হারুত ও মারুত কারা?
হারুত ও মারুত এর নাম শুনলেই আমাদের সমাজে একটি গল্প প্রায় সবার মুখে মুখে ফেরে। বলা হয়, দুজন ফেরেশতা মানুষের পাপাচার দেখে অভিযোগ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁদের মধ্যে মানবীয় প্রবৃত্তি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান। পৃথিবীতে এসে তাঁরা জোহরা নামের এক রূপসী নারীর প্রেমে পড়েন, তার প্ররোচনায় মদপান করেন, মূর্তিকে সিজদা করেন, এমনকি এক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেন। এই পাপের শাস্তি হিসেবে তাঁদের ব্যাবিলনের এক কূপে কিয়ামত পর্যন্ত উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, আর জোহরাকে আকাশে তুলে শুক্র তারা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফেরেশতারা তো পৃথিবীতে আসেন মহান আল্লাহর রহমত নিয়ে, তাই না? কিন্তু যদি আপনাকে বলি আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে আসমান থেকে এমন দুজন ফেরেশতা পৃথিবীতে এসেছিলেন যাদের কাছে এক ভয়ংকর জ্ঞান ছিল। এমন এক জ্ঞান যা শিখলে মানুষ চিরকালের জন্য জাহান্নামী হয়ে যেত।
গল্পটি যতই রোমাঞ্চকর শোনাক, এর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতের তাফসিরে স্পষ্ট করেছেন, এ-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর বড় অংশ ইসরায়েলি রেওয়ায়াত, অর্থাৎ বনী ইসরাইলের প্রাচীন কাহিনি থেকে আসা বর্ণনা। এগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
তা ছাড়া এই গল্প কুরআনের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কুরআন ফেরেশতাদের পরিচয় দিয়েছে এমন সম্মানিত বান্দা হিসেবে, যাঁরা আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করেন না এবং যা আদেশ করা হয়, তা-ই পালন করেন (সূরা আত-তাহরিম, ৬৬:৬; সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২৬–২৭)। যে ফেরেশতারা পাপ করতে পারেন না, তাঁদের মদপান, শিরক ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে জড়ানোর কাহিনি তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাহলে আসল সত্য কী? কুরআন হারুত-মারুত সম্পর্কে কী বলেছে? কেন আল্লাহ এই দুই ফেরেশতাকে ব্যাবিলনে পাঠিয়েছিলেন? চলুন, কুরআন ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের আলোকে সেই রহস্যময় অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকাই।
সুলাইমান (আ.)-এর অনন্য রাজত্ব
মূল ঘটনায় প্রবেশের আগে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায়ে, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্বকালে। তিনি আল্লাহর কাছে এমন এক রাজত্ব চেয়েছিলেন, যা তাঁর পরে আর কাউকে দেওয়া হবে না (সূরা সাদ, ৩৮:৩৫), এবং আল্লাহ তাঁর সেই দোয়া কবুল করেছিলেন।
তাঁর রাজত্ব কেবল মানুষের ওপর সীমাবদ্ধ ছিল না। আল্লাহর হুকুমে বাতাস তাঁর আদেশে প্রবাহিত হতো, পশুপাখির ভাষা তিনি বুঝতেন, আর জিনেরা তাঁর অধীনে কাজ করত। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, জিনেরা তাঁর জন্য বিশাল প্রাসাদ, ভাস্কর্য, পুকুরসম বড় বড় পাত্র এবং স্থির ডেগ নির্মাণ করত (সূরা সাবা, ৩৪:১২–১৩)। কেউ কেউ সমুদ্রে ডুব দিয়ে মূল্যবান সম্পদ তুলে আনত (সূরা সাদ, ৩৮:৩৭)।
যে জিন জাতি মানুষের আগে পৃথিবীতে ইচ্ছেমতো বিচরণ করত, তারা নবীর এই ঐশী ক্ষমতার সামনে ছিল সম্পূর্ণ অসহায়। কিন্তু সময়ের নিয়মে একদিন সুলাইমান (আ.) ইন্তেকাল করলেন। কুরআন জানায়, তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মারা যান, আর জিনেরা দীর্ঘ সময় তা টেরই পায়নি। ঘুণপোকা যখন লাঠিটি খেয়ে ফেলল এবং তাঁর দেহ মাটিতে পড়ে গেল, তখন জিনেরা বুঝল, তারা যদি অদৃশ্যের খবর জানত, তাহলে এত দিন অপমানজনক শ্রমে আটকে থাকত না (সূরা সাবা, ৩৪:১৪)। এই ঘটনা চিরকালের জন্য প্রমাণ করে দিল, জিনেরা গায়েব জানে না।
শয়তানের ষড়যন্ত্র: এক নবীর নামে জাদুর অপবাদ
সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর শয়তানেরা এক ভয়ংকর ধোঁকার পরিকল্পনা করল। তারা চাইল একজন সম্মানিত নবীর নাম কলঙ্কিত করতে এবং মানুষকে শিরক ও কুফরের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে।
ইবনে কাসির, ইবনে জারির তাবারিসহ মুফাসসিরগণ সাহাবি ও তাবেয়িদের সূত্রে যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, তার সারকথা হলো: শয়তানেরা জাদুর মন্ত্র, কুফরি কথা এবং আসমান থেকে চুরি করে শোনা কিছু তথ্যের সঙ্গে অসংখ্য মিথ্যা মিশিয়ে কিছু লেখা তৈরি করে। এরপর তারা প্রচার করে যে সুলাইমান (আ.) আসলে নবী ছিলেন না, বরং এসব জাদুর বলেই তিনি জিন, মানুষ ও বাতাসের ওপর রাজত্ব করতেন। কিছু বর্ণনায় আছে, এসব লেখা তাঁর সিংহাসনের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, পরে মানুষ সেগুলো বের করে এনে এই অপবাদকে সত্য বলে মেনে নেয়।
বনী ইসরাইলের জন্য তখন জীবনবিধান ছিল হযরত মুসা (আ.)-এর ওপর নাজিল হওয়া তাওরাত। কিন্তু দুনিয়ার ক্ষমতা ও প্রভাবের মোহে তাদের একটি অংশ আল্লাহর কিতাবকে পেছনে ফেলে শয়তানের শেখানো জাদুবিদ্যাকেই আঁকড়ে ধরল। কুরআন এই আচরণের কথা উল্লেখ করেছে ঠিক আগের আয়াতে: তাদের একদল আল্লাহর কিতাবকে এমনভাবে পেছনে ছুড়ে ফেলল, যেন তারা কিছুই জানে না (সূরা আল-বাকারা, ২:১০১)। ফলে সমাজে জাদুর চর্চা ছড়িয়ে পড়ল, মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ভুলে যেতে লাগল, আর নেমে এল এক ভয়াবহ আধ্যাত্মিক মহামারি।
ব্যাবিলন: পরীক্ষার ভূমি
জাদুর এই প্রভাব একসময় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে উন্নত ও রহস্যময় নগরী ব্যাবিলনে চরম আকার ধারণ করে। ব্যাবিলন ছিল জ্যোতিষচর্চা, মন্ত্রতন্ত্র ও জাদুবিদ্যার জন্য প্রাচীন বিশ্বে কুখ্যাত। সেখানে জাদুকরদের দাপট এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মানুষ নবীদের মুজেজা আর জাদুকরদের ভেলকির মধ্যে পার্থক্য করতে পারছিল না।
এই প্রেক্ষাপটেই আল্লাহ দুজন ফেরেশতাকে ব্যাবিলনে পাঠালেন। কুরআন তাঁদের নাম উল্লেখ করেছে: হারুত ও মারুত। অনেক মুফাসসিরের মতে, তাঁরা মানুষের রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কেন মানুষকে জাদু শেখানোর জন্য ফেরেশতা পাঠাবেন? এর উত্তরে মুফাসসিরগণ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। প্রথমত, শয়তানেরা জাদুকে নবীদের ক্ষমতা বা ঐশী জ্ঞান বলে প্রচার করছিল। তাই ফেরেশতাদের মাধ্যমে জাদুর প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করা প্রয়োজন ছিল, যাতে মানুষ বুঝতে পারে কোনটি আল্লাহর দেওয়া মুজেজা আর কোনটি শয়তানি কুফরি বিদ্যা। দ্বিতীয়ত, এটি ছিল মানুষের ঈমানের জন্য একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা বা ফিতনা। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, আর তিনি দেখতে চাইলেন কারা ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার লোভে শয়তানের পথে পা বাড়ায়, আর কারা আল্লাহর ভয়ে নিজেদের ঈমান রক্ষা করে।
উল্লেখ্য, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু মুফাসসির আয়াতের একটি শব্দকে না-বোধক অর্থে নিয়ে বলেছেন, ফেরেশতাদের ওপর জাদু অবতীর্ণ হয়নি। তবে ইবনে কাসিরসহ অধিকাংশ মুফাসসির প্রথম ব্যাখ্যাটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, অর্থাৎ হারুত-মারুত ছিলেন পরীক্ষাস্বরূপ প্রেরিত ফেরেশতা।
বিষ চেনানো ডাক্তার ও জাল নোট চেনানো কর্মকর্তা
বিষয়টি একটি উদাহরণে সহজে বোঝা যায়। একজন ডাক্তার বিষের প্রকৃতি সম্পর্কে জানেন মানুষকে বাঁচানোর জন্য, বিষ প্রয়োগের জন্য নয়। আবার ধরুন, সমাজে জাল নোটের ছড়াছড়ি, সাধারণ মানুষ আসল ও নকলের পার্থক্য বুঝতে পারছে না। তখন একজন সরকারি কর্মকর্তা এসে দেখালেন, জাল নোট কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে তা চেনা যায়। সঙ্গে কঠোরভাবে সতর্ক করলেন: “আমি শেখাচ্ছি কেবল চেনার জন্য। খবরদার, নিজে জাল নোট বানাতে যাবেন না, তাহলে কঠিন শাস্তি পাবেন।”
এখন কেউ যদি সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেই জাল নোট ছাপাতে শুরু করে, তার দায় কি সেই কর্মকর্তার? একেবারেই নয়। হারুত-মারুতের বিষয়টিও অনেকটা এমন। তাঁরা কাউকে ডেকে ডেকে পাপে উৎসাহিত করতেন না। বরং কেউ শিখতে এলে তাকে শেখানোর আগে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিতেন। কুরআন তাঁদের সেই সতর্কবাণী হুবহু উল্লেখ করেছে:
إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
অর্থ: “আমরা তো কেবল একটি পরীক্ষা; সুতরাং তুমি কুফরি করো না।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১০২)
একবার ভাবুন দৃশ্যটি। দুজন ফেরেশতা নিজেরাই সতর্ক করছেন, এটি শিখলে তোমার ঈমান ধ্বংস হবে। এরপর কোনো সুস্থ বিবেকের মানুষের এর ধারেকাছেও যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের লোভ বড় ভয়ংকর। সতর্কবাণী শোনার পরও বহু মানুষ জেনে-বুঝে নিজের ঈমান বিক্রি করে দিল সাময়িক ক্ষমতার বিনিময়ে।
সংসার ভাঙার জাদু: শয়তানের প্রিয় কাজ
কুরআন জানিয়েছে, ব্যাবিলনের মানুষ সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে শিখত সেই জাদু, যা দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ জানিয়েছেন, ইবলিস তার সিংহাসন পানির ওপর স্থাপন করে বাহিনী পাঠায়, আর তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই শয়তান, যে এসে বলে, আমি অমুক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে ছাড়িনি।
একটি হালাল ও সাজানো সংসার ভেঙে দেওয়াই শয়তানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। যে দুজন মানুষ একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসত, হঠাৎ করেই তারা একে অপরকে সহ্য করতে পারে না; অকারণে ঝগড়া, অবিশ্বাস আর তিক্ততা বাড়তে থাকে, শেষ পরিণতি হয় বিচ্ছেদ। ব্যাবিলনের হিংসুক মানুষেরা অন্যের সুখ সহ্য করতে না পেরে এই কালো বিদ্যার মাধ্যমে বহু পরিবার তছনছ করেছিল। অথচ তারা বোঝেনি, অন্যের সংসার ভাঙতে গিয়ে তারা আসলে নিজেদের আখেরাতই ধ্বংস করছে।
মদিনায় ইহুদিদের অপবাদ ও আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
শতাব্দী পেরিয়ে পৃথিবী প্রবেশ করল নতুন যুগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনায় তখন ইহুদি পণ্ডিতদের বেশ প্রভাব ছিল। তারা প্রাচীন কিতাব ও ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানত, কিন্তু তাদের অনেকের অন্তরে সত্য মেনে নেওয়ার সদিচ্ছা ছিল না।
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সুলাইমান (আ.)-কে নবীদের মধ্যে উল্লেখ করলেন, তখন তাদের কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করে বলল, মুহাম্মদ সুলাইমানকে নবী বলছে, অথচ সে তো একজন জাদুকর ছিল। একজন সম্মানিত নবীর বিরুদ্ধে এই জঘন্য অপবাদের জবাবে নাজিল হলো সূরা আল-বাকারার ঐতিহাসিক ১০২ নম্বর আয়াত:
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَىٰ مُلْكِ سُلَيْمَانَ ۖ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ
অর্থ: “আর তারা সেই জিনিসের অনুসরণ করল, যা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানেরা আবৃত্তি করত। অথচ সুলাইমান কুফরি করেননি, বরং শয়তানেরাই কুফরি করেছিল; তারা মানুষকে জাদু শেখাত, এবং (তারা অনুসরণ করল) যা ব্যাবিলনে দুই ফেরেশতা হারুত ও মারুতের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল।”
এই একটি আয়াত মদিনার অপবাদকারীদের সব যুক্তি চূর্ণ করে দিল। আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য সুলাইমান (আ.)-এর পবিত্র চরিত্রকে জাদুর অপবাদ থেকে মুক্ত ঘোষণা করলেন, এবং স্পষ্ট করলেন যে কুফরি তিনি নন, শয়তানেরাই করেছিল।
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ ক্ষতি করতে পারে না
একই আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ মানবজাতির জন্য এক গভীর ও চিরন্তন বার্তা দিয়েছেন:
فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ ۚ وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থ: “অতঃপর তারা তাদের দুজনের কাছ থেকে এমন বিদ্যা শিখত, যা দিয়ে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর মাধ্যমে কারও কোনো ক্ষতি করতে পারত না।”
এটি ইসলামি আকিদার একটি মৌলিক ভিত্তি। জাদু কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নয়; জাদুকর চাইলেই কাউকে ধ্বংস করতে পারে না। জাদু নিছক একটি মাধ্যম। একটি ছুরি যেমন নিজে থেকে কাউকে কাটতে পারে না, তেমনি দুনিয়ার সব জাদুকর মিলেও কারও এক চুল পরিমাণ ক্ষতি করতে পারবে না, যদি না আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞায় পরীক্ষাস্বরূপ তা ঘটার অনুমতি দেন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে আল্লাহ এমন জঘন্য জিনিসকে কার্যকর হতে দেন কেন? তিনি কি জাদুকে পছন্দ করেন? কখনোই নয়। কুরআন একে স্পষ্টভাবে কুফরি বলেছে, আর রাসূলুল্লাহ ﷺ জাদুকে সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত করেছেন (সহিহ বুখারি, ২৭৬৬)। কিন্তু এই দুনিয়া পরীক্ষার স্থান। একজন খুনি যখন ছুরি দিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, আল্লাহ সেই হত্যাকে পছন্দ করেন না; কিন্তু তিনি ছুরিকে কাটার বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। অপরাধী তার ইচ্ছার অপব্যবহারের জন্য শাস্তি পাবে, আর মজলুমের প্রতি আল্লাহ পূর্ণ ন্যায়বিচার করবেন। এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক কেবল তিনিই।
জাদুকরদের শেষ পরিণতি
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ জাদু শিক্ষার্থীদের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর ঘোষণা দিয়েছেন: তারা এমন জিনিস শেখে, যা তাদের ক্ষতি করে এবং কোনো উপকারে আসে না। তারা ভালো করেই জানে, যে এটি কিনে নেয়, আখেরাতে তার কোনো অংশ নেই। কত নিকৃষ্ট সেই জিনিস, যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে, যদি তারা বুঝত!
ব্যাবিলনের সেই লোভী মানুষগুলো দুনিয়াতে হয়তো সাময়িক ক্ষমতা পেয়েছিল, অন্যের ক্ষতি করে পৈশাচিক আনন্দও পেয়েছিল। কিন্তু কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী আখেরাতে তাদের জন্য কল্যাণের কোনো অংশই নেই। দুনিয়ার কয়েক দিনের প্রভাবের বিনিময়ে অনন্ত জীবনের সর্বনাশ, এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
আজকের সমাজে ব্যাবিলনের ছায়া
হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এই অন্ধকার আমাদের সমাজ থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। আজও মানুষ ব্যবসায় অন্যকে ঠকাতে, সম্পত্তির লোভে কিংবা ঈর্ষার বশে অন্যের সুখের সংসার ভাঙতে ছুটে যায় ভণ্ড জাদুকর, গণক ও কুফরি তাবিজ-কবজের কারবারিদের কাছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে, চল্লিশ রাত পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হয় না (সহিহ মুসলিম, ২২৩০)। জাদুর আশ্রয় নেওয়া মানে আল্লাহর ওপর ভরসার বদলে শয়তানের কাছে সাহায্য চাওয়া, যা ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি।
এমনকি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপরও জাদু করা হয়েছিল। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, লাবিদ ইবনুল আসাম নামের এক ব্যক্তি তাঁর ওপর জাদু করেছিল, ফলে তিনি কিছু সময় এক ধরনের অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। তিনি বারবার আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, এবং আল্লাহ স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে জাদুর স্থান ও প্রতিকার জানিয়ে দিলেন (সহিহ বুখারি, ৫৭৬৩)। তিনি কোনো জাদুকরের দ্বারস্থ হননি; বরং দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসাকেই প্রতিকারের পথ বানিয়েছিলেন।
জাদু থেকে বাঁচার ঐশী ঢাল
তাই জীবনে যদি অস্বাভাবিক কোনো সমস্যা আসে, ব্যবসায় হঠাৎ ধস নামে কিংবা পরিবারে অকারণ অশান্তি দেখা দেয়, তবে গণক বা জাদুকরের কাছে গিয়ে নিজের ঈমান হারাবেন না। প্রথমে বাস্তব কারণগুলো খুঁজুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, আর একই সঙ্গে সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় চান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের যে সুরক্ষা শিখিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে সকাল-সন্ধ্যার জিকির, প্রতি ফরজ নামাজের পর ও ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫) এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস তিলাওয়াত। সূরা ফালাক ও নাস বিশেষভাবে জাদু, হিংসা ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনার দোয়া।
মানুষ হিসেবে আমরা দুর্বল। দুনিয়ার ব্যস্ততায় অনেক সময় এসব আমল নিয়মিত ধরে রাখতে পারি না, গাফেল হয়ে যাই। তবু হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট জানিয়েছেন, শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল (সূরা আন-নিসা, ৪:৭৬)। আর যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যের আশ্রয় নেয়, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে নিজের জন্য ঘর বানায়; অথচ সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সবচেয়ে দুর্বল (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪১)। প্রয়োজন শুধু মহান রবের ওপর খাঁটি তাওয়াক্কুল।
উপসংহার
হারুত ও মারুতের প্রকৃত ঘটনা কোনো রোমাঞ্চকর প্রেমকাহিনি নয়; এটি ঈমানের পরীক্ষা, নবীর মর্যাদা রক্ষা এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার দায়বদ্ধতার এক গভীর শিক্ষা। সূরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াত আমাদের শেখায়, সুলাইমান (আ.) ছিলেন নির্দোষ, জাদু হলো কুফরি, আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো জাদুকর কারও ক্ষতি করতে পারে না।
প্রাচীন ব্যাবিলন থেকে আজকের আধুনিক সমাজ পর্যন্ত জাদুর অন্ধকার যেখানেই থাকুক, তা থেকে বাঁচার পথ একটিই: আল্লাহর ওপর অটল ভরসা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো সুন্নাহর অনুসরণ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুর্বলতা কাটিয়ে এই আমলগুলো নিয়মিত করার এবং সব ধরনের জাদু ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজতে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র
১. সূরা আল-বাকারা, ২:১০১–১০২ (হারুত-মারুত ও জাদু; এই পৃষ্ঠায় তাফসির ইবনে কাসিরও পড়া যায়): https://quran.com/2/101-102
২. সূরা আত-তাহরিম, ৬৬:৬ (ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না): https://quran.com/66/6
৩. সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২৬–২৭: https://quran.com/21/26-27
৪. সূরা সাদ, ৩৮:৩৫–৩৮ (সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্ব): https://quran.com/38/35-38
৫. সূরা সাবা, ৩৪:১২–১৪ (জিনদের কাজ ও সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যু): https://quran.com/34/12-14
৬. সূরা আন-নিসা, ৪:৭৬ (শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল): https://quran.com/4/76
৭. সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪১ (মাকড়সার ঘরের দৃষ্টান্ত): https://quran.com/29/41
৮. সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৬৩ (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর জাদু): https://sunnah.com/bukhari:5763
৯. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৬৬ (সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ): https://sunnah.com/bukhari:2766
১০. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৩০ (গণকের কাছে যাওয়া): https://sunnah.com/muslim:2230
১১. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮১৩ (ইবলিসের সিংহাসন ও স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ): https://sunnah.com/muslim:2813
১২. সূরা আল-ফালাক (১১৩) ও সূরা আন-নাস (১১৪): https://quran.com/113 এবং https://quran.com/114
