সুরাহ আল-কলম

সূরা আল-কলম :

সূরা আল-কলম : ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখনও আসমান তৈরি হয়নি, জমিন বিছানো হয়নি, মহাবিশ্বের কোনো অস্তিত্বই নেই। ঠিক সেই আদি মুহূর্তে, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে, মহান রবের নির্দেশে একটি রহস্যময় বস্তু লিখে চলেছে মহাকালের সমগ্র ইতিহাস।

এটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়। এটি সেই মহিমান্বিত কলম, যাকে আল্লাহ সৃষ্টির ঊষালগ্নে সৃষ্টি করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করলেন এবং তাকে বললেন, “লেখো।” কলম বলল, “হে আমার রব, আমি কী লিখব?” আল্লাহ বললেন, “কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি বস্তুর তাকদির লিখে ফেলো” (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭০০; জামে তিরমিজি, ২১৫৫)। আরেক সহিহ হাদিসে এসেছে, আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সৃষ্টিজগতের সব তাকদির লিখে রেখেছেন (সহিহ মুসলিম, ২৬৫৩)।

উল্লেখ্য, কলম নাকি আরশ প্রথম সৃষ্টি, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে। অনেক আলেমের মতে হাদিসের অর্থ হলো, এই সৃষ্টিজগতের তাকদির লেখার জন্য কলমই প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। যা-ই হোক, সেই মুহূর্ত থেকে কলম চলতে শুরু করল, আর লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ হয়ে গেল প্রতিটি মানুষের ভাগ্য, প্রতিটি গাছের পাতার ঝরে পড়া, এমনকি এই মুহূর্তে আপনার এই লেখাটি পড়াও। কুরআন বলে, কোনো পাতাও ঝরে না, যা তিনি জানেন না (৬:৫৯)।

কিন্তু জানেন কি, পবিত্র কুরআনের একটি বিশেষ সূরা এই মহান কলমের শপথ করেই শুনিয়েছে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা? মাত্র এক রাতে কীভাবে একদল অহংকারী ধনী ভাই সর্বস্বান্ত হয়ে গেল? কেন তাদের সযত্নে গড়ে তোলা বিশাল ফলের বাগান চোখের পলকে পুড়ে কালো ছাইয়ে পরিণত হলো? তারা কি কোনো ভুল করেছিল?

আর কেনই বা মক্কার কাফেরদের চোখের দৃষ্টিকে কুরআন এমনভাবে বর্ণনা করেছে, যেন তারা দৃষ্টি দিয়েই নবীজিকে আছড়ে ফেলবে? কী সেই বদনজর, যার সত্যতা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেছেন? আর কেনই বা আল্লাহ নবীজির চরিত্রকে “খুলুকুন আজিম” বা মহত্তম চরিত্র বলে ঘোষণা দিলেন? এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সূরা আল-কলমের সেই বিস্ময়কর ইতিহাস উন্মোচন করব, যেখানে মিশে আছে কলমের শপথ, এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাগানের আর্তনাদ এবং রাসূল ﷺ-এর চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বের আসমানি সনদ।

নবুয়তের শুরুর দিনের মক্কা

চলুন, সময়ের চাকা ঘুরিয়ে ফিরে যাই প্রায় চৌদ্দশ বছর আগের মক্কায়, নবুয়তের শুরুর দিনগুলোতে। চারদিকে ধূসর পাহাড় আর তপ্ত মরুভূমি; সূর্যের প্রখর তাপে পাথরগুলো যেন আগুনের মতো জ্বলত। কিন্তু সেই তপ্ত পাথরের চেয়েও বেশি উত্তপ্ত ছিল মক্কার সামাজিক পরিবেশ।

মক্কার আকাশ-বাতাস তখনও শিরকের অন্ধকারে আচ্ছন্ন। পবিত্র কাবার চারপাশে ছিল তিনশো ষাটটি মূর্তি (সহিহ বুখারি, ২৪৭৮)। সমাজের নেতৃত্বে ছিল কুরাইশের প্রভাবশালী সর্দাররা: আবু জাহেল, ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, উমাইয়া ইবনে খালাফ, আস ইবনে ওয়াইল প্রমুখ। তাদের ছিল ক্ষমতা, অর্থ আর বংশমর্যাদার প্রচণ্ড অহংকার। তারা মনে করত, সমাজ চলবে তাদের আঙুলের ইশারায়।

এমন সময় আবদুল্লাহর এতিম সন্তান মুহাম্মদ ﷺ তাওহিদের ডাক দিলেন। সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি কুরাইশদের আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলেন এবং এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানালেন। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই—এই একটি বাক্য মক্কার নেতাদের ক্ষমতার মসনদে ভূমিকম্প সৃষ্টি করল। তারা বুঝতে পারল, সাধারণ মানুষ যদি এক আল্লাহর ইবাদত শুরু করে, তাহলে মূর্তিকেন্দ্রিক অর্থনীতি, তাদের সর্দারি আর বংশগৌরব সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

শারীরিক আক্রমণের বদলে মানসিক যুদ্ধ

লাত, মানাত আর উজ্জার নামে শপথ করে তারা সিদ্ধান্ত নিল, যেকোনো মূল্যে এই আহ্বান থামাতে হবে। কিন্তু সমস্যা ছিল, তারা চাইলেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শারীরিকভাবে আঘাত করতে পারছিল না। মক্কার গোত্রপ্রথা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, আর নবীজির বংশ বনু হাশিম ছিল সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী। চাচা আবু তালিবের জীবদ্দশায় তাঁর গায়ে হাত তোলা মানে পুরো বনু হাশিমের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তাই কুরাইশ নেতারা বেছে নিল এক ভিন্ন ও জঘন্য পথ: মানসিক নির্যাতন ও চরিত্র হনন।

তাদের সভা-সমাবেশে তারা নিজেরাও স্বীকার করত, মুহাম্মদ যে বাণী শোনাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কথা হতে পারে না; এর ছন্দ ও গাম্ভীর্য আরবের শ্রেষ্ঠ কবিদের চেয়েও উন্নত। সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে, ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা নিজেও কুরআন শুনে মুগ্ধ হয়েছিল। কিন্তু অহংকার তাকে সত্য মানতে দেয়নি; উল্টো সে-ই নেতাদের পরামর্শ দিল, তাঁকে জাদুকর বলে প্রচার করো। কুরআন তার এই চিন্তা-প্রক্রিয়ার এক নিখুঁত চিত্র এঁকেছে: সে চিন্তা করল ও সিদ্ধান্ত নিল, তারপর ভ্রূকুঞ্চিত করল, মুখ বিকৃত করল, অহংকারে পিছু ফিরল এবং বলল, এ তো পরম্পরায় প্রাপ্ত জাদু ছাড়া কিছু নয় (৭৪:১৮–২৪)।

পাশাপাশি তারা প্রচার শুরু করল, তিনি “মজনুন”, অর্থাৎ মস্তিষ্কবিকৃত—নাউজুবিল্লাহ। কুরআন তাদের এই অপবাদের কথা উল্লেখ করেছে: তারা বলে, হে সেই ব্যক্তি, যার প্রতি উপদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো নিশ্চয়ই পাগল (১৫:৬)। তারা মক্কার অলিগলিতে, হাটে-বাজারে বলে বেড়াত, নিশ্চয়ই তাকে কোনো জিনে আছর করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখনই কাবার চত্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, কাফেররা বক্রদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাত। তাদের চোখের চাহনি এতটাই হিংসাত্মক ও ঘৃণাভরা ছিল, যেন তারা দৃষ্টি দিয়েই তাঁকে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে।

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা: সম্পদের অহংকারী

এই বিদ্বেষের অন্যতম নেতা ছিল ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, মক্কার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন। তার ছিল অনেক পুত্রসন্তান, অঢেল সম্পদ, আর তায়েফে বিশাল ফলের বাগান। কুরআন তার সম্পর্কে বলেছে, আমি তাকে দিয়েছি বিপুল সম্পদ, আর দিয়েছি সঙ্গে থাকা পুত্রসন্তান (৭৪:১২–১৩)।

সে অহংকার করে বলত, আমি যদি ভুল পথে থাকতাম, তাহলে আল্লাহ আমাকে এত সম্পদ দিতেন কেন? মুহাম্মদ তো এতিম, নিঃস্ব। কুরআনে কাফেরদের এই আপত্তির কথা এসেছে: এই কুরআন কেন দুই শহরের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর অবতীর্ণ হলো না? (৪৩:৩১)। অনেক মুফাসসিরের মতে, এখানে মক্কা ও তায়েফের দুই ধনী নেতার কথা বোঝানো হয়েছে, যাদের একজন ওয়ালিদ। আল্লাহ জবাব দিয়েছেন, তারা কি তোমার রবের রহমত বণ্টন করবে? (৪৩:৩২)। নবুয়ত সম্পদের ভিত্তিতে নয়, আল্লাহর মনোনয়নে দেওয়া হয়।

এবার চিন্তা করুন প্রিয় নবীজির মানসিক অবস্থার কথা। যিনি ছিলেন “আল-আমিন”, যিনি মানুষের কল্যাণে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিচ্ছিলেন, তাঁকেই শুনতে হচ্ছে তিনি নাকি পাগল। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মানুষ ফিসফিস করে, হাসাহাসি করে। তিনি কষ্ট পান, কিন্তু মুখে কটু কথা বলেন না। এই মানসিক যন্ত্রণা আর একাকীত্ব যখন চরমে, ঠিক তখনই জিবরিল (আ.) নিয়ে এলেন আসমানি সান্ত্বনা: সূরা আল-কলম, যা মক্কি যুগের প্রথম দিকে অবতীর্ণ সূরাগুলোর অন্যতম।

নূন ও কলমের শপথ: “আপনি পাগল নন”

আল্লাহ সূরাটি শুরু করলেন একটি রহস্যময় হরফ দিয়ে, তারপর শপথ নিলেন সেই আদি সৃষ্টির:

ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ ۝ مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ

অর্থ: “নূন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তার। আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।” (সূরা আল-কলম, ৬৮:১–২)

“নূন” হরফটি কুরআনের “হুরুফে মুকাত্তাআত” বা বিচ্ছিন্ন বর্ণগুলোর একটি, যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। কলমের শপথের মধ্যে রয়েছে গভীর তাৎপর্য। যে জাতিকে তাদের মধ্যকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটিকে পাগল বলছে, আল্লাহ তাদের সামনে শপথ করছেন সেই কলমের, যা জ্ঞান, সভ্যতা ও ইতিহাসের প্রতীক, এবং যা সৃষ্টির সূচনা থেকে সত্য লিপিবদ্ধ করে আসছে।

দৃশ্যটি একবার কল্পনা করুন। মক্কার সব নেতা, সমাজপতিরা যখন নবীজিকে পাগল বলে উপহাস করছে, তখন স্বয়ং মহাবিশ্বের রব ঘোষণা দিচ্ছেন: আপনি পাগল নন। এর চেয়ে বড় সনদ, এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী হতে পারে? মানুষের কথার কী মূল্য, যখন আল্লাহ নিজে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেন? আল্লাহ আরও আশ্বাস দিলেন, নিশ্চয়ই আপনার জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিদান (৬৮:৩)।

খুলুকিন আজিম: চরিত্রের আসমানি সনদ

এরপর আল্লাহ নবীজির চরিত্রের সর্বোচ্চ সনদ দিলেন:

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

অর্থ: “আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” (সূরা আল-কলম, ৬৮:৪)

অর্থাৎ কাফেররা যতই গালি দিক, তাঁর আচরণ, ধৈর্য, সত্যবাদিতা ও ক্ষমাশীলতাই প্রমাণ করে, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। কোনো পাগল বা জাদুকরের চরিত্র এত নিষ্কলুষ হতে পারে না। পরবর্তীকালে এক সাহাবি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তুমি কি কুরআন পড়ো না? তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন (সহিহ মুসলিম, ৭৪৬)। অর্থাৎ কুরআনের প্রতিটি নৈতিক শিক্ষা তাঁর জীবনে জীবন্ত রূপ পেয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও বলেছেন, আমাকে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য পাঠানো হয়েছে। তাঁর চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তায়েফের ঘটনা। তায়েফবাসী যখন তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করল, তখন পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে বললেন, আপনি চাইলে আমি দুই পাহাড় তাদের ওপর চাপিয়ে দেব। তিনি বললেন, না, আমি আশা করি আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে (সহিহ বুখারি, ৩২৩১)। প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও যিনি দোয়া করেন, তিনিই “খুলুকিন আজিম”-এর অধিকারী।

অহংকারী নেতার মুখোশ উন্মোচন

এরপর আল্লাহ মক্কার সেই সর্দারদের, বিশেষ করে এক প্রভাবশালী নেতার মুখোশ খুলে দিলেন। তাদের বাহ্যিক আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নোংরা চরিত্র এক এক করে উন্মোচন করলেন। আল্লাহ নবীজিকে বললেন, আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবেন না; তারা চায় আপনি নমনীয় হলে তারাও নমনীয় হবে (৬৮:৮–৯)। এরপর বললেন, আপনি তার কথা শুনবেন না, যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত; যে পেছনে নিন্দা করে, একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়; যে ভালো কাজে বাধা দেয়, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ; যে রূঢ় স্বভাবের, তার ওপর আবার “জানিম” (৬৮:১০–১৩)।

“জানিম” শব্দের অর্থ নিয়ে মুফাসসিরদের একাধিক মত রয়েছে: কেউ বলেছেন কুখ্যাত, যাকে তার মন্দ স্বভাবের জন্য সবাই চেনে; কেউ বলেছেন, যার বংশপরিচয় সন্দেহজনক। কিছু তাফসিরি বর্ণনায় এসেছে, আয়াতটি ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা সম্পর্কে নাজিল হয়েছিল এবং এরপর সে তার মায়ের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। তবে এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা আছে, এবং কোনো কোনো মুফাসসির আয়াতটিকে আখনাস ইবনে শারিক বা অন্য নেতার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

পরের আয়াতেই আল্লাহ এই চরিত্রের মূল কারণ উন্মোচন করেছেন: কারণ সে সম্পদ ও সন্তানের অধিকারী; যখন তার কাছে আমার আয়াত পাঠ করা হয়, সে বলে, এ তো পূর্ববর্তীদের উপকথা (৬৮:১৪–১৫)। অর্থাৎ সম্পদ ও সন্তানের অহংকারই তাকে সত্য থেকে অন্ধ করে দিয়েছিল। আর এই প্রসঙ্গেই আল্লাহ শোনালেন বাগানওয়ালাদের কাহিনি।

আসহাবুল জান্নাহ: এক দানশীল পিতার বাগান

মক্কার কাফেরদের, বিশেষ করে সম্পদ নিয়ে অহংকারী নেতাদের সতর্ক করার জন্য আল্লাহ পূর্ববর্তী যুগের একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন: আমি তাদের পরীক্ষা করেছি, যেমন পরীক্ষা করেছিলাম বাগানের মালিকদের (৬৮:১৭)। এটি “আসহাবুল জান্নাহ” বা বাগানওয়ালাদের কাহিনি, যা মক্কার মানুষের কাছেও কিছুটা পরিচিত ছিল বলে মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কাসিরসহ মুফাসসিরগণ তাবেয়ি সাইদ ইবনে জুবাইর (রহ.) প্রমুখের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ইয়েমেনের সানা শহরের অদূরে “জারওয়ান” নামক এলাকায় এক নেককার বৃদ্ধ বাস করতেন। আল্লাহ তাঁকে দিয়েছিলেন বিশাল এক ফলের বাগান, আঙুর, খেজুর ও নানা শস্যে ভরা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও আল্লাহভীরু। ফসল তোলার সময় তিনি ঘোষণা দিতেন, আর গরিব-মিসকিনরা দল বেঁধে আসত। নিজের ও পরিবারের সারা বছরের প্রয়োজন রেখে বাকিটা তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। ফলে আল্লাহ তাঁর সম্পদে বরকত দিতেন, আর মিসকিনরা জানত, এই বাগানের ফসল উঠলে তাদের আর না খেয়ে থাকতে হবে না।

পুত্রদের গোপন ষড়যন্ত্র

একদিন সেই নেককার বৃদ্ধ ইন্তেকাল করলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বাগানের মালিকানা পেল তাঁর ছেলেরা, যারা ছিল বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। বাবার মৃত্যুর পর তারা গোপন বৈঠকে বসল। কেউ বলল, আমাদের বাবা তো সব সম্পদ গরিবদের দিয়ে দিতেন; এভাবে দিলে আমাদের সম্পদ কমে যাবে। আমাদের পরিবার বড়, খরচ বেশি, ভবিষ্যৎ আছে।

শয়তান তাদের কানে কুমন্ত্রণা দিল, অন্তরে জ্বলে উঠল লোভের আগুন। কুরআন বলে, তারা শপথ করল, ভোরবেলায় অবশ্যই বাগানের সব ফল তুলে নেবে, আর তারা “ইনশাআল্লাহ” বলল না (৬৮:১৭–১৮)। এই শপথে দুটি অপরাধ একসঙ্গে ছিল: মিসকিনদের হক থেকে বঞ্চিত করার সংকল্প, আর আল্লাহর ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের পরিকল্পনার ওপর পূর্ণ আস্থা। তারা ভেবেছিল, এ বছরই তারা সব ফসল নিজেরা ভোগ করবে, বিক্রি করে অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী হবে।

রাতের অন্ধকারে আল্লাহর ফয়সালা

সে রাতে তারা যখন আরামের ঘুমে বিভোর, ভোরের স্বপ্নে মগ্ন, তখন আল্লাহর ফয়সালা নিঃশব্দে নেমে এল। কুরআন বলে, অতঃপর আপনার রবের পক্ষ থেকে এক বিপর্যয় সেই বাগানে হানা দিল, যখন তারা ঘুমিয়ে ছিল; ফলে তা হয়ে গেল ফসল কেটে নেওয়া ন্যাড়া ভূমির মতো, কিংবা কালো রাতের মতো (৬৮:১৯–২০)।

অনেক মুফাসসিরের বর্ণনায় এসেছে, আকাশ থেকে আগুন বা আগুনের মতো এক ঝড় বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। যে বাগান ছিল সবুজ-শ্যামল, রসে টলটলে ফলে পরিপূর্ণ, মুহূর্তেই তা পুড়ে কালো কয়লায় পরিণত হলো। প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাতা ভস্ম হয়ে মাটিতে মিশে গেল, যেন সেখানে অমাবস্যার নিকষ কালো রাত স্থায়ী হয়ে গেছে। কিন্তু অহংকারী ভাইয়েরা তখনও কিছুই জানতে পারেনি।

ভোরের ফিসফিসানি

পরের দিন খুব ভোরে তারা ঘুম থেকে উঠে একে অপরকে ডাকল, ফসল তুলতে চাইলে সকাল সকাল বাগানে চলো (৬৮:২১–২২)। কুরআন তাদের সেই যাত্রার এক জীবন্ত চিত্র এঁকেছে: তারা চলল নিচু স্বরে কথা বলতে বলতে, আজ যেন কোনো মিসকিন তোমাদের কাছে বাগানে ঢুকতে না পারে; আর তারা ভোরে রওনা হলো, নিজেদের সামর্থ্যের ওপর পূর্ণ আস্থা নিয়ে (৬৮:২৩–২৫)।

কল্পনা করুন সেই দৃশ্য। কয়েকজন ভাই অন্ধকারে চুপিসারে পা টিপে টিপে চলছে, কারণ ভয় পাচ্ছে, যদি কোনো গরিব জেগে যায়! তাদের মনে তখন খুশির জোয়ার; আজ তারা সব সম্পদের একক মালিক হবে। অথচ তারা জানে না, যে সম্পদ রক্ষার জন্য তারা এত গোপনীয়তা অবলম্বন করছে, তা আগেই ছাই হয়ে গেছে।

ছাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে

বাগানের সীমানায় পৌঁছে তারা থমকে দাঁড়াল। পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। কোথায় সেই সবুজ বাগান? কোথায় সেই ঝুলন্ত আঙুরের থোকা? সামনে শুধু পোড়া মাটি আর ছাই, বাতাসে উড়ছে কালো ভস্ম। প্রথমে তারা ভাবল, হয়তো অন্ধকারে পথ ভুল করেছে। কুরআন বলে, যখন তারা বাগান দেখল, বলল, আমরা তো পথ হারিয়েছি (৬৮:২৬)।

কিন্তু আশপাশের পাহাড় আর চেনা চিহ্নগুলো দেখে তাদের ভুল ভাঙল। এটাই তাদের সেই শখের বাগান। তখন তারা বলে উঠল, না, বরং আমরা তো বঞ্চিত হয়ে গেছি (৬৮:২৭)। মিসকিনদের বঞ্চিত করতে চেয়েছিল যারা, আল্লাহ তাদেরই সবকিছু থেকে বঞ্চিত করলেন। এটিই আল্লাহর ন্যায়বিচার: যে অন্যের হক কেড়ে নিতে চায়, সে নিজের হকও হারায়।

মধ্যপন্থী ভাইয়ের সতর্কবাণী ও তাওবা

তাদের মধ্যে যে ভাইটি তুলনামূলক উত্তম ও মধ্যপন্থী ছিল, কুরআনের ভাষায় “আওসাতুহুম”, সে বলল, আমি কি তোমাদের বলিনি, কেন তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো না? (৬৮:২৮)। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে “তাসবিহ” বলতে ইনশাআল্লাহ বলা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং বাবার দানশীলতার পথ অনুসরণের কথা বোঝানো হয়েছে। সে আগেই সতর্ক করেছিল, কিন্তু কেউ শোনেনি; আর সে-ও শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গিয়েছিল।

এবার তাদের চোখ খুলে গেল। তারা বলল:

قَالُوا سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ

অর্থ: “তারা বলল, আমাদের রব পবিত্র; নিশ্চয়ই আমরা ছিলাম জালিম।” (সূরা আল-কলম, ৬৮:২৯)

এরপর তারা একে অপরকে দোষারোপ করতে লাগল (৬৮:৩০), কিন্তু তখন দোষারোপে আর কোনো লাভ ছিল না। তাদের কৃপণতা, অহংকার আর গরিবের হক নষ্টের মানসিকতাই এক রাতে তাদের সম্পদ ভস্ম করে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা বলল, হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! আমরা ছিলাম সীমালঙ্ঘনকারী। আশা করি, আমাদের রব এর বদলে আমাদের এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন; আমরা আমাদের রবের দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী (৬৮:৩১–৩২)।

কিছু তাফসিরি বর্ণনায় এসেছে, তাদের এই তাওবা ছিল আন্তরিক, এবং আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের এর চেয়েও উত্তম বাগান দান করেছিলেন। এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে আলোচনা থাকলেও কুরআনের আয়াত স্পষ্ট করে, তারা ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দিকে ফিরেছিল। আর যে আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে নত হয়, আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফেরান না।

কাহিনির শেষে আল্লাহ ঘোষণা করলেন, শাস্তি এরূপই হয়; আর আখিরাতের শাস্তি আরও বড়, যদি তারা জানত (৬৮:৩৩)। যেন তিনি মক্কার নেতাদের বলছেন: হে সম্পদ ও সন্তান নিয়ে অহংকারীরা, তোমরা কি মনে করছ এই নিয়ামত চিরস্থায়ী? ইয়েমেনের সেই বাগানওয়ালাদের মতো তোমাদের সম্পদও যেকোনো মুহূর্তে কেড়ে নেওয়া যেতে পারে। সম্পদ সম্মান আনে না; সম্মান আনে আল্লাহর আনুগত্য।

বাগানওয়ালা ও মক্কার নেতাদের পরিণতি

বাগানওয়ালারা ভুল বুঝে তাওবা করেছিল, তাদের অহংকার চূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু মক্কার অনেক অহংকারী নেতা শেষ পর্যন্ত অহংকার ছাড়তে পারেনি। আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালাফসহ অনেক সর্দার সত্য চেনার পরও অহংকারে অটল থেকে বদরের প্রান্তরে লাঞ্ছিত হয়ে নিহত হয়। আর ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা হিজরতের আগেই কুফর অবস্থায় মারা যায়। কুরআনের সতর্কবাণী এভাবেই বাস্তব রূপ নিয়েছিল।

তবে লক্ষণীয়, ওয়ালিদের পুত্র খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করে “সাইফুল্লাহ” বা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত হন। যে সম্পদ ও সন্তান নিয়ে ওয়ালিদ অহংকার করত, তার সেই সন্তানই হয়ে উঠলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি। আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের হিসাবের ঊর্ধ্বে।

ইউনুস (আ.)-এর দৃষ্টান্ত: ধৈর্যের শিক্ষা

সূরার শেষাংশে আল্লাহ নবীজিকে ধৈর্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইউনুস (আ.)-এর দৃষ্টান্ত টেনেছেন: অতএব আপনি আপনার রবের নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধরুন, এবং মাছওয়ালার মতো হবেন না, যখন সে দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থায় ডেকেছিল (৬৮:৪৮)। ইউনুস (আ.) নিজ জাতির অবাধ্যতায় অধৈর্য হয়ে আল্লাহর অনুমতির আগেই তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আর মাছের পেটে বন্দি হয়েছিলেন। পরে আল্লাহর অনুগ্রহ তাঁকে রক্ষা করে এবং তাঁকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে (৬৮:৪৯–৫০)।

এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আল্লাহ শিক্ষা দিলেন, দ্বীনের পথে কিংবা জীবনের যেকোনো পরীক্ষায় তাড়াহুড়া করা যাবে না। মানুষের উপহাস, অপবাদ ও বিরোধিতার মধ্যেও রবের ফয়সালার জন্য ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে হবে। বিপদ আসবে, কিন্তু ধৈর্যের ফল সবসময় মিষ্টি।

বদনজর: কুরআন ও হাদিসের আলোকে

সূরার একেবারে শেষে আল্লাহ বলেছেন:

وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ

অর্থ: “আর কাফেররা যখন উপদেশবাণী শোনে, তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে আপনাকে আছড়ে ফেলবে, আর তারা বলে, সে তো নিশ্চয়ই পাগল।” (সূরা আল-কলম, ৬৮:৫১)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের দুটি মত রয়েছে। একটি মত হলো, এখানে কাফেরদের তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টির কথা বোঝানো হয়েছে, যেন চোখের চাহনি দিয়েই তারা তাঁকে উৎখাত করতে চায়। অন্য মত, যা ইবনে কাসিরসহ বহু মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, হলো এখানে বদনজরের দিকেও ইঙ্গিত রয়েছে; অর্থাৎ তারা হিংসাভরা দৃষ্টি দিয়ে তাঁর ক্ষতি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন। অনেক আলেম এই আয়াতকে বদনজরের সত্যতার কুরআনিক প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বদনজরের সত্যতা সহিহ হাদিস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বদনজর সত্য (সহিহ বুখারি, ৫৭৪০)। আরও বলেছেন, যদি কোনো কিছু তাকদিরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে তা হতো বদনজর (সহিহ মুসলিম, ২১৮৮)। তিনি বদনজরের জন্য রুকইয়া বা কুরআন-দোয়ার মাধ্যমে চিকিৎসার নির্দেশও দিয়েছেন (সহিহ বুখারি, ৫৭৩৮)।

তবে এখানে একটি ভারসাম্য জরুরি। বদনজর সত্য, কিন্তু তা আল্লাহর অনুমতির বাইরে কিছু করতে পারে না। জীবনের প্রতিটি সমস্যাকে বদনজরের ফল ভেবে ভয় ও সন্দেহে জীবন কাটানোও ইসলামের শিক্ষা নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া, আর পাশাপাশি দোয়া ও রুকইয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া—এটিই সুন্নাহর পথ।

বদনজর থেকে বাঁচার সুন্নাহসম্মত উপায়

কারও কোনো ভালো জিনিস দেখে মুগ্ধ হলে তার জন্য বরকতের দোয়া করা উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এক সাহাবিকে, যার বদনজরে আরেকজন অসুস্থ হয়েছিলেন, তিরস্কার করে বললেন, তোমরা কেন নিজের ভাইকে মারতে চাও? তুমি কেন বরকতের দোয়া করলে না? (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৫০৯)। কুরআনও শিখিয়েছে, নিজের বাগান বা সম্পদ দেখে বলো, “মাশাআল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”—আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই (১৮:৩৯)।

লক্ষণীয়, এই আয়াতটিও এসেছে আরেক বাগানওয়ালার কাহিনিতে, সূরা আল-কাহফে, যে নিজের বাগান নিয়ে অহংকার করেছিল এবং সেটিও ধ্বংস হয়েছিল। দুই সূরার দুই বাগানের কাহিনি একই শিক্ষা দেয়: সম্পদ আল্লাহর দান, আর তার প্রতি অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতাই কাম্য।

এ ছাড়া নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার জিকির, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ বদনজরসহ সব অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার মাধ্যম। আজকের সামাজিক মাধ্যমের যুগে নিজের রূপ, সম্পদ, সন্তান বা সাফল্যের অতিরিক্ত প্রদর্শনেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ এতে হিংসা ও বদনজরের সুযোগ তৈরি হয়।

সূরা আল-কলমের শিক্ষা

প্রথম শিক্ষা: সম্পদ আল্লাহর আমানত। আমাদের সম্পদ, ক্ষমতা, মেধা কিংবা সৌন্দর্য—সবই আল্লাহর দান; এগুলো আমাদের একক অর্জন নয়, বরং পরীক্ষা। যদি আমরা এগুলো দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করি এবং গরিবের হক না দিই, তাহলে আসহাবুল জান্নাহর মতো আমাদের সব অর্জন এক নিমিষে ধূলিসাৎ হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দান সম্পদ কমায় না (সহিহ মুসলিম, ২৫৮৮)। কৃপণতা সম্পদ বাড়ায় না, বরং ধ্বংস ডেকে আনে।

দ্বিতীয় শিক্ষা: পরিকল্পনায় আল্লাহর ইচ্ছা। বাগানওয়ালারা “ইনশাআল্লাহ” বলেনি; নিজেদের পরিকল্পনার ওপর এতটাই নিশ্চিত ছিল যে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। আমাদের প্রতিটি পরিকল্পনা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। কুরআন শিখিয়েছে, কোনো কাজের ব্যাপারে বলো না যে আমি আগামীকাল এটি করব, আল্লাহর ইচ্ছা যুক্ত না করে (১৮:২৩–২৪)।

তৃতীয় শিক্ষা: মহান চরিত্রের অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পাগল বলা হয়েছে, জাদুকর বলা হয়েছে, পাথর মারা হয়েছে, তবু তিনি গালি দেননি, বরং দোয়া করেছেন। আজ আমরা অনেকেই সামান্য সমালোচনা সহ্য করতে পারি না; কেউ একটু কটু কথা বললেই রেগে যাই। অথচ “খুলুকিন আজিম”-এর অনুসারী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব মানুষের কথায় বিচলিত না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকা।

চতুর্থ শিক্ষা: ভুল স্বীকার ও তাওবা। বাগানওয়ালাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল একে অপরকে দোষারোপ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বলেছিল, “আমরা জালিম ছিলাম।” দোষারোপ নয়, ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দিকে ফেরাই মুক্তির পথ।

পঞ্চম শিক্ষা: ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল। ইউনুস (আ.)-এর দৃষ্টান্ত শেখায়, পরীক্ষার মুহূর্তে অধৈর্য হওয়া যাবে না; রবের ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা: হিংসা ও বদনজর থেকে সতর্কতা। অন্যের নিয়ামত দেখে হিংসা না করে বরকতের দোয়া করা, আর নিজের নিয়ামতের জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া।

উপসংহার

সূরা আল-কলম আমাদের সামনে দুটি বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। একদিকে কলম, যা সৃষ্টির সূচনা থেকে সত্য লিপিবদ্ধ করে আসছে, আর একজন মহান মানুষ, যাঁর চরিত্রকে স্বয়ং আল্লাহ “খুলুকিন আজিম” বলে সনদ দিয়েছেন। অন্যদিকে সম্পদ ও সন্তানের অহংকারে অন্ধ মানুষ, আর কিছু কৃপণ ভাই, যারা গরিবদের বঞ্চিত করতে গিয়ে নিজেরাই সর্বস্বান্ত হয়েছিল।

আসুন, আমরা আমাদের কলমকে, জ্ঞানকে ও সম্পদকে সত্য ও কল্যাণের পথে ব্যবহার করি। আমরা যেন সেই বাগানওয়ালাদের মতো না হই, বরং হই সেই মহান চরিত্রের মানুষটির প্রকৃত অনুসারী। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে কৃপণতা ও অহংকার থেকে মুক্ত রাখুন, বদনজর ও সব অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর “খুলুকিন আজিম”-এর ছায়ায় জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র

১. সূরা আল-কলম, ৬৮:১–৫২ (পূর্ণ সূরা; এই পৃষ্ঠায় তাফসির ইবনে কাসিরও পড়া যায়): https://quran.com/68

২. সূরা আল-কলম, ৬৮:১৭–৩৩ (আসহাবুল জান্নাহর কাহিনি): https://quran.com/68/17-33

৩. সূরা আল-কলম, ৬৮:৪৮–৫১ (ইউনুস আ.-এর দৃষ্টান্ত ও বদনজর): https://quran.com/68/48-51

৪. সূরা আল-মুদ্দাসসির, ৭৪:১১–২৫ (ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার প্রসঙ্গ): https://quran.com/74/11-25

৫. সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩:৩১–৩২ ও সূরা আল-হিজর, ১৫:৬: https://quran.com/43/31-32 এবং https://quran.com/15/6

৬. সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৩–২৪ ও ১৮:৩৯ (ইনশাআল্লাহ ও মাশাআল্লাহ): https://quran.com/18/23-24 এবং https://quran.com/18/39

৭. সূরা আল-আনআম, ৬:৫৯ (আল্লাহর অসীম জ্ঞান): https://quran.com/6/59

৮. সুনানে আবু দাউদ, ৪৭০০ ও জামে তিরমিজি, ২১৫৫ (কলমের সৃষ্টি ও তাকদির লেখা): https://sunnah.com/abudawud:4700 এবং https://sunnah.com/tirmidhi:2155

৯. সহিহ মুসলিম, ২৬৫৩ (আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে তাকদির): https://sunnah.com/muslim:2653

১০. সহিহ মুসলিম, ৭৪৬ (নবীজির চরিত্র ছিল কুরআন): https://sunnah.com/muslim:746a

১১. সহিহ বুখারি, ৩২৩১ (তায়েফের ঘটনা ও নবীজির ক্ষমা) ও ২৪৭৮ (কাবার চারপাশে ৩৬০ মূর্তি): https://sunnah.com/bukhari:3231 এবং https://sunnah.com/bukhari:2478

১২. সহিহ বুখারি, ৫৭৪০ (বদনজর সত্য) ও ৫৭৩৮ (বদনজরে রুকইয়া); সহিহ মুসলিম, ২১৮৮ (তাকদির ও বদনজর): https://sunnah.com/bukhari:5740, https://sunnah.com/bukhari:5738 এবং https://sunnah.com/muslim:2188

১৩. সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৫০৯ (বরকতের দোয়া না করার তিরস্কার) ও সহিহ মুসলিম, ২৫৮৮ (দান সম্পদ কমায় না): https://sunnah.com/ibnmajah:3509 এবং https://sunnah.com/muslim:2588

১৪. তাফসির ইবনে কাসির, সূরা আল-কলম (জারওয়ানের বাগান, ‘জানিম’ শব্দের ব্যাখ্যা ও বদনজর প্রসঙ্গ); ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ (ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার প্রসঙ্গ)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।