কঙ্কাল থেকে পুনরুজ্জীবন

কঙ্কাল থেকে পুনরুজ্জীবন

কঙ্কাল থেকে পুনরুজ্জীবন – একই জায়গায়, একই সময়ে, পাশাপাশি রাখা দুটো জিনিস। একটি ছিল— সামান্য কিছু খাবার আর একটু পানীয়। অন্যটি ছিল একজন মানুষ— একটি জীবন্ত গাধা।

ঠিক একশো বছর পর… খাবারটি ছিল অবিকল তাজা, যেন এইমাত্র রাখা হয়েছে! আর গাধাটি? তার কিছু সাদা হাড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

একই রোদ, একই বৃষ্টি, একই মাটি… তবুও একটি টিকে রইল, অন্যটি ধ্বংস হলো। কেন? কারণ মহান আল্লাহ দেখাতে চেয়েছিলেন— সংরক্ষণ এবং ধ্বংস, দুটোই কেবল তাঁরই হাতে।

আল্লাহ কেন বিশেষভাবে এই ঘটনাটিকে পবিত্র কুরআনে চিরস্থায়ী করে রাখলেন? এই একটিমাত্র ঘটনার মাঝে লুকিয়ে আছে মৃত্যু, সময়, পুনরুজ্জীবন এবং ঈমানের এমন সব রহস্য, যা শুনলে আপনার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে যেতে পারে।

এই রোমহর্ষক ঘটনায় প্রবেশের আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক বিষাদময় অধ্যায়ে। আপনি যদি শুধু ‘একজন মানুষ একশো বছর ঘুমালেন’— এই অংশটুকু শোনেন, তবে এই ঘটনার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে পারবেন না। কারণ, এই ঘটনার পেছনে আছে এক পুরো জাতির ধ্বংস, এক পবিত্র নগরীর পতন এবং বনি ইসরাইলের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।

একজন মানুষ মারা গেলেন, তারপর পুরো একশো বছর পর আল্লাহ তাঁকে আবার জীবিত করলেন। চোখ খুলে তিনি ভাবলেন, হয়তো এক দিন বা দিনের কিছু অংশ ঘুমিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই ঘটনা মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায়।

তবে কেউ যদি শুধু “একজন মানুষ একশো বছর পর জেগে উঠলেন” এটুকুই জানেন, তাহলে ঘটনার প্রকৃত গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এর পেছনে রয়েছে একটি পুরো জাতির পতন, একটি পবিত্র নগরীর ধ্বংস এবং বনি ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। তাই মূল ঘটনায় প্রবেশের আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই বিষাদময় সময়ে।

বায়তুল মুকাদ্দাস: একটি জাতির হৃদয়

হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের যুগের পর কয়েক শতাব্দী কেটে গেছে। বনি ইসরাইল তখনও আল্লাহর দেওয়া পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেম ও তার আশপাশে বসবাস করছে। এই শহর ছিল তাদের হৃদয়। এখানেই ছিল সুলাইমান (আ.)-এর নির্মিত মহান ইবাদতগৃহ, এখানেই সংরক্ষিত ছিল তাওরাতের বহু পবিত্র পাণ্ডুলিপি। এই নগরী ছিল তাদের ঐতিহ্য, পরিচয় ও ঈমানের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বনি ইসরাইল আবারও আল্লাহকে ভুলে যেতে শুরু করে। তারা নবীদের সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করে, এমনকি কোনো কোনো নবীকে হত্যা পর্যন্ত করে। কুরআন তাদের এই অপরাধের কথা একাধিক স্থানে উল্লেখ করেছে (সূরা আল-বাকারা, ২:৬১)। সমাজে ছড়িয়ে পড়ে সুদ, ব্যভিচার, মিথ্যা এবং নিজেদের স্বার্থে আল্লাহর বিধান বিকৃত করার প্রবণতা। বারবার সতর্ক করা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি।

কুরআন আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, বনি ইসরাইল পৃথিবীতে দুবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, আর প্রতিবার আল্লাহ তাদের ওপর এমন শক্তিশালী বাহিনী পাঠাবেন, যারা ঘরে ঘরে ঢুকে সব তছনছ করে দেবে (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৪–৫)। অনেক মুফাসসিরের মতে, সেই প্রথম শাস্তিরই একটি রূপ ছিল এই ধ্বংসযজ্ঞ।

বুখতনাসরের আক্রমণ ও নগরীর পতন

অবশেষে এল সেই ভয়ংকর দিন। তাফসির ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে এল ব্যাবিলনের প্রতাপশালী সম্রাট বুখতনাসরের বিশাল বাহিনী। ইতিহাসে তিনি পরিচিত নেবুচাদনেজার নামে। ঐতিহাসিকদের হিসাবে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে তাঁর বাহিনী জেরুজালেম জয় করে।

তাঁর সৈন্যরা বায়তুল মুকাদ্দাস ঘিরে ফেলল। শুরু হলো দীর্ঘ ও দুঃসহ অবরোধ। একসময় ভেঙে পড়ল শহরের প্রাচীর। এরপর যা ঘটল, তাফসিরের বর্ণনায় তা এক বিভীষিকাময় চিত্র: শহর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো, পবিত্র ইবাদতগৃহ ধ্বংস করা হলো, তাওরাতের কপিগুলো আগুনে নিক্ষেপ করা হলো। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হলো, আর বাকিদের শিকল পরিয়ে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাবিলনে, দাসত্বের অন্ধকারে।

এক সময়ের গৌরবময় নগরী পরিণত হলো এক ভুতুড়ে জনশূন্য প্রান্তরে। রাস্তায় পড়ে রইল মানুষের কঙ্কাল, বাড়িঘর হয়ে গেল ধ্বংসস্তূপ, ছাদগুলো ভেঙে পড়ল দেয়ালের ওপর। যে শহর একসময় ইবাদত, তিলাওয়াত আর মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, সেখানে এখন শুধু বাতাসের শনশন শব্দ।

এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল আল্লাহর এক চিরন্তন নিয়মের প্রকাশ। কুরআন বারবার জানিয়েছে, কোনো জাতি নিজেদের অবস্থা না বদলানো পর্যন্ত আল্লাহ তাদের অবস্থা পরিবর্তন করেন না (সূরা আর-রাদ, ১৩:১১)। যে জাতিকে আল্লাহ নবী, কিতাব ও পবিত্র ভূমি দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন, সেই জাতিই যখন অবাধ্যতা, জুলুম ও বিধান বিকৃতিতে লিপ্ত হলো, তখন তাদের ওপর নেমে এল কঠিন শাস্তি। এখানে প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা রয়েছে: আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত ও মর্যাদা কোনো জাতির স্থায়ী অধিকার নয়, বরং তা দায়িত্ব ও আনুগত্যের সঙ্গে শর্তযুক্ত।

কুরআনের বর্ণনা: সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াত

এই ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের কথা দিয়েই কুরআন ঘটনাটি শুরু করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَىٰ قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَىٰ عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّىٰ يُحْيِي هَٰذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا

অর্থ: “অথবা সেই ব্যক্তির মতো, যে এমন এক জনপদ অতিক্রম করছিল, যার ছাদগুলো দেয়ালের ওপর ভেঙে পড়েছিল। সে বলল, মৃত্যুর পর আল্লাহ একে কীভাবে জীবিত করবেন?” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৯)

এই আয়াতটি এসেছে ঠিক আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায়, যেখানে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও অহংকারী রাজা নমরুদের বিতর্কের কথা বলা হয়েছে। ইবরাহিম (আ.) বলেছিলেন, “আমার রব তিনিই, যিনি জীবন দেন ও মৃত্যু ঘটান” (২:২৫৮)। এরপর আল্লাহ এই ঘটনার মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন, জীবন দান ও পুনর্জীবিত করার প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে।

কে ছিলেন সেই ব্যক্তি?

কুরআন তাঁর নাম উল্লেখ করেনি; শুধু বলেছে “একজন ব্যক্তি”। তবে তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ বহু মুফাসসিরের বর্ণনায় প্রসিদ্ধ মত হলো, তিনি ছিলেন হযরত উজাইর। কেউ কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন নবী আরমিয়া (যিরমিয়), আবার কেউ অন্য নামও উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, তিনি ছিলেন একজন সৎ, চিন্তাশীল ও ঈমানদার মানুষ।

উল্লেখ্য, উজাইর নবী ছিলেন কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত দলিল নেই। একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন, তিনি জানেন না উজাইর নবী ছিলেন কি না (সুনানে আবু দাউদ, ৪৬৭৪)। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত দাবি না করাই সতর্কতা।

কুরআন কেন তাঁর নাম উল্লেখ করেনি? কারণ এই ঘটনার শিক্ষা কোনো ব্যক্তির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিটি ঈমানদারের জন্য, প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য। নাম নয়, বার্তাটাই এখানে মুখ্য।

মুসলিমদের কাছেও বায়তুল মুকাদ্দাস গভীর আবেগের স্থান। এটি ছিল মুসলিমদের প্রথম কিবলা, আর এখানেই অবস্থিত মসজিদুল আকসা, যেখানে মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল (সূরা আল-ইসরা, ১৭:১)। তাই এই নগরীর ধ্বংস ও পুনর্জাগরণের কাহিনি মুসলিম পাঠকের হৃদয়েও বিশেষ অনুরণন তোলে। যে নগরী একসময় মৃত্যুর নিস্তব্ধতায় ঢেকে গিয়েছিল, আল্লাহ তাকে আবার জীবন্ত করেছিলেন; ঠিক যেমন তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন।

মৃত নগরীর সামনে এক পথিক

কল্পনা করুন সেই দৃশ্য। একজন সৎ মানুষ দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছেন। বাহন একটি সাধারণ গাধা, সঙ্গে সামান্য খাবার। তাফসিরের বর্ণনায় এসেছে, তাঁর সঙ্গে ছিল কিছু ডুমুর বা আঙুর এবং একটি পাত্রে ফলের রস বা পানীয়। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য, চারদিকে তপ্ত বাতাস আর ধূ ধূ প্রান্তর।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছালেন সেই জনপদে। গাধার লাগাম টেনে থামলেন, চারপাশে তাকালেন, আর যা দেখলেন, তাতে তাঁর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। যেখানে একসময় বাজার ছিল, সেখানে এখন শুধু পাথরের স্তূপ। যেখানে ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, সেখানে পড়ে আছে কঙ্কাল। রাস্তার পাশে, ঘরের ভেতরে, কূপের ধারে, সবখানে ছড়িয়ে আছে মানুষের হাড়। কোনো পাখির ডাক নেই, কোনো মানুষের কণ্ঠ নেই। শুধু মৃত্যু, আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা।

গাধার পিঠে বসে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে তাঁর হৃদয়ে জেগে উঠল এক গভীর প্রশ্ন: এত পুরোনো এই হাড়, এত আগে মরে যাওয়া এই মানুষগুলো, আল্লাহ কীভাবে এদের আবার জীবিত করবেন?

সন্দেহ নয়, বিস্ময়

অধিকাংশ মুফাসসিরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি অবিশ্বাস বা সন্দেহের প্রশ্ন ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। কিন্তু চোখের সামনে এমন সর্বগ্রাসী ধ্বংস দেখে তাঁর মনে জেগেছিল বিস্ময় ও কৌতূহল: কীভাবে ঘটবে সেই পুনর্জীবন?

একটু ভাবুন, এমন প্রশ্ন আমাদের মনেও কখনো না কখনো আসে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ কীভাবে অগণিত মানুষকে একসঙ্গে জীবিত করবেন, যাদের দেহ বহু আগেই মাটিতে মিশে গেছে? কুরআন অবিশ্বাসীদের এমন প্রশ্নের কথাও উল্লেখ করেছে: “হাড়গুলো পচে-গলে যাওয়ার পর কে তাদের জীবিত করবে?” আর আল্লাহ জবাব দিয়েছেন, “বলো, তিনিই জীবিত করবেন, যিনি প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছেন” (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৭৮–৭৯)।

পার্থক্য হলো, অবিশ্বাসী প্রশ্ন করে অস্বীকারের জন্য, আর ঈমানদার প্রশ্ন করে গভীরতর উপলব্ধির জন্য। এই সৎ মানুষটির প্রশ্ন ছিল দ্বিতীয় ধরনের। আর আল্লাহ তাঁর প্রশ্নের এমন উত্তর দিলেন, যা পৃথিবীর আর কেউ দিতে পারত না। এমন এক পাঠ, যার পাতা হবেন তিনি নিজেই।

একশো বছরের মৃত্যু

فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ

অর্থ: “অতঃপর আল্লাহ তাকে একশো বছর মৃত রাখলেন, তারপর তাকে জীবিত করলেন।”

ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলেন। পাশে পড়ে রইল খাবার আর পানীয়ের পাত্র, পাশে তাঁর গাধাটিও। ধ্বংসস্তূপের মাঝে যুক্ত হলো আরও একটি মৃতদেহ, নিঃসঙ্গ ও পরিত্যক্ত।

এরপর শুরু হলো সময়ের এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে দশক, দশক পেরিয়ে পুরো একটি শতাব্দী। ভেবে দেখুন, একশো বছরে পৃথিবীতে কত কিছু বদলে যায়। যে শিশু তখন জন্মেছিল, সে বড় হলো, সংসার করল, সন্তানের পিতা হলো, তারপর দাদা হয়ে একদিন মৃত্যুবরণ করল। একশো বছরে তিনটি প্রজন্ম পার হয়ে যায়।

এই সময়ে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটল। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যাবিলনের পতনের পর পারস্য সম্রাট কুরুশ (সাইরাস) বন্দী বনি ইসরাইলকে মুক্তি দেন, এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ভূমিতে ফিরে আসতে শুরু করে। ধ্বংসস্তূপ সাফ হতে লাগল, নতুন ঘরবাড়ি উঠল, ইবাদতগৃহ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হলো, নগরীতে ফিরে এল জীবনের কোলাহল।

কিন্তু এক নির্জন কোণে, যেখানে সেই মানুষটি পড়ে ছিলেন, সেখানে সময় যেন থেমে ছিল। কেউ তাঁকে খুঁজে পায়নি, কেউ তাঁর দাফন করেনি। তাঁর পরিবার হয়তো ভেবেছিল তিনি চিরতরে হারিয়ে গেছেন। তাঁর সন্তানেরা বড় হয়ে বার্ধক্যে পৌঁছেছে, কিংবা হয়তো তাঁর নামও কেউ আর মনে রাখেনি।

আর তাঁর গাধাটির কী হলো? প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মাংস কয়েক দিনে পচে যায়, কয়েক মাসে সব বিলীন হয়ে শুধু হাড় থাকে, আর বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে সেই হাড়ও ধূসর হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। একশো বছর পর গাধাটির অবশিষ্ট বলতে ছিল কেবল কিছু বিক্ষিপ্ত সাদা হাড়।

কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, তাঁর পাশে রাখা খাবার ও পানীয় একশো বছর পরেও পচেনি, শুকায়নি, স্বাদ বা রং বদলায়নি। যে খাবার স্বাভাবিকভাবে দুই দিনেই নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহর কুদরতে তা অবিকল তাজা রয়ে গেল। একই স্থানে, একই আবহাওয়ায়, একই সময়ে একদিকে গাধা হাড়ে পরিণত হলো, অন্যদিকে খাবার অক্ষত থাকল। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক মহান শিক্ষা।

পুনর্জীবন: “এক দিন, নাকি তারও কম?”

একশো বছর শেষ হলো। আল্লাহর হুকুমে মানুষটির দেহে আবার প্রাণ ফিরে এল। তিনি চোখ খুললেন, চারদিকে তাকালেন। তাফসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, দিনের প্রথম ভাগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, আর জীবিত হলেন দিনের শেষ ভাগে, সূর্যাস্তের আগে। সূর্য সামান্য সরে গেছে, ছায়া একটু দীর্ঘ হয়েছে। শরীরে কোনো ব্যথা নেই, ক্লান্তি নেই; সবকিছুই যেন আগের মতো।

তখনই তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, “তুমি কতকাল এ অবস্থায় ছিলে?” তিনি সরল মনে নিজের অনুভূতি অনুযায়ী উত্তর দিলেন:

قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ۖ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ۖ قَالَ بَل لَّبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ

অর্থ: “তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কতকাল ছিলে? সে বলল, এক দিন বা এক দিনের কিছু অংশ। তিনি বললেন, বরং তুমি একশো বছর ছিলে।”

কথাটি তাঁর কাছে বজ্রপাতের মতো ছিল। একশো বছর! কীভাবে সম্ভব? তিনি তো ক্ষুধার্ত নন, তাঁর অনুভূতিতে তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা কেটেছে। এই বিস্ময় দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই আল্লাহ তাঁকে দেখালেন তিনটি অকাট্য প্রমাণ।

তিনটি অকাট্য প্রমাণ

فَانظُرْ إِلَىٰ طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهْ ۖ وَانظُرْ إِلَىٰ حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِّلنَّاسِ ۖ وَانظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا

অর্থ: “এবার তোমার খাবার ও পানীয়ের দিকে তাকাও, তা একটুও বদলায়নি; আর তোমার গাধার দিকে তাকাও। আর এটা এজন্য যে, আমি তোমাকে মানুষের জন্য একটি নিদর্শন বানাতে চাই। আর হাড়গুলোর দিকে তাকাও, কীভাবে আমি সেগুলো জোড়া লাগাই, তারপর তা মাংস দিয়ে ঢেকে দিই।”

প্রথম প্রমাণ: অক্ষত খাবার। তিনি তাকালেন খাবারের দিকে। অবিকল সেই রকম, যেমনটি তিনি রেখেছিলেন; রং, সজীবতা, স্বাদ কিছুই বদলায়নি। এর মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন, তিনি চাইলে সাধারণ বস্তুকেও সময়ের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারেন। সময় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, আল্লাহ সময়ের নিয়ন্ত্রণে নন।

দ্বিতীয় প্রমাণ: হাড় হয়ে যাওয়া গাধা। তিনি তাকালেন তাঁর বাহনের দিকে। সেখানে কোনো গাধা নেই, পড়ে আছে কেবল কিছু বিক্ষিপ্ত সাদা হাড়। তাঁর হিসাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে প্রাণীটি জীবিত ছিল, সে এখন চেনার অযোগ্য কঙ্কাল। পাশাপাশি দুটি বিপরীত দৃশ্য: একদিকে অক্ষত খাবার, অন্যদিকে বিলীন গাধা। সংরক্ষণ ও ধ্বংস, দুটোই আল্লাহর হাতে।

তৃতীয় ও চূড়ান্ত প্রমাণ: চোখের সামনে পুনর্জীবন। এবার তিনি দেখলেন সেই দৃশ্য, যার প্রশ্ন তিনি একশো বছর আগে করেছিলেন। বিক্ষিপ্ত হাড়গুলো নড়ে উঠল, একে একে নিজ নিজ স্থানে এসে জোড়া লাগতে লাগল, গড়ে উঠল পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল। তারপর তার ওপর তৈরি হলো শিরা-উপশিরা ও মাংস, মাংসের ওপর এল চামড়া, আর সবশেষে আল্লাহর হুকুমে তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হলো। গাধাটি উঠে দাঁড়াল, যেন এইমাত্র ঘুম থেকে জেগেছে।

“আমি জানি, আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান”

মানুষটির চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। যে প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজছিলেন, তা পেলেন কোনো তর্কে নয়, কোনো কিতাবে নয়, অন্য কারও বর্ণনাতেও নয়, বরং নিজের চোখে। কুরআন তাঁর সেই ঘোষণা চিরস্থায়ী করে রেখেছে:

فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

অর্থ: “অতঃপর যখন তার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হলো, সে বলল, আমি জানি, নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”

লক্ষণীয়, আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁকে “মানুষের জন্য একটি নিদর্শন” বানাতে চেয়েছেন। তাফসিরে বর্ণিত আছে, তিনি নিজ জনপদে ফিরে গেলে মানুষ প্রথমে তাঁকে চিনতে পারেনি। তাঁর বয়স তখনো সেই আগের মতো, অথচ তাঁর সন্তান ও নাতিরা বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে। কিছু বর্ণনায় আছে, তিনি স্মৃতি থেকে তাওরাত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। এসব বিবরণের অনেকটাই ইসরায়েলি বর্ণনানির্ভর, তাই সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। তবে কুরআনের মূল বার্তা স্পষ্ট: তাঁর জীবন নিজেই হয়ে উঠেছিল পুনরুত্থানের জীবন্ত প্রমাণ।

এর ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর একটি অনুরূপ ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে দেখতে চেয়েছিলেন, কীভাবে মৃতকে জীবিত করা হয়। আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি বিশ্বাস করো না?” তিনি বললেন, “অবশ্যই করি, তবে যাতে আমার হৃদয় প্রশান্ত হয়” (২:২৬০)। পাশাপাশি দুটি ঘটনাই দেখায়, ঈমানদারের প্রশ্ন সন্দেহ নয়, বরং প্রশান্তির সন্ধান।

এই ঘটনার পাঁচটি অমূল্য শিক্ষা

প্রথম শিক্ষা: সময় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। আমরা সময়কে একটি সরল রেখা ভাবি, যা কেবল সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ চাইলে একশো বছরকে এক মুহূর্তের মতো অনুভব করাতে পারেন। গুহাবাসী যুবকদের ঘটনাতেও একই চিত্র দেখা যায়; বহু বছর পর জেগে তাঁরাও বলেছিলেন, এক দিন বা দিনের কিছু অংশ কাটিয়েছি (সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৯)।

দ্বিতীয় শিক্ষা: পুনরুত্থান অকাট্য সত্য। যিনি বিক্ষিপ্ত হাড় থেকে একটি গাধাকে জীবিত করতে পারেন, তিনি অবশ্যই মাটিতে মিশে যাওয়া মানুষকেও আবার জীবিত করবেন। অবিশ্বাসীরা যতই প্রশ্ন তুলুক, আল্লাহর কাছে এটি কোনো কঠিন কাজ নয়।

তৃতীয় শিক্ষা: বিস্ময় আর সন্দেহ এক নয়। আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা ও ক্ষমতার গভীরতা দেখে একজন প্রকৃত ঈমানদারও বিস্মিত হতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু সন্দেহের জন্ম অবিশ্বাস থেকে, আর বিস্ময়ের জন্ম গভীর বিশ্বাস থেকে। সঠিক প্রশ্ন ঈমানকে আরও দৃঢ় করে।

চতুর্থ শিক্ষা: সংরক্ষণ ও ধ্বংস দুটোই আল্লাহর হাতে। একই স্থানে খাবার টিকে রইল, গাধা বিলীন হলো। আমাদের সম্পদ, ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, সবকিছুই তাঁর ইচ্ছার অধীন। আজ যা আছে, কাল তা থাকতেও পারে, না-ও পারে। তাই অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা ও তাওয়াক্কুলই মুমিনের পথ।

পঞ্চম ও সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা: জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। আমাদের অধিকাংশের আয়ু ষাট, সত্তর বা আশি বছর; অনেকে তার অর্ধেকও পান না। সেই মানুষটি একশো বছর পর জেগে বলেছিলেন “এক দিন”। কুরআন জানায়, কিয়ামতের দিন মানুষও তাদের দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে একই কথা বলবে: আমরা তো এক দিন বা দিনের কিছু অংশ ছিলাম (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১১২–১১৩)। কিন্তু তখন আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না, কাজের সময় শেষ হয়ে যাবে।

উপসংহার: আপনি কি প্রস্তুত?

সূরা বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াতের এই ঘটনা কেবল একটি অলৌকিক কাহিনি নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি আয়না। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর অবাধ্যতার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। একশো বছরের মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। আর হাড় থেকে জীবিত হওয়া গাধা মনে করিয়ে দেয়, পুনরুত্থান অবধারিত।

তাই আজ, এই মুহূর্তে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন: আল্লাহ যদি আজ রাতেই আমার প্রাণ কেড়ে নেন, আর পুনরুত্থানের দিন জেগে উঠে দেখি সামনে হিসাবের মুহূর্ত, আমি কি প্রস্তুত? দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে, নাকি আল্লাহর পথে চলতে চলতে কাটছে আমার সময়? গুনাহে ডুবে থেকে, নাকি তওবায় ফিরে?

মহান আল্লাহ আমাদের তাঁর নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দেওয়ার এবং পুনরুত্থানের দিনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র

১. সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৮–২৬০ (মূল ঘটনা ও পূর্বাপর আয়াত; এই পৃষ্ঠায় তাফসির ইবনে কাসিরও পড়া যায়): https://quran.com/2/258-260

২. সূরা আল-ইসরা, ১৭:৪–৭ (বনি ইসরাইলের দুই বিপর্যয়): https://quran.com/17/4-7

৩. সূরা আর-রাদ, ১৩:১১ এবং সূরা আল-ইসরা, ১৭:১: https://quran.com/13/11 এবং https://quran.com/17/1

৪. সূরা আল-বাকারা, ২:৬১ (নবীদের হত্যা ও অবাধ্যতা): https://quran.com/2/61

৫. সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৭৮–৭৯ (পচে যাওয়া হাড়ের পুনর্জীবন): https://quran.com/36/78-79

৬. সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৯ (গুহাবাসীদের “এক দিন বা দিনের কিছু অংশ”): https://quran.com/18/19

৭. সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১১২–১১৩ (কিয়ামতের দিন দুনিয়ার জীবনকে স্বল্প মনে হবে): https://quran.com/23/112-113

৮. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬৭৪ (উজাইর নবী ছিলেন কি না): https://sunnah.com/abudawud:4674

৯. ইমাম ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম এবং কাসাসুল আম্বিয়া (উজাইর ও বায়তুল মুকাদ্দাসের ধ্বংস প্রসঙ্গ)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।