান” অর্থাৎ পরম করুণাময় নামে। সৃষ্টির নিখুঁত ভারসাম্য তাঁর দয়ারই প্রকাশ। কারণ আকাশ ও মহাবিশ্বের এই নিখুঁত শৃঙ্খলা না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বই সম্ভব হতো না।

ফারজিয়িল বাসার: তাকাও নয়, ফিরে তাকাও

এটি পুরো কুরআনের সবচেয়ে সাহসী ও উন্মুক্ত আহ্বানগুলোর একটি। এখানে স্রষ্টা সরাসরি বলছেন, আমার সৃষ্টিকে পরীক্ষা করে দেখো। এগিয়ে যাও, একটি মাত্র ত্রুটি খুঁজে বের করো।

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন, “فَارْجِعِ الْبَصَرَ” (ফারজিয়িল বাসার), অর্থাৎ তোমার দৃষ্টি ফেরাও। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ্য করুন। আল্লাহ বলেননি “انْظُرْ” (উনযুর), যার অর্থ তাকাও। তিনি বলেছেন “ارْجِعْ” (ইরজি’), যার অর্থ ফিরিয়ে আনো বা আবার ফেরাও।

এই শব্দচয়নের মধ্যে একটি গভীর ইঙ্গিত রয়েছে। আয়াতটি ধরে নিচ্ছে যে আপনি ইতিমধ্যে একবার আকাশের দিকে তাকিয়েছেন। মানুষ জন্ম থেকেই আকাশ দেখে আসছে। রাতের তারা, দিনের নীল আকাশ, মেঘের আনাগোনা, এসব মানুষের কাছে পরিচিত দৃশ্য।

কিন্তু পরিচিত জিনিস আমরা সাধারণত মনোযোগ দিয়ে দেখি না। প্রতিদিন যে আকাশ মাথার উপর থাকে, তার দিকে আমরা কজনই বা ভাবনা নিয়ে তাকাই? তাই আল্লাহ বলছেন, যে দৃষ্টি তুমি একবার দিয়েছ, সেটিকে আবার ফিরিয়ে আনো। এবার সাধারণ দর্শক হিসেবে নয়, একজন পরীক্ষক হিসেবে দেখো।

এটি অনেকটা একজন বিচারকের দ্বিতীয়বার নথিপত্র পর্যালোচনার মতো। প্রথমবার তিনি সামগ্রিক চিত্র দেখেন। দ্বিতীয়বার তিনি খোঁজেন ভুল, অসঙ্গতি আর ফাঁক। সূরা মুলক মানুষকে এই দ্বিতীয় দৃষ্টি, এই সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে।

ফুতুর: একটি শব্দে লুকানো গভীর অর্থ

এরপর আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা প্রশ্ন করছেন, “هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ” (হাল তারা মিন ফুতুর), অর্থাৎ তুমি কি কোনো ফুতুর দেখতে পাচ্ছ?

এখানে আল্লাহ আকাশের সৌন্দর্য, তারার ঝলমলে আলো কিংবা মেঘমালার কথা বলেননি। তিনি নির্দিষ্ট করে একটি শব্দ বেছে নিয়েছেন, “فُطُور” (ফুতুর)। এটি একটি অসাধারণ শব্দ।

ফুতুর শব্দটি এসেছে আরবি মূলধাতু ف-ط-ر (ফা-তা-রা) থেকে, যার মৌলিক অর্থ চিরে ফেলা বা বিদীর্ণ করা। তাই ফুতুর মানে কেবল সাধারণ কোনো ত্রুটি নয়। এর অর্থ হলো কাঠামোগত ফাটল, চির, ভাঙন বা ফাঁক। অর্থাৎ এমন কোনো দুর্বলতা, যা পুরো কাঠামোর অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মজার বিষয় হলো, একই মূলধাতু থেকে এসেছে আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম “فَاطِر” (ফাতির), অর্থাৎ যিনি অস্তিত্বহীনতা থেকে সৃষ্টিকে প্রথম অস্তিত্বে এনেছেন। কুরআনের ৩৫তম সূরার নামও সূরা ফাতির। যিনি সৃষ্টিকে শূন্য থেকে উদ্ভাসিত করেছেন, তিনিই চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন, তাঁর সৃষ্টিতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চির খুঁজে দেখো।

এই আয়াতের আগের অংশে আরেকটি শব্দ এসেছে, “تَفَاوُت” (তাফাউত), যার অর্থ অসামঞ্জস্য বা বৈষম্য। তাফাউত বোঝায় অনুপাতের গরমিল, যেখানে একটি অংশ অন্যটির সাথে খাপ খায় না। আর ফুতুর বোঝায় ভৌত ফাটল। এই দুই শব্দ মিলে আল্লাহ দুটি স্তরেই চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন: নকশার ভারসাম্যে কোনো গরমিল নেই, আর কাঠামোয় কোনো ফাটল নেই।

ইঞ্জিনিয়ারের উদাহরণে ফিরে গেলে বোঝা যায়, একটি সেতুর নকশা সুন্দর হলেও যদি কোথাও একটি ফাটল থাকে, তবে পুরো সেতুই বিপজ্জনক। তাই ফুতুর শব্দটি বেছে নেওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহ সৃষ্টির সৌন্দর্য নয়, তার কাঠামোগত পূর্ণতাকে পরীক্ষার বিষয় বানিয়েছেন।

কাররাতাইন বনাম মাররাতাইন: শব্দচয়নের অলৌকিকতা

অনেক অনুবাদে চতুর্থ আয়াতের অর্থ করা হয়, “তারপর আবার দুবার দৃষ্টি ফেরাও।” কিন্তু আরবিতে ঠিক এভাবে বলা হয়নি। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেছেন, “ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ” (সুম্মারজিয়িল বাসারা কাররাতাইন)।

শব্দটি হলো “كَرَّتَيْنِ” (কাররাতাইন), “مَرَّتَيْنِ” (মাররাতাইন) নয়। এই শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ যদি কেবল সংখ্যাগতভাবে দুবার বোঝাতে চাইতেন, তবে আরবিতে তার জন্য একটি সহজ শব্দ আছে, মাররাতাইন। কুরআনের অন্য জায়গায় এই শব্দ সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এখানে আল্লাহ বেছে নিয়েছেন কাররাতাইন।

কাররাতাইন এসেছে মূলধাতু ك-ر-ر (কা-রা-রা) থেকে। এর অর্থ কোনো কিছুতে বারবার ফিরে আসা, পুনরায় আক্রমণ করা বা নতুন উদ্যমে আবার চেষ্টা করা। আরবি ভাষায় “কার্রা” শব্দটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো, যখন একজন যোদ্ধা পিছু হটে আবার পূর্ণ শক্তিতে শত্রুর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। বাংলায় আমরা যে “তাকরার” বা পুনরাবৃত্তি শব্দ শুনি, সেটিও এই একই মূল থেকে এসেছে।

তাই প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ, যেমন ইমাম ইবনে কাসির ও ইমাম কুরতুবি, ব্যাখ্যা করেছেন যে এখানে “দুবার” বলতে নির্দিষ্ট সংখ্যা বোঝানো হয়নি। বরং এর অর্থ বারবার, একের পর এক, যতবার ইচ্ছা। আরবি ভাষায় দ্বিবচন অনেক সময় আধিক্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যেমন বাংলায় আমরা বলি “দু-চারবার”।

অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন, শুধু একবার দেখে থেমে যেয়ো না। পূর্ণ মনোযোগ ও শক্তি নিয়ে বারবার ফিরে এসো। প্রতিবার নতুন কৌশলে খোঁজো। এই কারণেই ইসলামি স্কলাররা এই আয়াতগুলোকে একটি উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন, যার কোনো সময়সীমা নেই এবং যাতে অংশগ্রহণের সংখ্যারও কোনো সীমা নেই।

খাসিআন ওয়া হুয়া হাসির: চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফল

কিন্তু আপনি অনুসন্ধান শুরু করার আগেই আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা একই আয়াতের শেষাংশে চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফল জানিয়ে দিয়েছেন:

يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ

অর্থ: “দৃষ্টি তোমার দিকে ফিরে আসবে ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত অবস্থায়।”

এখানে দুটি শব্দ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমটি “خَاسِئًا” (খাসিআন)। এর অর্থ লাঞ্ছিত, ব্যর্থ, খালি হাতে ফিরে আসা। আরবিতে শব্দটি এমন কাউকে বোঝায় যাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং যে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ দৃষ্টি যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিল, ফাটল খোঁজার উদ্দেশ্যে, সেটি পূরণ না করেই ফিরে আসবে।

দ্বিতীয় শব্দটি “حَسِيرٌ” (হাসির)। এর অর্থ ক্লান্ত, অবসন্ন, শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। আরবরা এই শব্দ ব্যবহার করত সেই উটের ক্ষেত্রে, যে দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে আর চলতে পারে না।

এই দুই শব্দ মিলে একটি পূর্ণ চিত্র তৈরি করে। পর্যবেক্ষক কেবল ব্যর্থই হবে না, বরং সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করার পর ক্লান্ত হয়ে ফিরবে। এটি কোনো অলস চেষ্টার ফলাফল নয়। এটি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরের পরাজয়।

আরবি ব্যাকরণেও এখানে একটি সূক্ষ্মতা রয়েছে। “يَنقَلِبْ” (ইয়ানকালিব) ক্রিয়াটি এসেছে আদেশসূচক বাক্যের জবাব হিসেবে। অর্থাৎ বাক্যের গঠনই বলছে: তুমি যদি বারবার দেখো, তাহলে অবশ্যম্ভাবী ফল এটাই হবে। কারণ ও ফলাফল একই বাক্যে গাঁথা।

যুগে যুগে মানুষের দৃষ্টি ও এই চ্যালেঞ্জ

সপ্তম শতাব্দীতে যখন এই আয়াত নাজিল হয়, তখন মানুষের কাছে আকাশ দেখার একমাত্র মাধ্যম ছিল খালি চোখ। তারপর এসেছে টেলিস্কোপ। গ্যালিলিও আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদের পাহাড় আর বৃহস্পতির উপগ্রহ দেখেছেন। এরপর এসেছে বিশাল মানমন্দির, রেডিও টেলিস্কোপ, মহাকাশে স্থাপিত হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।

মানুষের দৃষ্টি এখন কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে পৌঁছে গেছে। কাররাতাইনের সেই আহ্বান, বারবার নতুন শক্তিতে ফিরে দেখার আহ্বান, মানবজাতি যেন যন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে চলেছে। প্রতিটি নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ আগের চেয়ে আরও গভীরে, আরও সূক্ষ্মভাবে দেখছে।

আর এই অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা বারবার যা খুঁজে পেয়েছেন তা হলো বিস্ময়কর শৃঙ্খলা। মহাবিশ্ব একই ভৌত নিয়মে পরিচালিত হয়, তা পৃথিবীতে হোক বা শতকোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো ছায়াপথে। মহাকর্ষ বল, আলোর গতি, পারমাণবিক বলের মান এতটাই সূক্ষ্মভাবে নির্ধারিত যে, সামান্য পরিবর্তনেও তারা, গ্রহ কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হতো না। বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টিকে “ফাইন টিউনিং” নামে আলোচনা করেন।

অবশ্যই কুরআন বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। এটি হিদায়াতের গ্রন্থ, এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। তাই কুরআনের আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে জোর করে মেলানো উচিত নয়। কিন্তু এই আয়াতের মূল আহ্বান, পর্যবেক্ষণ করো, প্রশ্ন করো, পরীক্ষা করো, সেটি বৈজ্ঞানিক মানসিকতারই প্রতিধ্বনি।

ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম জ্যোতির্বিদরা, যেমন আল-বাত্তানি ও আল-বিরুনি, আকাশ পর্যবেক্ষণকে ইবাদতের অংশ হিসেবেই দেখতেন। তাঁদের কাছে আকাশের দিকে তাকানো ছিল কুরআনের এই আহ্বানে সাড়া দেওয়া।

উপসংহার: আকাশ বদলায় না, বদলায় পর্যবেক্ষক

সূরা মুলকের এই আয়াতগুলো থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি পাওয়া যায় তা হলো, আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কখনো মানুষের কাছ থেকে অন্ধবিশ্বাস দাবি করেন না। তিনি মানুষকে যুক্তি, বুদ্ধি এবং গভীর পর্যবেক্ষণ দিয়ে সত্যকে যাচাই করার আমন্ত্রণ জানান।

তিনি বলছেন, ফিরে যাও, আবার দেখো, আরও শক্তভাবে খোঁজো। ফাটলটা ঠিক কোথায়? বের করো। এটি এমন এক স্রষ্টার কথা, যিনি নিজের সৃষ্টির পূর্ণতা নিয়ে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। কোনো মানুষ নির্মাতা তার কাজের ব্যাপারে এমন দাবি করতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে মজবুত সেতুও একদিন ক্ষয়ে যায়, সবচেয়ে উন্নত যন্ত্রও একদিন বিকল হয়।

আর এখানেই এই আয়াতের সবচেয়ে বড় আইরনি বা বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে। এই পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় আকাশের কোনো পরিবর্তনই হয় না। আকাশ তার জায়গায় অপরিবর্তিত ও নিখুঁত থাকে। বদলে যায় কেবল সেই মানুষটি, যে পর্যবেক্ষণ করছিল।

সে খুঁজতে গিয়েছিল ত্রুটি, কিন্তু ফিরে এসেছে ক্লান্ত দৃষ্টি আর বিনম্র হৃদয় নিয়ে। সে পরীক্ষক হিসেবে শুরু করেছিল, কিন্তু শেষ করেছে বিস্মিত এক বান্দা হিসেবে। এটাই হয়তো এই চ্যালেঞ্জের আসল উদ্দেশ্য। আকাশে ফাটল খোঁজা নয়, বরং নিজের অহংকারের ফাটল খুঁজে পাওয়া।

তাই পরের বার রাতের আকাশের দিকে তাকালে একটু থামুন। সূরা মুলকের এই আয়াতগুলো মনে করুন। দৃষ্টি ফেরান, আবার দেখুন, বারবার দেখুন। আর অনুভব করুন, পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে সত্যিই কোনো অসঙ্গতি নেই।

আরও পড়ুন: সূরা মুলকের ফজিলত ও প্রতিরাতে তিলাওয়াতের গুরুত্ব

তথ্যসূত্র

  1. সূরা আল-মুলক, আয়াত ৩: quran.com/67/3
  2. সূরা আল-মুলক, আয়াত ৪: quran.com/67/4
  3. সূরা আল-মুলক পূর্ণ পাঠ: quran.com/al-mulk
  4. আয়াত ৬৭:৩-এর শব্দে শব্দে বিশ্লেষণ, কুরআনিক অ্যারাবিক কর্পাস: corpus.quran.com
  5. তাফসির ইবনে কাসির, সূরা মুলক: quran.com তাফসির
  6. সূরা মুলকের ফজিলত, জামে তিরমিজি, হাদিস ২৮৯১: sunnah.com/tirmidhi:2891

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।