একজন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে আলোচনা সাধারণত শোক ও স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় মূল্যায়নে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন শুরু হয়েছে অত্যন্ত দ্রুত এবং তীব্রভাবে। কারণ তিনি শুধু একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন না, বরং প্রায় চার দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের প্রথম হামলাতেই তিনি নিহত হন, এবং ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের প্রথম বিমান হামলায় তার ৩৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।

গবেষক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা তাকে নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আলোচনা করছেন, সেগুলোকে মোটামুটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়: তিনি কীভাবে ক্ষমতায় এলেন ও ক্ষমতা সংহত করলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি ও পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাত, আঞ্চলিক জোট বা “প্রতিরোধ অক্ষ”, অর্থনীতি ও নিষেধাজ্ঞা, দেশের ভেতরের গণবিক্ষোভ, এবং সবশেষে তার উত্তরাধিকার ও ইরানের ভবিষ্যৎ। এই প্রতিবেদনে সেই আলোচনার মূল ধারাগুলো তুলে ধরা হলো, যেখানে সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি স্থান পেয়েছে।

একজন “অপ্রত্যাশিত” উত্তরাধিকারী

ইতিহাসবিদদের আলোচনার প্রথম বিষয় হলো ১৯৮৯ সালে খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রেক্ষাপট। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি এই পদে আসেন। বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দেন, খামেনি তার পূর্বসূরি খোমেনির মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছিলেন না, এমনকি এই পদের জন্য প্রথম পছন্দও ছিলেন না; ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য সাধারণত যে ধর্মীয় জ্যেষ্ঠতা প্রয়োজন, তা তার ছিল না।

১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদে তার জন্ম। তরুণ বয়সে তিনি শাহবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং কারাবাস ও আত্মগোপনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। বিপ্লবের পর তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হন এবং খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসেন।

গবেষকদের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল: ধর্মীয় মর্যাদায় তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান থেকে শুরু করে কীভাবে তিনি ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়ের সর্বোচ্চ নেতায় পরিণত হলেন? অধিকাংশ বিশ্লেষণে এর উত্তর হিসেবে উঠে এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা সংহতকরণ, বিশেষত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরতা। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ক্ষমতা সংহতকরণ ছিল শাসনব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার খামেনির নিজস্ব কৌশল। সমর্থকদের চোখে এটি ছিল বহিঃশত্রুর চাপের মুখে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার প্রজ্ঞা; সমালোচকদের চোখে এটি ছিল ধর্মীয় নেতৃত্বের আড়ালে একটি নিরাপত্তা-রাষ্ট্র গড়ে তোলা।

পারমাণবিক কর্মসূচি: সার্বভৌমত্ব নাকি সংঘাতের উৎস

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের আলোচনায় খামেনির শাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বে ইরান একটি বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও পশ্চিমের মধ্যে প্রধান বিভাজনরেখায় পরিণত হয় এবং যাকে তিনি প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। খামেনি একটি মৌখিক ফতোয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে ইরান কখনো তার ভাষায় শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নের অধিকার ছাড়বে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দাবি, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরানের কর্মসূচিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি গোপন প্রকল্প লুকানো ছিল।

তার অবস্থান বোঝাতে বিশ্লেষকরা প্রায়ই একটি ভাষণের উল্লেখ করেন। ২০১১ সালের মার্চে এক ভাষণে খামেনি লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির উদাহরণ টানেন, যিনি বহু বছর আগে নিজের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ খামেনির কাছে পারমাণবিক সক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রের টিকে থাকার নিশ্চয়তার প্রশ্ন।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিও এই আলোচনার কেন্দ্রে। খামেনির অনুমোদনেই রুহানি সরকার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে জেসিপিওএ নামে পরিচিত চুক্তি করে, যার লক্ষ্য ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরানের অর্থনীতিকে মুক্ত করা। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়, এবং খামেনি সেই সুযোগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্বরান্বিত করেন।

সমালোচক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এই কৌশলই শেষ পর্যন্ত বিপরীত ফল দিয়েছে। তাদের মতে, খামেনির পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পথ তৈরি করে। আর ২০২৫ সালের মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলা এবং চলমান যুদ্ধ—উভয়ের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে ইরানের সমর্থকরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেন: তাদের মতে, সমস্যা পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং আন্তর্জাতিক চুক্তি ভঙ্গ এবং একটি সার্বভৌম দেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন।

“প্রতিরোধ অক্ষ”: আঞ্চলিক প্রভাবের স্থাপত্য

খামেনিকে নিয়ে আলোচনার আরেকটি বড় অধ্যায় হলো তথাকথিত “প্রতিরোধ অক্ষ”। তার শাসনামলে ইরান প্রচলিত যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি সরে এসে মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের নীতিতে যায় এবং গড়ে তোলে “প্রতিরোধ অক্ষ”। এটি ছিল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি শিথিল নেটওয়ার্ক, যা তেহরানকে প্রতিপক্ষের দোরগোড়ায় শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দেয়। এই নেটওয়ার্কের অংশ ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ, যা ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল।

দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এখানে সবচেয়ে স্পষ্ট। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিম যেখানে একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র দেখেছে, খামেনি সেখানে দেখেছেন একটি প্রতিরক্ষা ঢাল; তার কাছে এই গোষ্ঠীগুলো শুধু প্রক্সি নয়, ইরানের সম্মুখ প্রতিরক্ষা। ইরান-সমর্থক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই কৌশল ইরানকে যুদ্ধ নিজের সীমান্ত থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশ্লেষকরা এটিকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে দেখেন।

তবে উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত যে শেষ কয়েক বছরে এই কাঠামো বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর থেকে “প্রতিরোধ অক্ষ” ভাঙতে শুরু করে এবং হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইতিহাসবিদরা প্রশ্ন তুলছেন: খামেনির সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্জন কি তার জীবদ্দশাতেই ক্ষয়ে গিয়েছিল?

নিষেধাজ্ঞা ও “প্রতিরোধ অর্থনীতি”

অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় খামেনির “প্রতিরোধ অর্থনীতি” ধারণাটি বারবার এসেছে। এটি ছিল আপসের বদলে আত্মনির্ভরতা ও মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া একটি নীতি। সহজ ভাষায়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকতে দেশীয় উৎপাদন ও স্বনির্ভরতার ওপর নির্ভর করা।

সমর্থকরা বলেন, এই নীতির কারণেই কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান ভেঙে পড়েনি এবং প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও কিছু প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। সমালোচকরা বলেন, এর মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ: মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতি। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান আরও গভীর অর্থনৈতিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাপক গণবিক্ষোভের জন্ম দেয়। অর্থাৎ অর্থনীতির প্রশ্ন সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে।

গণবিক্ষোভ ও দমন: অভ্যন্তরীণ বৈধতার প্রশ্ন

মানবাধিকার গবেষক ও সাংবাদিকদের কাছে খামেনির শাসনের সবচেয়ে সমালোচিত দিক হলো বিক্ষোভ দমন। রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও দুর্বল অর্থনীতি একের পর এক বড় বিক্ষোভের ঢেউ তৈরি করে। এর ধারাবাহিকতা লক্ষ করার মতো: ২০০৯ সালে সংস্কারপন্থী বিরোধীরা আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনকে কারচুপির অভিযোগে প্রত্যাখ্যান করলে বিক্ষোভ শুরু হয়; ২০১৭ সালে অর্থনৈতিক বিক্ষোভ হয় এবং ২০১৯ সালে সরকার নির্ধারিত জ্বালানির দাম বাড়ানোয় তা আরও তীব্র হয়।

এরপর ২০২২ সালে হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে আটক তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর আবার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে অর্থনৈতিক বিক্ষোভ শুরু হয়ে তা সম্ভবত ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপ নেয়। হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের হিসাব ভিন্ন হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিটি দফায় কঠোর দমনের অভিযোগ এনেছে।

খামেনি নিজে এই আন্দোলনগুলোকে কীভাবে দেখতেন, তাও বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসেছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের একটি মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্টকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি-সমর্থিত একটি “ভেলভেট বিপ্লব” হিসেবে দেখেছিলেন। সমর্থকরা এই দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে বিদেশি হস্তক্ষেপের ইতিহাসের কথা বলেন; সমালোচকরা বলেন, এই ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভকে অস্বীকার করা হয়েছে। এক বিশ্লেষণ এই বিভাজনকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছে: খামেনিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছেন; আর রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীরা বলতেন, তিনি পারমাণবিক কর্মসূচি ও বিদেশি যুদ্ধের জন্য তাদের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছেন।

মৃত্যু, যুদ্ধ এবং উত্তরাধিকার

খামেনির মৃত্যু নিজেই ইতিহাসবিদদের কাছে একটি বড় আলোচনার বিষয়। তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেননি; ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রথম দিনে পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ তিনি নিহত হন। বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়।

বাবার মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে। এটি ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা, কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই প্রথম পদটি বাবা থেকে ছেলের হাতে গেল। ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ প্রতি আট বছর পরপর নির্বাচিত হয়।

এই উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কও কম নয়। ইরানের শাসকীয় মতাদর্শ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারকে নিরুৎসাহিত করলেও, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং প্রয়াত নেতার এখনো প্রভাবশালী দপ্তরে মোজতবার শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। আরও কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, প্রতিবেদন অনুযায়ী আলী খামেনি মৃত্যুর আগে আরও তিনটি নাম প্রস্তাব করেছিলেন, যার কোনোটিতেই তার ছেলের নাম ছিল না। ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, মোজতবা একটি স্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েছেন এবং এই নির্বাচন প্রয়াত নেতা ও খোমেনির পথে অবিচল থাকার অঙ্গীকার।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, মোজতবার নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠান রূপান্তরের চেয়ে ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অর্থাৎ খামেনির উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা কেবল অতীতের মূল্যায়ন নয়, বর্তমান ইরানের নীতিনির্ধারণেরও প্রশ্ন।

শেষযাত্রা: প্রতীক ও রাজনীতি

যুদ্ধের কারণে দাফন কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। শুরুতে মার্চে শেষকৃত্যের কথা থাকলেও যুদ্ধের কারণে তা স্থগিত করা হয়। পরে ৬ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত তেহরান, কোম, নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। দাফন অনুষ্ঠান ব্যক্তিগত হলেও এর আগে এক সপ্তাহের শোকানুষ্ঠানে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নেন, ইরানি হিসাবে যা এর দ্বিগুণেরও বেশি।

সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা এই শেষযাত্রাকে শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখেননি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতারা ব্যাপক জনসমাগমে উৎসাহ দিয়েছিলেন, যাতে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক উদ্দীপনা প্রদর্শন করা যায়। একই সঙ্গে আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় ঐক্যের সব আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সত্ত্বেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র খুব কমই অভ্যন্তরীণভাবে এতটা বিভক্ত ছিল। দাফনের স্থান নিয়েও বিশ্লেষণ হয়েছে: ইমাম রেজার মাজারে দাফন খামেনির উত্তরাধিকারকে তার জন্মস্থান এবং শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

দুই চোখে এক নেতা: সমর্থক ও সমালোচকের মূল্যায়ন

গবেষকদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট: খামেনিকে নিয়ে একক কোনো মূল্যায়ন নেই। তার সমর্থকরা, বিশেষত ইরানের ভেতরের রক্ষণশীল ধর্মীয় মহল এবং অঞ্চলের মিত্র গোষ্ঠীগুলো, তাকে দেখেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে। তাদের যুক্তি: কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, গুপ্তহত্যা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছেন, ইরানকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছেন এবং পশ্চিমের কাছে নতি স্বীকার করেননি। ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার অবিচল অবস্থান মুসলিম বিশ্বের একটি অংশে তাকে জনপ্রিয় করেছিল।

অন্যদিকে সমালোচকরা, যার মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমা নীতিনির্ধারক, মানবাধিকার সংস্থা, ইরানি প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠী এবং দেশের ভেতরের সংস্কারপন্থীরা, তার শাসনকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে দেখেন। তাদের অভিযোগ: বাকস্বাধীনতা ও নারী অধিকার সংকুচিত হয়েছে, বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে, আর পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সংঘাতের পেছনে সম্পদ ব্যয় করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা হয়েছে। এক মূল্যায়নের ভাষায়, খামেনি ছিলেন বৈপরীত্যে ভরা একজন মানুষ।

ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এই দুই চরমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলছেন: খামেনি কি একজন কৌশলী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, যিনি একটি বৈরী আন্তর্জাতিক পরিবেশে রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছেন? নাকি তিনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়েছিলেন, যা বাইরে থেকে শক্তিশালী দেখালেও ভেতর থেকে ক্রমশ জনসমর্থন হারাচ্ছিল? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো অনিশ্চিত, এবং সম্ভবত তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরে ইরানের গতিপথের ওপর।

ভবিষ্যতের অমীমাংসিত প্রশ্ন

গবেষক ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় এখন যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি উঠছে, সেগুলো হলো: মোজতবা খামেনি কি বাবার নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি নতুন পথ খুঁজবেন? বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রভাব কি আরও বাড়বে? যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান কি আলোচনার পথে যাবে, নাকি সংঘাত দীর্ঘায়িত হবে? এবং বিপ্লবের বহু বছর পরে জন্ম নেওয়া তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব কীভাবে মানিয়ে নেবে?

কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, তেহরানে কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতা নিকট ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বাহ্যিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট নতুন নেতৃত্বকে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

উপসংহার

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে নিয়ে গবেষক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের আলোচনার মূল সুর হলো দ্বৈততা। তিনি একদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে প্রায় চার দশক ধরে টিকিয়ে রাখা দীর্ঘতম মেয়াদের সর্বোচ্চ নেতা, অন্যদিকে এমন এক শাসনের প্রতীক যার সময়ে ইরান বারবার অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বহিঃশক্তির সঙ্গে সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, প্রতিরোধ অক্ষ, প্রতিরোধ অর্থনীতি এবং বিক্ষোভ দমন, এই চারটি বিষয় তার ঐতিহাসিক মূল্যায়নের মূল স্তম্ভ হয়ে থাকবে। আর তার মৃত্যুর পর ছেলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর তার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইতিহাসের আদালতে খামেনির চূড়ান্ত রায় হয়তো এখনই লেখা সম্ভব নয়, তবে এটুকু নিশ্চিত যে একবিংশ শতাব্দীর মধ্যপ্রাচ্য বুঝতে হলে তাকে বোঝা অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র

১. Al Jazeera – Slain Supreme Leader Ali Khamenei buried at Iran’s holiest shrine

২. Reuters (The Edge Malaysia) – Khamenei buried in Mashhad

৩. AP (ABC News) – Ayatollah Ali Khamenei, who led Iran with iron fist

৪. CNN (KQ2) – Khamenei’s legacy and the axis of resistance

৫. NBC New York – Who is Ayatollah Ali Khamenei

৬. The Washington Institute – Ayatollah Ali Khamenei: An Obituary

৭. The New Arab – Who is Mojtaba Khamenei, Iran’s new supreme leader

৮. The New Arab – Khamenei’s funeral to span five cities

৯. Egyptian Streets – Iran names Mojtaba Khamenei as new supreme leader

১০. Prothom Alo English – Khamenei lies in state in Tehran

১১. Aaj News – Khamenei’s body arrives in Mashhad

১২. The Standard (Hong Kong) – Funeral schedule July 6–9

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।