আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী শেষযাত্রা: একটি যুগের অবসান, ইরানের আত্মসমীক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা



ইতিহাসে কিছু মৃত্যু কেবল একজন মানুষের বিদায় নয়; তা হয়ে ওঠে একটি আদর্শ, একটি রাজনৈতিক দর্শন, একটি আঞ্চলিক শক্তির কৌশল এবং একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীক। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির মৃত্যু ও তাঁর রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রা ঠিক এমনই একটি ঘটনা।
১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনি যখন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো স্বল্পমেয়াদি বা অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হবেন। কিন্তু পরবর্তী সাঁইত্রিশ বছরে তিনি হয়ে ওঠেন ইরানের রাজনীতি, সামরিক কৌশল, বৈদেশিক নীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব বিস্তারের প্রধান স্থপতি। ফলে তাঁর মৃত্যু শুধু ইরানের জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।
যুদ্ধের প্রথম আঘাতে মৃত্যু, চার মাস পর শেষবিদায়
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম হামলাতেই তেহরানে নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনি। একই হামলায় প্রাণ হারান তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও, যাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর এক কন্যা, জামাতা, শিশু নাতনি এবং পুত্র মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল।
মূলত মার্চ মাসেই জানাজা অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় তা স্থগিত করা হয়। ফলে চার মাসেরও বেশি সময় তাঁর মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় থাকে। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় বহুধাপের রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রা, যা দুটি দেশের পাঁচটি শহর ঘুরে শেষ হয় তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে।
এই প্রেক্ষাপট শেষযাত্রাটিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে। অঞ্চলটি তখন কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম তীব্র ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর শোকানুষ্ঠান চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার খবর আসে। ফলে এই বিদায় কেবল একটি জাতীয় শোকানুষ্ঠান থাকেনি; তা পরিণত হয় বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের নজরকাড়া এক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনায়।
শিয়া ঐতিহ্যে মৃত্যু, জানাজা ও শাহাদাতের প্রতীক
ইসলামে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং পার্থিব জীবন থেকে অনন্ত জীবনের পথে যাত্রা। এই বিশ্বাস শিয়া ও সুন্নি উভয় ধারার মুসলমানের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে শিয়া ঐতিহ্যে যাঁরা ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন, তাঁদের জানাজা ও দাফন সাধারণত গভীর ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়।
খামেনির ক্ষেত্রে এই আবেগ আরও তীব্র হয়েছে তাঁর মৃত্যুর ধরনের কারণে। বিদেশি হামলায় নিহত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ভাষ্য তাঁর মৃত্যুকে কারবালার ঐতিহ্যের আলোকে “শাহাদাত” হিসেবে উপস্থাপন করেছে। শেষযাত্রার আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক কমিটির নামেও এই প্রতীকবাদ স্পষ্ট ছিল। ফলে শোকানুষ্ঠানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং জাতীয় প্রতীকবাদ একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, আর শিয়া বিশ্বের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে এই বিদায়কে প্রতীকীভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
তেহরান: গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শেষ শ্রদ্ধা
খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই ইরানের রাস্তাঘাট, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে কালো পতাকা উড়তে থাকে। এই কালো পতাকা শুধু শোকের চিহ্ন নয়; শিয়া ঐতিহ্যে তা সপ্তম শতকে কারবালায় ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের স্মৃতিকেও বহন করে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে খামেনিকে উপস্থাপন করা হয় “শহীদ ইমাম” হিসেবে, আর সেই প্রতীকবাদ গোটা শেষযাত্রায় স্পষ্ট ছিল।
জুলাইয়ের শুরুতে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে খামেনি ও তাঁর নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিন সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। ইরানের জাতীয় পতাকার লাল, সাদা ও সবুজ রঙে রাঙানো কফিনের সামনে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও শোকবার্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। ৬ জুলাই রাজধানীর রাজপথে বের হয় মূল শোকমিছিল।
ড্রোনচিত্রে দেখা যায় কালো পোশাক পরা মানুষের অন্তহীন সারি, হাতে ইরানের পতাকা, ধর্মীয় ব্যানার আর খামেনির প্রতিকৃতি। অনেকের হাতে কুরআন ও তাসবিহ, কেউ নীরবে দোয়া করছেন, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। রাতভর তেহরানের কেন্দ্রস্থলে মানুষের জটলা, স্লোগান আর পোস্টার বিতরণ চলতে থাকে।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন: এই বিপুল জনসমাগমকে সরলভাবে রাজনৈতিক সমর্থনের পরিমাপক হিসেবে দেখা উচিত নয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেকে বলেছেন, তাঁরা একজন ধর্মীয় নেতার জানাজায় অংশ নেওয়াকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করেছেন; কেউ এসেছেন জাতীয় শোকের অংশ হতে, কেউ ইতিহাসের একটি মুহূর্তের সাক্ষী হতে। সমালোচকেরা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের আহ্বানও জনসমাগম বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এভাবে শোক, ধর্মীয় আবেগ, রাষ্ট্রীয় আয়োজন ও রাজনৈতিক বার্তা মিলে শেষযাত্রাটি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ পায়।
বিপ্লবের উত্তরাধিকার থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা
এই শেষযাত্রার তাৎপর্য বুঝতে হলে খামেনির দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পথচলা জানা জরুরি। ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি তরুণ বয়সেই কুম ও মাশহাদের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন এবং শাহবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি দ্রুত রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন এবং আশির দশকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আশির দশকের শুরুতে তিনি নিজেও এক হত্যাচেষ্টার শিকার হন। ১৯৮১ সালে তেহরানের একটি মসজিদে বক্তৃতার সময় বোমা বিস্ফোরণে তাঁর ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমর্থকদের কাছে এই ঘটনা তাঁকে বিপ্লবের জন্য ত্যাগী নেতার মর্যাদা দেয়। একই বছর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের কঠিন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয়, যদিও তখন তাঁর ধর্মীয় পদমর্যাদা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল।
লাখো ইরানির কাছে তিনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইসলামি বিপ্লবের দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধান অভিভাবক। ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর সামনে ছিল ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার কঠিন চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী সাঁইত্রিশ বছরে তিনি রাষ্ট্রকে এমন এক কাঠামোয় রূপ দেন, যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যায়।
তাঁর নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতময় হয়ে ওঠে, কিন্তু একই সময়ে আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে তেহরানের কৌশলগত উপস্থিতি শক্তিশালী হয়। এই নীতির কেন্দ্রে ছিল “প্রতিরোধের অক্ষ” ধারণা, যা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা ও উত্তেজনা চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বারবার সংকটে পড়লেও চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠতা আরও গভীর হয়।
“প্রতিরোধের অক্ষ” বলতে মূলত লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী, ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন এবং একসময় সিরিয়ার আসাদ সরকারকে নিয়ে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক জোটকে বোঝানো হয়। সমর্থকদের চোখে এটি ছিল ইসরায়েল ও পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার কৌশল; সমালোচকদের চোখে এটি ছিল আঞ্চলিক সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার হাতিয়ার। খামেনির শাসনের শেষ বছরগুলোতে এই নেটওয়ার্ক বড় ধাক্কা খায়, আর তাঁর মৃত্যুর পর এর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
কুম: ধর্মীয় বৈধতা ও উত্তরাধিকারের প্রতীক
তেহরানের কর্মসূচি শেষে ৭ জুলাই মরদেহ নেওয়া হয় কুমে। কুম ইরানের শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র, যেখানে বহু মারজা ও উচ্চপর্যায়ের আলেমের শিক্ষাকার্যক্রম চলে। এখানেই তরুণ খামেনি একসময় ধর্মতত্ত্বের পাঠ নিয়েছিলেন।
কুমের শোকমিছিলে হাজারো মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও আলেম অংশ নেন। ধর্মীয় নেতারা খামেনির দীর্ঘ নেতৃত্ব, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনে তাঁর ভূমিকা এবং শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য দেন। বিশ্লেষকদের মতে, কুমের এই পর্বটি ছিল ধর্মীয় বৈধতা ও উত্তরাধিকারের প্রতীকী ঘোষণা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র নতুন নেতৃত্বের প্রতি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমর্থনের বার্তাও দিতে চেয়েছিল।
নাজাফ ও কারবালা: সীমান্ত পেরিয়ে শিয়া বিশ্বের বিদায়
কুমের পর শুরু হয় শেষযাত্রার আন্তর্জাতিক অধ্যায়। ইরাকি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধে ৮ জুলাই মরদেহ বিশেষ বিমানে ইরাকে নেওয়া হয়, যেখানে নাজাফ ও কারবালায় পৃথক শোকমিছিল ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হয়।
এই দুই শহর শিয়া মুসলিমদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর অন্যতম। নাজাফে রয়েছে ইমাম আলী (আ.)-এর মাজার, আর কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও হযরত আব্বাস (আ.)-এর মাজার। এখানে শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে ইরান শুধু ধর্মীয় দিকটিই তুলে ধরেনি; বরং বিশ্বজুড়ে শিয়া সম্প্রদায় এবং ইরাকের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার ঐতিহাসিক ও আদর্শিক প্রভাবেরও প্রকাশ ঘটিয়েছে। নাজাফ ও কারবালার রাস্তায় টানানো হয় খামেনির বিশাল প্রতিকৃতি, কালো ব্যানার ও শোকবার্তা।
ইরাকে জনসমাগম এতটাই বিপুল ছিল যে সেখানকার বিদায়ানুষ্ঠান নির্ধারিত সময় ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে মাশহাদে চূড়ান্ত শোকমিছিলের সময় সকাল থেকে পিছিয়ে দুপুরে নিতে হয়।
ইরাকে এই আয়োজন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বাগদাদের রাজনীতিতে তেহরানের প্রভাব দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। নাজাফ ও কারবালায় বিপুল জনসমাগম একদিকে ইরাকি শিয়া সমাজে খামেনির ধর্মীয় প্রভাবের প্রমাণ, অন্যদিকে ইরাকের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইরানের অব্যাহত উপস্থিতিরও প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে ইরাকের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় আলেমদের সরাসরি ভূমিকার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে, তাই এই আয়োজনকে সর্বজনীন সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক বার্তা
শেষযাত্রা ইরানের জন্য ছিল এক শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রদর্শনী। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানান, সত্তরটিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি শোকানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তেহরানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন, ইরাকের প্রেসিডেন্ট, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ।
চীন পাঠায় জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক হে ওয়েইকে। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা এবং বিহারের রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে যায়। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পশ্চিমা দেশগুলো এই আয়োজনে অনুপস্থিত ছিল, আর অধিকাংশ বিদেশি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশগ্রহণ শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বজায় রাখার একটি সচেতন বার্তা। অন্যদিকে তেহরানের জন্য এটি ছিল বিশ্বকে দেখানোর সুযোগ যে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তাও আসে। কেউ খামেনির মৃত্যুকে একজন গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক নেতার বিদায় হিসেবে উল্লেখ করেন, কেউ আবার মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও তেহরানে উপস্থিত ছিলেন, যা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের প্রতীকী প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়েছে। ভারতের প্রতিনিধিদলে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনীতিক ও শিয়া ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় খামেনির ধর্মীয় প্রভাবের একটি দিক তুলে ধরে।
একই সময়ে নিরাপত্তা উদ্বেগও তীব্র হয়ে ওঠে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে দেয় যে শোকানুষ্ঠান চলাকালে কোনো হামলা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এরপরও দাফনের কয়েক ঘণ্টা আগে বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের আশপাশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার খবর দেয় ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, আর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সময়টি ছিল স্পর্শকাতর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়, তাই ইরানকে ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা তেলের দাম ও আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য, যেখানে লাখো প্রবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা সরাসরি অর্থনীতি ও রেমিট্যান্সের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। ফলে খামেনির শেষযাত্রা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ শুধু কূটনীতিকদের নয়, সাধারণ মানুষেরও উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ
বিশ্বের প্রায় সব বড় সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে “একটি যুগের সমাপ্তি” হিসেবে উপস্থাপন করলেও তাদের বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ প্রতিবেদনে একদিকে খামেনির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অসন্তোষ এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব প্রাধান্য পেয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, রাষ্ট্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব বিপুল জনসমাগমের মাধ্যমে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক উদ্দীপনা প্রদর্শন করতে চেয়েছে; অথচ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র অভ্যন্তরীণভাবে খুব কমই এতটা বিভক্ত ছিল।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অনেক সংবাদমাধ্যম শোকানুষ্ঠানের ধর্মীয় তাৎপর্য, বিপুল জনসমাগম এবং আঞ্চলিক শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াকে সামনে এনেছে। এই ভিন্নতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে: একই ঘটনাকে বিভিন্ন রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, শেষযাত্রার বিশাল আয়োজন যেমন রাষ্ট্রের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থার সামাজিক ভিত্তি প্রদর্শন করেছে, তেমনি ইরানি সমাজের ভেতরের মতপার্থক্য ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি আড়াল করতে পারেনি। কয়েক মাস আগেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। অনেকে শোক প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির প্রত্যাশার কথাও বলেছেন। ফলে শেষযাত্রা একদিকে রাষ্ট্রঘোষিত জাতীয় সংহতির প্রতীক, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
মাশহাদ: ইমাম রেজার মাজারের পাশে শেষ বিদায়
৯ জুলাই ভোরে খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ বিমানে মাশহাদের শহীদ হাশেমিনেজাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তীব্র গরম উপেক্ষা করে শহরের রাস্তায় জড়ো হন অগণিত মানুষ। মাশহাদের গভর্নর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছিলেন, তিনি প্রায় দেড় কোটি মানুষের উপস্থিতি আশা করছেন।
দুপুরের পর একটি ট্রাকে করে কফিন ধীরে ধীরে ইমাম রেজা সড়ক ধরে মাজারের সোনালি গম্বুজ ও মিনারের দিকে এগিয়ে যায়, আর দুই পাশে হেঁটে চলেন সাদা পাগড়ি পরা আলেমরা। জনতার মধ্যে প্রতিশোধের স্লোগানও শোনা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী খামেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তফা জানাজার নামাজ পড়ান, এবং শোকার্তরা কফিন কাঁধে নিয়ে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করেন। দাফন অনুষ্ঠান ছিল সীমিত পরিসরে। পরিবারের যে সদস্যরা একই হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তাঁদেরও তাঁর পাশে সমাহিত করা হয়।
আল জাজিরার হিসাবে পুরো সপ্তাহের শোকমিছিল ও অনুষ্ঠানে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নেন, আর ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা তার দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করা কঠিন, তবে এটি যে আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় আয়োজন, তা নিয়ে সংশয় নেই।
মাশহাদে দাফনের সিদ্ধান্ত ছিল গভীরভাবে প্রতীকী। মাশহাদ শুধু খামেনির জন্মস্থান নয়; এটি ইরানের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান, যেখানে শিয়া মুসলিমদের অষ্টম ইমাম আলী আর-রেজা (আ.)-এর মাজার অবস্থিত। “মাশহাদ” শব্দের অর্থই শাহাদাতের স্থান। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে দাফনের মাধ্যমে খামেনির উত্তরাধিকারকে একই সঙ্গে তাঁর জন্মভূমি এবং শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র কেন্দ্রের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রতীকবাদের ভার আলেম সমাজ থেকে কিছুটা সরে গেছে তীর্থযাত্রা ও জনসাধারণের ভক্তির দিকে।
খোমেনি ও খামেনি: দুই শেষযাত্রা, দুই প্রেক্ষাপট
অনেক ইতিহাসবিদ খামেনির শেষযাত্রাকে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে দুই সময়ের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। খোমেনির মৃত্যুর সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ছিল বিপ্লব-পরবর্তী প্রথম প্রজন্মের একটি নবীন রাষ্ট্র। আর খামেনির বিদায়ের সময় ইরান দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা, সরাসরি যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার মুখোমুখি একটি রাষ্ট্র।
একটি মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে। খোমেনি মারা গিয়েছিলেন স্বাভাবিক মৃত্যুতে, আর খামেনি নিহত হয়েছেন বিদেশি সামরিক হামলায়। এই বাস্তবতা তাঁর শেষযাত্রাকে রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে “শাহাদাত”-এর রূপ দিয়েছে, যা ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবহে বিশেষ প্রতীকী শক্তি বহন করে। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, খোমেনির শেষযাত্রা ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে বিদায় জানানোর মুহূর্ত, আর খামেনির শেষযাত্রা সেই রাষ্ট্রের দীর্ঘতম মেয়াদের সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানানোর অধ্যায়।
ইতিহাসের আদালতে আলী খামেনি: সমর্থন ও সমালোচনা
শেষযাত্রা যতটা আবেগের, ততটাই মূল্যায়নেরও মুহূর্ত। দীর্ঘ কয়েক দশকের নেতৃত্ব শেষে একজন রাষ্ট্রনায়ক ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলে গবেষক, ইতিহাসবিদ, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষ তাঁর কর্মকাণ্ড নতুন করে বিচার করতে শুরু করেন। খামেনির ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি হলো: তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার কী?
সমর্থকদের মতে, ১৯৮৯ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চাপে থাকা একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে খামেনি ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করেছে এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি অনুসরণ করেছে। ইরানের সরকারি ভাষ্যে বারবার বলা হয়েছে, দেশের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাঁর নেতৃত্ব ছিল নির্ধারক।
সমালোচকদের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বহু সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, নারী অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে। বিভিন্ন সময়ের বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের অভিযোগও তাঁর শাসনামলের মূল্যায়নে বড় জায়গা নিয়ে আছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে যে চাপ তৈরি করেছে, তা-ও সমালোচকদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দুই ধরনের মূল্যায়নই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান। প্রতিটি যুগেই এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের মূল্যায়ন তাঁদের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ হয় না; সময়ের সঙ্গে নতুন দলিল, নতুন গবেষণা ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁদের সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়। খামেনির ক্ষেত্রেও সম্ভবত তা-ই ঘটবে। কেউ তাঁকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে দৃঢ় রক্ষক হিসেবে স্মরণ করবেন, কেউ এমন একজন শাসক হিসেবে মূল্যায়ন করবেন যাঁর সময়ে ইরান আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
মোজতবা খামেনি: নতুন নেতৃত্ব, পুরোনো প্রশ্ন
খামেনির মৃত্যুর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন ছিল, পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন। ইরানের সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই দায়িত্ব পালন করে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা মজলিসে খোবরেগান, যা ইসলামি আইনজ্ঞ আলেমদের নিয়ে গঠিত। যুদ্ধের মধ্যেই, পিতার মৃত্যুর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে এই পরিষদ তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করে।
১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবা দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকলেও কখনো কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত এবং বহু বছর পিতা ও বাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন। নিয়োগের আগে তাঁর ধর্মীয় পদমর্যাদা ছিল মধ্যম স্তরের “হুজ্জাতুল ইসলাম”, তবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁকে “আয়াতুল্লাহ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্কও কম নয়। ইসলামি বিপ্লব বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছিল, আর ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারকে সমর্থন করে না। বিশ্লেষকদের অনেকে এই সিদ্ধান্তকে রূপান্তরের চেয়ে ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংকেত হিসেবে দেখছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মোজতবা পিতার শেষযাত্রার কোনো অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে উপস্থিত হননি। নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে, আর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে হামলায় তাঁর পিতা নিহত হন, সেই হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন।
নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা: রাষ্ট্রের আদর্শিক ধারাবাহিকতা, যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন বাস্তবতা।
তরুণ প্রজন্ম ও ইরানের সামাজিক বাস্তবতা
এই সন্ধিক্ষণে ইরানের তরুণ প্রজন্মের ভূমিকাও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশের জন্ম বিপ্লবের বহু বছর পরে। তাদের প্রত্যাশা, জীবনধারা, প্রযুক্তি ব্যবহার, শিক্ষা ও বৈশ্বিক যোগাযোগ আগের প্রজন্মের থেকে অনেকটাই আলাদা।
ফলে নতুন নেতৃত্বকে এমন এক সমাজের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যেখানে একদিকে ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, আধুনিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সংযোগ ও সামাজিক স্বাধীনতার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই দুই স্রোতের মধ্যে সমন্বয় করতে পারা না-পারার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে ইরানের আগামী দিনের স্থিতিশীলতা।
নারী অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্ন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত, আর তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে আরেকটি অংশ বিপ্লবের আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি গভীরভাবে অনুগত, যাদের অনেককে শেষযাত্রার মিছিলেও সক্রিয় দেখা গেছে। এই বৈচিত্র্যই আজকের ইরানের প্রকৃত চিত্র।
নতুন মধ্যপ্রাচ্য, নতুন প্রশ্ন
বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন: খামেনির পর ইরানের নীতিতে কী পরিবর্তন আসবে? পারমাণবিক কর্মসূচি কি আগের পথেই চলবে, নাকি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নতুন নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে আনবে? লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে মিত্রগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক কি অপরিবর্তিত থাকবে? উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে?
এসব প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর নেই। বহু বিশ্লেষক মনে করেন, মোজতবা খামেনি পিতার চেয়েও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, যা নিকট ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। তবে প্রায় সব বিশ্লেষণে একটি বিষয়ে ঐকমত্য আছে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পরিবর্তন শুধু একটি অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়; এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী নেতাদের বিদায়ের পর রাষ্ট্রগুলো একটি সংবেদনশীল রূপান্তরকাল অতিক্রম করে। এই সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়, পুরোনো জোট নতুন করে পরীক্ষিত হয় এবং অনেক সময় অপ্রত্যাশিত মোড় আসে। ইরানের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ঘটছে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে, যা একে আরও জটিল করে তুলেছে।
উপসংহার: একটি যুগের অবসান, আরেকটির অনিশ্চিত সূচনা
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রা নিছক একটি দাফন অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় আচার, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং যুদ্ধকালীন রাজনীতির এক বিরল সংমিশ্রণ। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে কুমের মাদ্রাসা, নাজাফ-কারবালার পবিত্র প্রাঙ্গণ পেরিয়ে মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার পর্যন্ত এই যাত্রা একই সঙ্গে শোক, শক্তি প্রদর্শন এবং আত্মসমীক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
একজন নেতা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া নীতি, আদর্শ, বিতর্ক ও প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হতে থাকবে। ইতিহাসের বিচার সময়ই করবে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রা যে বহু বছর ধরে গবেষক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় সামান্যই। শোকের আবহ ফিকে হয়ে এলে শুরু হয়েছে আসল পরীক্ষা: যুদ্ধ, বিভক্তি ও প্রত্যাশার ভারে নুয়ে পড়া একটি রাষ্ট্র নতুন নেতৃত্বের অধীনে কোন পথে এগোবে।
এই অধ্যায় আমাদের আরও একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়: কোনো নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তাঁর জানাজার জনসমাগম দিয়ে হয় না, বরং তাঁর রেখে যাওয়া রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের জীবনমান দিয়েই ইতিহাস তাঁকে বিচার করে। খামেনির উত্তরাধিকার তাই আগামী দিনগুলোতে নির্ধারিত হবে ইরানের মানুষের অভিজ্ঞতা, অঞ্চলের শান্তি বা সংঘাত এবং নতুন নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
তথ্যসূত্র
১. আল জাজিরা: খামেনিকে ইরানের পবিত্রতম মাজারে দাফন: https://www.aljazeera.com/news/2026/7/9/iran-prepares-to-bury-slain-leader-khamenei-after-mass-funeral-ceremonies
২. আল জাজিরা: খামেনির জানাজায় কোন কোন বিশ্বনেতা অংশ নিচ্ছেন: https://aljazeera.com/news/2026/7/3/irans-khamenei-funeral-which-world-leaders-are-attending
৩. রয়টার্স (দ্য এজ মালয়েশিয়ায় প্রকাশিত): মাশহাদে দাফন, উত্তরসূরি তখনও জনসমক্ষে অনুপস্থিত: https://theedgemalaysia.com/node/810130
৪. রয়টার্স (প্রথম আলো ইংরেজিতে প্রকাশিত): তেহরানে শেষ শ্রদ্ধা ও সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠান: https://en.prothomalo.com/international/middle-east/ev5zf2e53m
৫. দ্য নিউ আরব: দুই দেশের পাঁচ শহরজুড়ে খামেনির শেষযাত্রা: https://www.newarab.com/news/khameneis-funeral-expected-span-five-cities-two-countries
৬. দ্য স্ট্যান্ডার্ড (হংকং): ৬–৯ জুলাইয়ের আনুষ্ঠানিক সূচি: https://www.thestandard.com.hk/world/article/335300/Ali-Khameneis-funeral-to-be-held-from-July-6-to-9-burial-at-Mashhad-shrine
৭. গ্লোবাল সিকিউরিটি (প্রেস টিভি): সত্তরটির বেশি দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ: https://www.globalsecurity.org/wmd/library/news/iran/2026/07/iran-260704-presstv02.htm
৮. দ্য স্টেটসম্যান: তেহরানে ভারতসহ বিদেশি প্রতিনিধিদল: https://www.thestatesman.com/world/from-india-to-russia-world-leaders-gather-in-tehran-to-bid-farewell-to-former-iran-supreme-leader-ali-khamenei-1503612877.html
৯. বার্নামা (আনাদোলু): মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা: https://www.bernama.com/en/news.php?id=2531925
১০. পোলস্কিয়ে রাদিও (রয়টার্স): মোজতবা খামেনির নিয়োগ ও পটভূমি: https://polskieradio.pl/395/7785/Artykul/3657528,mojtaba-khamenei-named-iran’s-new-supreme-leader
