তেহরান থেকে মাশহাদ : আলী খামেনির শেষযাত্রার চার মাস অপেক্ষার পর এক দীর্ঘ যাত্রা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই। কিন্তু তার দাফন হয় চার মাসেরও বেশি সময় পরে। শুরুতে মার্চে শেষকৃত্যের পরিকল্পনা থাকলেও ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় তা স্থগিত করতে হয়। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রা, যা দুটি দেশের পাঁচটি শহর পেরিয়ে শেষ হয় তার জন্মস্থান মাশহাদে।
এই যাত্রাপথ নিছক একটি ভ্রমণসূচি ছিল না। তেহরান, কুম, নাজাফ, কারবালা এবং মাশহাদ—প্রতিটি শহর বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল আলাদা প্রতীকী অর্থ। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় দিনের এই আয়োজনের স্থানগুলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্তম্ভগুলোকে প্রতিফলিত করেছে। এই প্রতিবেদনে সেই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপ, তার তাৎপর্য এবং এর ঘিরে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হলো।
উল্লেখ্য, খামেনির সঙ্গে একই হামলায় নিহত তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মরদেহও এই শেষযাত্রায় বহন করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার শিশু নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং ছেলে মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেলকেও তার সঙ্গে দাফন করা হয়।
প্রথম ধাপ: তেহরান—রাষ্ট্রের রাজধানীতে রাষ্ট্রীয় বিদায়
শেষযাত্রার সূচনা হয় রাজধানী তেহরানে। ৩ জুলাই শুক্রবার খামেনির মরদেহ পৌঁছায় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায়, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক স্থান। ইরানের তিন রঙা পতাকায় মোড়ানো কফিন সেখানে বহন করে নেওয়া হয়, এবং তিন দিন ধরে বিশাল এই প্রার্থনা কমপ্লেক্সে মরদেহ রাখা হয় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। মোসাল্লা জুড়ে টানানো হয় খামেনির ছবি ও উক্তিসংবলিত ব্যানার।
তেহরান পর্বের সবচেয়ে কূটনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি। প্রায় ত্রিশটি দেশ থেকে বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ, তুর্কমেনিস্তানের গুরবাঙ্গুলি বেরদিমুহামেদভ এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। এ ছাড়া ইরাকের প্রেসিডেন্ট, আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং হামাসের একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল।
অতিথিদের এই তালিকা নিজেই একটি রাজনৈতিক মানচিত্র। পশ্চিমা দেশগুলোর অনুপস্থিতি এবং রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ ককেশাস ও প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর উপস্থিতি যুদ্ধকালীন ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের মধ্যে থাকা একটি দেশের রাজধানীতে এতজন বিদেশি নেতার আগমন তেহরানের জন্য আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার ধারণার বিরুদ্ধে একটি বার্তা ছিল।
৬ জুলাই সোমবার অনুষ্ঠিত হয় তেহরানের মূল শোকমিছিল। কফিনগুলো দামাভান্দ মহাসড়ক থেকে কেন্দ্রীয় এনকেলাব সড়ক হয়ে আজাদি চত্বর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। রাস্তার দুপাশ থেকে কফিনের ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটানো হয়, আর আজাদি টাওয়ারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কফিনবাহী গাড়িকে ঘিরে ধরে বিপুল জনতা। ইরানি কর্তৃপক্ষ দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণের আশা প্রকাশ করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অনেকেই এই জনসমাগমকে ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্যের সঙ্গে তুলনা করেছে।
তবে তেহরানের আবহ শুধু শোকের ছিল না। মোসাল্লার প্রাঙ্গণে অনেক শোকার্ত মানুষ প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল পতাকা বহন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন। অর্থাৎ রাজধানীর এই পর্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, কূটনৈতিক বার্তা এবং যুদ্ধকালীন ক্ষোভ একসঙ্গে প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয় ধাপ: কুম—ধর্মীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রে জানাজা
৭ জুলাই মঙ্গলবার শেষযাত্রা পৌঁছায় কুমে। প্রায় ১৫ লাখ মানুষের এই শহর শিয়া ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র বা হাওজাগুলোর আবাসস্থল। সর্বোচ্চ নেতার পদটি তাত্ত্বিকভাবে “বেলায়েতে ফকিহ” বা ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্বের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই ধর্মীয় বৈধতার উৎস হিসেবে কুমের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কুমে শেষযাত্রা নিয়ে আসা ছিল খামেনির নেতৃত্বের ধর্মীয় ভিত্তিকে সামনে আনার একটি প্রয়াস।
কুমে খামেনির মরদেহ রাখা হয় জামকারান মসজিদে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার তথ্যমতে, সেখানে জানাজার নামাজে ইমামতি করেন গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি, এবং তাতে অংশ নেন ধর্মীয় পণ্ডিত, মাদ্রাসাছাত্র, সরকারি কর্মকর্তা ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা। আগের দিন থেকেই সারা দেশ থেকে মানুষ কুমে আসতে শুরু করেন এবং ভোরের আগেই মসজিদের প্রাঙ্গণ ভরে যায়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আকাশচিত্রে শহরের রাস্তাগুলো শোকার্ত মানুষে ঠাসা দেখা যায়।
জানাজার পর কফিনবাহী গাড়ি এগিয়ে যায় হজরত ফাতিমা মাসুমার মাজারের দিকে। তিনি ছিলেন অষ্টম ইমাম রেজার বোন। এখানে একটি সূক্ষ্ম যোগসূত্র লক্ষণীয়: কুমের বোনের মাজার থেকে শুরু হয়ে যাত্রা শেষ হবে মাশহাদে ভাই ইমাম রেজার মাজারে। এভাবে শেষযাত্রার কাঠামোতেই শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যের পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধনকে যুক্ত করা হয়।
তৃতীয় ধাপ: নাজাফ—সীমান্ত পেরিয়ে প্রথম ইমামের মাজারে
শেষযাত্রার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অংশ ছিল ইরাক পর্ব। কোনো ইরানি নেতার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশে আলাদা একটি দিন উৎসর্গ করা ছিল নজিরবিহীন। ইরানি ঘোষণা অনুযায়ী, এই আয়োজন হয়েছিল ইরাকের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনুরোধে। মঙ্গলবার রাতে নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরাকের কর্মকর্তা ও শীর্ষ রাজনীতিবিদরা খামেনির মরদেহ গ্রহণ করেন।
৮ জুলাই বুধবার ভোর ছয়টায় নাজাফে শোকমিছিল শুরু হয়। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই রাস্তায় নামে বিপুল জনতা। ট্রাকের পেছনে রাখা কফিন ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ইমাম আলীর মাজারের দিকে, যিনি নবী মুহাম্মদের (সা.) জামাতা এবং শিয়া মতে প্রথম ইমাম। সোনালি গম্বুজের নিচে শোকার্তরা কফিন কাঁধে তুলে নেন, আর অনেকে ভিড় ঠেলে কফিন ছোঁয়ার চেষ্টা করেন। মাজারে আলেমরা জানাজার নামাজ আদায় করেন।
ইরাকের হাশদ আল-শাবি বা পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস দাবি করে, নাজাফের মিছিলে ২৩ লাখেরও বেশি মানুষ যোগ দেন। এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও বিশাল জনসমাগমের কথা উঠে এসেছে।
নাজাফের তাৎপর্য নিয়ে বিশ্লেষকদের আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে এসেছে। নাজাফ শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী সিস্তানির আবাসস্থল। ঐতিহাসিকভাবে নাজাফের ধর্মীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রক্ষমতায় আলেমদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে কুম ও তেহরানের তুলনায় ভিন্ন অবস্থান ধারণ করে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে নাজাফে খামেনির জন্য বিশাল আয়োজন শিয়া বিশ্বে ইরানের প্রভাব ও আত্মীয়তার একটি প্রতীকী প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়েছে।
চতুর্থ ধাপ: কারবালা—শাহাদাতের প্রতীকী ভূমিতে
নাজাফের অনুষ্ঠান শেষে মরদেহ বিমানযোগে নেওয়া হয় প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তরের কারবালায়। সন্ধ্যায় কফিন শহরে প্রবেশ করে এবং বিপুল জনতার ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে মাজারমুখী প্রধান সড়ক ধরে এগোয়। অনেকে জায়গা নিশ্চিত করতে ভোররাতে, এমনকি আগের দিনই কারবালায় পৌঁছে যান। কারবালার কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে কিছু প্রতিবেদনে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের সমাগমের কথা বলা হয়েছে, যদিও এই হিসাবও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নয়।
কারবালায় বিদায় অনুষ্ঠান হয় ইমাম হুসাইন এবং তার ভাই আব্বাসের মাজারে। শিয়া ইতিহাসে সপ্তম শতাব্দীতে ইমাম হুসাইনের শাহাদাত কেন্দ্রীয় একটি অধ্যায়, যা প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষকে কারবালা ও নাজাফে টেনে আনে। খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই ইরানের শহরগুলোতে ঝোলানো কালো পতাকাগুলো ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের স্মৃতিকেই নির্দেশ করছিল।
এই প্রতীক কতটা সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা কারবালার ব্যানারগুলোতে স্পষ্ট। একটি ব্যানারে লেখা ছিল বিদায়বার্তা, আর আরেকটিতে খামেনির ছবির নিচে তাকে আমেরিকাকে অপমানকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, কারবালা পর্বের মাধ্যমে খামেনিকে একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি, শিয়া শাহাদাত-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় একজন “শহীদ” হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। এনপিআরের সঙ্গে কথা বলা এক বিশ্লেষকের মতে, এই শেষকৃত্যের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার ভাবমূর্তি তুলে ধরার এবং খামেনিকে একজন আন্তর্জাতিক শহীদ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
মানবিক দিক থেকেও ইরাক পর্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। নাজাফ ও কারবালার রাস্তায় শোকার্তদের জন্য খাবার ও পানীয়ের স্টল বসানো হয়, মোতায়েন ছিল ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী ও মেডিকেল দল, আর প্রচণ্ড গরম থেকে স্বস্তি দিতে পানি ছিটানো হয়। বাগদাদ থেকে সন্তানদের নিয়ে আসা এক নারী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ধর্মই তাকে এখানে টেনে এনেছে। একই দিনে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়, যা মনে করিয়ে দেয় যে শোকের এই আয়োজন চলছিল যুদ্ধের ছায়ার মধ্যেই।
পঞ্চম ধাপ: মাশহাদ—জন্মভূমিতে ফেরা ও চিরবিদায়
৯ জুলাই বৃহস্পতিবার ভোরে খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ বিমানে মাশহাদের শহীদ হাশেমিনেজাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। ইরাকে অভূতপূর্ব ভিড়ের কারণে অনুষ্ঠান দীর্ঘায়িত হওয়ায় মাশহাদের শোকমিছিল সকাল আটটা থেকে পিছিয়ে দুপুর দুইটায় নেওয়া হয়।
মাশহাদ খামেনির জন্মস্থান। ১৯৩৯ সালে এই শহরেই তার জন্ম এবং এখানেই তার প্রাথমিক ধর্মীয় জীবন গড়ে ওঠে। ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরে রয়েছে অষ্টম ইমাম রেজার মাজার, যা ইরানের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে সারা দেশ থেকে আসা মানুষ শহরের রাস্তা ভরিয়ে তোলেন। মাশহাদের গভর্নর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেড় কোটি মানুষের উপস্থিতি আশা করার কথা বলেছিলেন।
কফিন একটি ট্রাকে করে ধীরে ধীরে ইমাম রেজা সড়ক ধরে মাজারের সোনালি গম্বুজ ও মিনারের দিকে এগিয়ে যায়, দুপাশে হাঁটছিলেন সাদা পাগড়ি পরা আলেমরা। জানাজার নামাজে কে ইমামতি করেছেন, তা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্নতা রয়েছে। ইরনার আগাম ঘোষণায় ১০১ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ হোসেইন নূরি হামেদানির নাম বলা হয়েছিল, আর রয়টার্সের প্রতিবেদনে খামেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তফার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে ইরানের পতাকার লাল, সাদা ও সবুজ রঙে রাঙানো কফিন একদল পুরুষ শোকার্ত কাঁধে করে মাজারের ভেতরে নিয়ে যান। দাফন অনুষ্ঠানটি ছিল ব্যক্তিগত পরিসরে, এবং শুক্রবার ভোরে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাফন সম্পন্ন হওয়ার খবর জানায়।
দাফনের স্থান নির্বাচনের তাৎপর্য নিয়ে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইমাম রেজার মাজারে দাফন খামেনির উত্তরাধিকারকে তার জন্মস্থান ও শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থানে প্রোথিত করেছে, এবং প্রতীকী গুরুত্বকে আলেম-প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে তীর্থযাত্রা ও সাধারণ মানুষের ভক্তির দিকে নিয়ে গেছে। তেহরানে নিজের নির্মিত বিশাল মাজারে শায়িত খোমেনির সঙ্গে এখানে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
শোকের আড়ালে যুদ্ধ ও রাজনীতি
ছয় দিনের এই শেষযাত্রা কখনোই যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। ইরান আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শেষকৃত্য চলাকালে হামলা না চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছিল। তবুও কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর এই সপ্তাহেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়। দাফনের কয়েক ঘণ্টা আগে বুশেহর অঞ্চলে, যেখানে ইরানের একটি পারমাণবিক কেন্দ্র রয়েছে, একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর দেয় মেহর বার্তা সংস্থা।
আরেকটি বিষয় সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের বিশেষ মনোযোগ কেড়েছে: নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি। বাবার শেষযাত্রার পুরো সময় জুড়ে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তেহরানের অনুষ্ঠানে খামেনির অন্য তিন ছেলে মোস্তফা, মেইসাম ও মাসুদ উপস্থিত ছিলেন। নতুন নেতার এই অনুপস্থিতি তার স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতারা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক উদ্দীপনা দেখানোর জন্য বিপুল জনসমাগমে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এএফপির প্রতিবেদনেও বলা হয়, যুদ্ধ এবং ছয় মাস আগের রক্তক্ষয়ী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ শক্তি ও ঐক্যের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে আগ্রহী ছিল। তেহরান, কুম ও মাশহাদে আয়োজনের দিনগুলোতে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
ভিন্ন কণ্ঠস্বর: সবাই শোক করেনি
শেষযাত্রার বিশালতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মনে করিয়ে দিয়েছে যে খামেনি ইরানে একজন বিভাজনমূলক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জাতীয় ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সত্ত্বেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র খুব কমই অভ্যন্তরীণভাবে এতটা বিভক্ত ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এনপিআরের এক প্রতিবেদনে জানুয়ারির বিক্ষোভে ভাই হারানো এক তরুণীর কথা তুলে ধরা হয়, যিনি বলেছেন এই শেষকৃত্য তাকে সামান্যই সান্ত্বনা দিয়েছে। আবার সেই একই পরিবারে তার মা শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। এই বৈপরীত্য আজকের ইরানের সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে শেষযাত্রায় অংশ নেওয়া লাখো মানুষের আবেগও ছিল অকৃত্রিম। নাজাফে উপস্থিত এক ইরাকি শোকার্ত খামেনির মৃত্যুকে একটি বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, এই আয়োজন এমন এক নেতার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একজন নিরপেক্ষ পাঠকের জন্য এই দুই চিত্রই সমান সত্য: খামেনি একদিকে লাখো মানুষের কাছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক, অন্যদিকে বহু মানুষের কাছে দমন ও সংকটের প্রতীক।
পাঁচ শহর, এক বার্তা: শেষযাত্রার সামগ্রিক বিশ্লেষণ
শেষযাত্রার পুরো পথকে একসঙ্গে দেখলে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো ধরা পড়ে। তেহরান প্রতিনিধিত্ব করেছে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে, যেখানে বিদেশি অতিথিরা কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছেন। কুম প্রতিনিধিত্ব করেছে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও বেলায়েতে ফকিহর তাত্ত্বিক ভিত্তিকে। নাজাফ ও কারবালা প্রতিনিধিত্ব করেছে সীমান্তের বাইরের শিয়া বিশ্ব এবং শাহাদাতের ঐতিহ্যকে, যা খামেনিকে একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় পরিচয় দিয়েছে। আর মাশহাদ প্রতিনিধিত্ব করেছে ব্যক্তিগত শিকড়, জন্মভূমি এবং সাধারণ মানুষের ভক্তির কেন্দ্রকে।
এএফপি ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক সপ্তাহের এই শোকানুষ্ঠানে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নেন, আর ইরানি হিসাবে সংখ্যাটি এর দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শেষকৃত্য আয়োজনগুলোর একটি।
তবে ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একটি শেষকৃত্যের জনসমাগম একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। ১৯৮৯ সালে খোমেনির শেষকৃত্য একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে বিদায় জানিয়েছিল, যখন বিপ্লবের উদ্দীপনা তখনো জীবন্ত। খামেনির শেষযাত্রা হয়েছে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং নতুন প্রজন্মের ভিন্ন প্রত্যাশার মধ্যে। তাই এই দীর্ঘ পথ শুধু একজন নেতার শেষ বিদায় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নিজের পরিচয় নতুন করে ঘোষণা করার প্রচেষ্টাও।
উপসংহার
তেহরানের মোসাল্লা থেকে মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার পর্যন্ত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রা ছিল ধর্ম, রাজনীতি, কূটনীতি ও যুদ্ধের এক জটিল সমন্বয়। প্রতিটি শহর তার নিজস্ব প্রতীকী ভাষায় একটি বার্তা দিয়েছে, আর সব মিলিয়ে বার্তাটি ছিল ধারাবাহিকতা ও প্রতিরোধের। কিন্তু সেই বার্তার আড়ালে রয়ে গেছে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন: নতুন নেতৃত্ব কতটা স্থিতিশীল, যুদ্ধ কোন দিকে যাবে, এবং বিভক্ত সমাজকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখা যাবে। শেষ বিদায়ের এই দীর্ঘ পথ শেষ হয়েছে মাশহাদে, কিন্তু ইরানের নতুন অধ্যায়ের পথ সবে শুরু হয়েছে।
তথ্যসূত্র
১. Al Jazeera – Slain Supreme Leader Ali Khamenei buried at Iran’s holiest shrine
২. Reuters (The Edge Malaysia) – Khamenei buried in Mashhad as successor remains out of sight
৩. The Standard (Hong Kong) – Ali Khamenei’s funeral to be held from July 6 to 9
৪. Armenpress – Hundreds of thousands bid farewell to Khamenei in Tehran
৫. Dhaka Tribune (AFP) – Iranian leaders pay respects as Tehran prepares for funeral
৬. NPR (Michigan Public) – Huge crowds of mourners join a funeral procession for Khamenei
৭. Arab News (AFP) – Crowds bid farewell to Khamenei in Iranian holy city of Qom
৮. Aaj News – Millions gather in Qom for Khamenei funeral prayers
৯. Al-Monitor (AFP) – Vast crowds mourn Khamenei in Iraq’s holy cities
১০. Ahram Online – Iraq’s holy cities host funeral processions for Khamenei
১১. ARY News – Huge crowd attends Ayatollah Ali Khamenei’s funeral in Iraq
১২. Kuwait Times – Huge crowds mourn Khamenei in Iraq’s holy cities
১৩. Aaj News – Khamenei’s body arrives in Mashhad for burial ceremonies
১৪. Hiru News – Iran to bury slain supreme leader in culmination of mass funeral
১৫. The New Arab – Khamenei’s funeral expected to span five cities in two countries
১৬. Prothom Alo English – Khamenei lies in state in Tehran as Iran begins week of funeral ceremonies
১৭. Tribune Pakistan (AFP) – Vast crowds mourn Khamenei in Najaf
