শয়তান প্রধানত দুটি কারণে হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে দেখা করতে এসেছিল:
শয়তান কেন হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে দেখা করেছিল? ওয়াজ-মাহফিল, ইসলামি বক্তৃতা ও সামাজিক মাধ্যমে একটি কাহিনি প্রায়ই শোনা যায়: শয়তান একদিন হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে আল্লাহর কাছে নিজের তাওবা কবুলের জন্য সুপারিশ চেয়েছিল, আর বিদায়ের আগে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার তিনটি গোপন কৌশলের কথা জানিয়ে গিয়েছিল।
কাহিনিটি চিত্তাকর্ষক, শিক্ষণীয়ও বটে। কিন্তু একজন সচেতন মুসলিমের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: এটি কি সত্যিই প্রমাণিত? রাসূলুল্লাহ ﷺ কি এটি বর্ণনা করেছেন? নাকি এটি পরবর্তী যুগের উপদেশমূলক গল্প? এই লেখায় আমরা প্রথমে কাহিনিটি তুলে ধরব, তারপর এর সূত্র যাচাই করব, এবং সবশেষে দেখব, এর যে শিক্ষাগুলো কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, সেগুলো আমাদের জীবনে কীভাবে কাজে লাগানো যায়।
শয়তান কে: কুরআনের আলোকে পরিচয়
কাহিনিতে প্রবেশের আগে শয়তানের প্রকৃত পরিচয় জানা প্রয়োজন। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ইবলিস ফেরেশতা ছিল না, বরং জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল (১৮:৫০)। আর জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াহীন অগ্নিশিখা থেকে (৫৫:১৫)। ইবাদতের কারণে সে ফেরেশতাদের মাঝে অবস্থানের মর্যাদা পেয়েছিল, কিন্তু আদম (আ.)-কে সিজদার নির্দেশ অমান্য করে সে চিরতরে অভিশপ্ত হয়।
এরপর সে আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চাইল, আর আল্লাহ তাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিলেন (১৫:৩৬–৩৮)। এই অবকাশ কোনো সম্মান নয়, বরং মানুষের জন্য পরীক্ষার অংশ। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন, আর শয়তানের আহ্বানের বিপরীতে নবীদের মাধ্যমে হেদায়েত পাঠিয়েছেন। কোন পথ বেছে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত মানুষের নিজের। কুরআন বারবার সতর্ক করেছে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো (৩৫:৬)।
প্রচলিত কাহিনিটি কী?
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইবলিস একদিন মুসা (আ.)-এর কাছে এসে বলল, আপনি আল্লাহর এমন নবী, যাঁর সঙ্গে তিনি সরাসরি কথা বলেন। আমার জন্য তাঁর কাছে একটু সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমার তাওবা কবুল করেন।
মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ বললেন, হে মুসা, আমি তার তাওবা কবুল করব, তবে শর্ত হলো সে যেন আদম (আ.)-এর কবরে গিয়ে একটি সিজদা করে। মুসা (আ.) এই সংবাদ শয়তানকে জানালে সে ক্রোধে ফেটে পড়ে বলল, যাকে জীবিত অবস্থায় সিজদা করিনি, তাকে মৃত অবস্থায় কবরে গিয়ে সিজদা করব? কখনোই না!
এরপর শয়তান বলল, আপনি যেহেতু আমার জন্য সুপারিশ করেছেন, তার প্রতিদানে আমি আপনাকে তিনটি বিষয় বলে দিচ্ছি, যা আপনাকে ও আপনার উম্মতকে আমার ফাঁদ থেকে বাঁচাবে। প্রথমত, মানুষ যখন চরম রাগান্বিত হয়, তখন আমি তার খুব কাছে চলে যাই এবং তাকে দিয়ে অন্যায় করিয়ে ছাড়ি। দ্বিতীয়ত, কোনো পুরুষ যখন কোনো পরনারীর সঙ্গে নির্জনে বসে, তখন আমি তৃতীয় হিসেবে উপস্থিত থাকি, যতক্ষণ না তাদের পাপে লিপ্ত করি। তৃতীয়ত, মানুষ যখন দান বা কোনো সৎকাজের সংকল্প করে, আমি দ্রুত এসে তাকে দারিদ্র্যের ভয় দেখাই, যাতে সে বিরত থাকে।
কাহিনিটির সত্যতা: আলেমরা কী বলেন
কাহিনিটি বিভিন্ন উপদেশমূলক গ্রন্থ, ওয়াজ ও তাজকিরার আলোচনায় প্রচলিত, এবং অনেকে এর সূত্র হিসেবে ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)-এর তালবিসে ইবলিসসহ কিছু কিতাবের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কাহিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে কোনো সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে এমন কোনো বর্ণনা নেই, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ ইবলিসকে আদম (আ.)-এর কবরে সিজদা করার শর্ত দিয়েছিলেন। আলেমগণ এ ধরনের বর্ণনাকে ইসরায়েলি রেওয়ায়াত, দুর্বল বর্ণনা কিংবা উপদেশমূলক কাহিনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এখানে একটি মূলনীতি মনে রাখা জরুরি: কোনো কাহিনি কোনো প্রসিদ্ধ আলেমের কিতাবে থাকা মানেই তা সহিহ হাদিস নয়। অনেক আলেম তাঁদের গ্রন্থে উপদেশের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বর্ণনা সংকলন করেছেন, যার সবগুলোর সনদ যাচাই করে সহিহ প্রমাণিত নয়। ইবনুল জাওজি (রহ.) নিজেও জাল হাদিস চিহ্নিত করে “আল-মাওদুআত” নামে আলাদা গ্রন্থ লিখেছেন, যা প্রমাণ করে, মুহাদ্দিসগণ বর্ণনার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে কতটা সতর্ক ছিলেন।
ইসরায়েলি বর্ণনা, অর্থাৎ বনি ইসরাইলের সূত্রে আসা কাহিনিগুলো সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বনি ইসরাইল থেকে বর্ণনা করো, এতে কোনো দোষ নেই (সহিহ বুখারি, ৩৪৬১)। আবার অন্যত্র বলেছেন, আহলে কিতাবদের কথা সত্যও বলো না, মিথ্যাও বলো না; বরং বলো, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি ঈমান এনেছি (সহিহ বুখারি, ৪৪৮৫)।
এই দুই হাদিসের আলোকে আলেমগণ বলেছেন, যে ইসরায়েলি বর্ণনা কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তা উপদেশ হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে, তবে কখনোই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস হিসেবে নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর সতর্ক করেছেন, যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয় (সহিহ বুখারি, ১১০)। তাই এই কাহিনি বলার সময় “হাদিসে এসেছে” না বলে “এমন একটি কাহিনি প্রচলিত আছে” বলা উচিত।
একজন সাধারণ পাঠক কীভাবে বুঝবেন কোন বর্ণনা সহিহ? কয়েকটি সহজ উপায় আছে। প্রথমত, হাদিস হিসেবে কোনো কথা শুনলে তার গ্রন্থের নাম ও নম্বর জিজ্ঞেস করা। দ্বিতীয়ত, sunnah.com-এর মতো নির্ভরযোগ্য অনলাইন ডেটাবেসে তা খুঁজে দেখা, যেখানে প্রতিটি হাদিসের সঙ্গে তার মানও উল্লেখ থাকে। তৃতীয়ত, সন্দেহ হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করা। আর চতুর্থত, “অমুক বুজুর্গ বলেছেন” বা “কিতাবে আছে” ধরনের অস্পষ্ট সূত্রে কোনো কিছু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে প্রচার না করা। এই সতর্কতা শুধু জ্ঞানের বিশুদ্ধতা রক্ষা করে না, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে মিথ্যা বলার কঠিন গুনাহ থেকেও বাঁচায়।
কাহিনির একটি অংশ নিয়ে আকিদাগত প্রশ্নও আছে। কুরআন জানিয়েছে, আল্লাহ ইবলিসকে কিয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন (৩৮:৭৭–৭৮) এবং সে নিজেই মানুষকে পথভ্রষ্ট করার শপথ নিয়েছে (৭:১৬–১৭)। ইবলিস তাওবা চাইতে পারে, আর আল্লাহ শর্তসাপেক্ষে তা কবুলের প্রস্তাব দিচ্ছেন—এমন দাবির পক্ষে কুরআন বা সহিহ হাদিসে কোনো দলিল নেই। তাই এই অংশকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
কাহিনির কেন্দ্রীয় বার্তা: ইবলিসের অহংকার
কাহিনির সনদ দুর্বল হলেও এর কেন্দ্রীয় বার্তাটি কুরআন দ্বারা সুপ্রমাণিত: ইবলিসের পতনের মূল কারণ অহংকার। আল্লাহ যখন ফেরেশতাদের আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সবাই সিজদা করল, কিন্তু ইবলিস অস্বীকার করল। আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, আমি যখন তোমাকে নির্দেশ দিলাম, তখন কিসে তোমাকে সিজদা করতে বাধা দিল? সে বলল:
أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ
অর্থ: “আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” (সূরা আল-আরাফ, ৭:১২)
“আমি তার চেয়ে উত্তম”—এই একটি বাক্যেই অহংকারের পুরো দর্শন নিহিত। ইবলিস আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি, তাঁর ক্ষমতাও অস্বীকার করেনি; কিন্তু আল্লাহর আদেশের বিপরীতে নিজের যুক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি দাঁড় করিয়েছিল। কুরআন জানায়, সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত, এবং তার রবের আদেশ অমান্য করেছিল (১৮:৫০)।
অহংকারের এই রোগ শুধু ইবলিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মধ্যেও তা নানা রূপে প্রকাশ পায়। বংশ, সম্পদ, শিক্ষা, পদমর্যাদা, সৌন্দর্য, এমনকি ধর্মীয় জ্ঞান বা ইবাদতের পরিমাণ নিয়েও মানুষ অহংকারে লিপ্ত হতে পারে। আধুনিক যুগে সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে প্রদর্শনের প্রবণতা, অন্যের মতামতকে তাচ্ছিল্য করা, ভুল ধরিয়ে দিলে তা মেনে না নেওয়া—এসবও অহংকারের সূক্ষ্ম রূপ। ইবলিসের মতো “আমি তার চেয়ে উত্তম” মনোভাব যখনই অন্তরে জাগে, তখনই বুঝতে হবে, শয়তানের সবচেয়ে পুরোনো অস্ত্রটি আমাদের দিকে তাক করা হয়েছে।
কাহিনির “জীবিত অবস্থায় সিজদা করিনি, মৃতকে করব?” বক্তব্যটি সেই অহংকারেরই প্রতীকী প্রকাশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ অহংকারের সংজ্ঞা দিয়েছেন: অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা। তিনি আরও বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না (সহিহ মুসলিম, ৯১)।
লক্ষণীয়, ইবলিসের ইবাদতের ইতিহাস দীর্ঘ ছিল বলে বর্ণিত আছে, তবু একটি অহংকারী মুহূর্ত তার সব অর্জন ধ্বংস করে দিয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের পরিমাণ নয়, বরং আল্লাহর আদেশের সামনে বিনয়ী আত্মসমর্পণই প্রকৃত দাসত্বের পরিচয়। জ্ঞান ও ইবাদত যদি বিনয় না বাড়িয়ে অহংকার বাড়ায়, তবে তা কল্যাণের বদলে ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
আদম ও ইবলিস: দুই ভুল, দুই পরিণতি
কুরআন দুটি ভুলের ঘটনা পাশাপাশি তুলে ধরেছে, যা আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা। ইবলিস আল্লাহর আদেশ অমান্য করল, আর আদম (আ.)-ও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়ে ভুল করলেন। কিন্তু দুজনের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইবলিস ভুলের পর যুক্তি দেখাল, অহংকার করল এবং আল্লাহকেই দায়ী করে বলল, আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন (৭:১৬)। আর আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে এলেন:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” (সূরা আল-আরাফ, ৭:২৩)
আল্লাহ আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল করলেন (২:৩৭)। এখানেই মানুষ ও শয়তানের পথের পার্থক্য। ভুল সবাই করে; কিন্তু যে ভুল স্বীকার করে বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফেরে, সে আদমের সন্তান; আর যে ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢাকে, অহংকারে অটল থাকে, সে শয়তানের পথের অনুসারী। কাহিনিটি সত্য হোক বা না হোক, এর মর্মবাণী এই চিরন্তন শিক্ষাই মনে করিয়ে দেয়: তাওবার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অহংকার।
মানুষের জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা সবসময় খোলা। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, হে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, তোমার যত গুনাহই হোক, আমি পরোয়া করি না (জামে তিরমিজি, ৩৫৪০)।
কুরআনে মুসা (আ.)-এর জীবনে শয়তানের প্রসঙ্গ
মজার বিষয় হলো, শয়তান ও মুসা (আ.)-এর সাক্ষাতের প্রচলিত কাহিনিটি সহিহ না হলেও কুরআন নিজেই মুসা (আ.)-এর জীবনের একটি ঘটনায় শয়তানের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে, আর সেটিও রাগের সঙ্গে সম্পর্কিত। নবুয়ত লাভের আগে মুসা (আ.) মিসরে দেখলেন, তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তির সঙ্গে ফিরআউনের গোত্রের এক ব্যক্তি লড়াই করছে। সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে তিনি ওই ব্যক্তিকে ঘুষি মারলেন, আর সে মারা গেল। তখন মুসা (আ.) বললেন, এটি শয়তানের কাজ; নিশ্চয়ই সে প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী (সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৫)।
এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে এসে বললেন, হে আমার রব, আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন; আর আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন (২৮:১৬)। এই কুরআনিক ঘটনা কাহিনির শিক্ষাকে আরও দৃঢ় করে: উত্তেজনার মুহূর্তে শয়তান মানুষকে এমন কাজে প্ররোচিত করতে পারে, যা সে কখনো ইচ্ছা করেনি। আর এর প্রতিকার হলো বিলম্ব না করে আল্লাহর কাছে তাওবা।
প্রথম ফাঁদ: তীব্র রাগ
কাহিনির প্রথম সতর্কবার্তা রাগ সম্পর্কে। এর নির্দিষ্ট ভাষা সহিহ সূত্রে প্রমাণিত না হলেও এর মর্ম সহিহ হাদিস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বললেন:
لَا تَغْضَبْ
অর্থ: “রাগ করো না।” লোকটি বারবার উপদেশ চাইল, আর প্রতিবারই তিনি একই কথা বললেন: “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি, ৬১১৬)
রাগের মুহূর্তে শয়তানের প্রভাব সম্পর্কেও সহিহ হাদিসে স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। একবার দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে ঝগড়া করছিল, একজনের চেহারা রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, আমি এমন একটি বাক্য জানি, সে যদি তা বলে, তার রাগ চলে যাবে: “আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” (সহিহ বুখারি, ৩২৮২)। অর্থাৎ রাগ ও শয়তানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন, শয়তান মানুষের দেহে রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে (সহিহ বুখারি, ২০৩৫)। কাহিনিতে শয়তানের “রক্তে ফুঁক দেওয়া”র যে কথা এসেছে, তার কাছাকাছি অর্থ এই সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।
প্রকৃত শক্তির সংজ্ঞাও রাসূলুল্লাহ ﷺ বদলে দিয়েছেন: কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা শক্তিশালী নয়; প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (সহিহ বুখারি, ৬১১৪)। কুরআন মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছে, তারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে, আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন (৩:১৩৪)।
রাগের সময় করণীয় সম্পর্কেও সুন্নাহ বাস্তব দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আউজুবিল্লাহ পড়া, চুপ থাকা, আর দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া, তাতেও রাগ না কমলে শুয়ে পড়া (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮২)। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও স্বীকার করে, রাগের মুহূর্তে শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন ও কিছু সময় বিরতি নেওয়া আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া। কত সংসার ভেঙেছে, কত সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, কত জীবন ধ্বংস হয়েছে শুধু কয়েক মুহূর্তের অনিয়ন্ত্রিত রাগে।
আজকের যুগে রাগ প্রকাশের নতুন একটি ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে: সামাজিক মাধ্যম। মুহূর্তের উত্তেজনায় লেখা একটি মন্তব্য, একটি পোস্ট বা একটি বার্তা অনেক সময় স্থায়ী ক্ষতি করে বসে। মুখের কথা হয়তো ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু লেখা থেকে যায়, ছড়িয়ে পড়ে। তাই রাগের মুহূর্তে শুধু কথা বলা নয়, লেখা ও প্রতিক্রিয়া জানানো থেকেও বিরত থাকা উচিত। পরিবারে রাগের প্রভাব আরও গভীর; বাবা-মায়ের অনিয়ন্ত্রিত রাগ সন্তানের মনে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে, আর দাম্পত্য জীবনে রাগের মাথায় বলা একটি শব্দ পুরো সংসার ভেঙে দিতে পারে।
দ্বিতীয় ফাঁদ: পরনারীর সঙ্গে নির্জনতা
কাহিনির দ্বিতীয় সতর্কবার্তাটি সরাসরি সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত। উমর (রা.) এক ভাষণে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী উল্লেখ করেছেন: কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান (জামে তিরমিজি, ২১৬৫)। সহিহ বুখারিতেও এসেছে, কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে মাহরাম ছাড়া একাকী না থাকে (সহিহ বুখারি, ৫২৩৩)।
ইসলাম পাপের দরজা বন্ধ করার নীতি অনুসরণ করে। কুরআন শুধু ব্যভিচার নিষেধ করেনি, বলেছে, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ (১৭:৩২)। আরও সতর্ক করেছে, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না (২৪:২১)। “পদাঙ্ক” শব্দটি ইঙ্গিত দেয়, শয়তান মানুষকে একবারে বড় পাপে নিয়ে যায় না; ধাপে ধাপে নিয়ে যায়। প্রথমে দৃষ্টি, তারপর কথা, তারপর নির্জনতা, তারপর পাপ।
নির্জনতার আগের ধাপ হলো দৃষ্টি। তাই কুরআন প্রথমে দৃষ্টি সংযমের নির্দেশ দিয়েছে: মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র (২৪:৩০)। একই নির্দেশ মুমিন নারীদের জন্যও দেওয়া হয়েছে (২৪:৩১)। লক্ষণীয়, কুরআন নির্দেশটি দুই পক্ষকেই দিয়েছে; অর্থাৎ পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের। দৃষ্টি সংযত থাকলে নির্জনতার আকর্ষণও দুর্বল হয়ে যায়, আর শয়তান তার প্রথম সিঁড়িতেই বাধা পায়।
আধুনিক যুগে এই নির্জনতার রূপ বদলেছে। এখন শুধু শারীরিক নির্জনতা নয়, ভার্চুয়াল নির্জনতাও একই ঝুঁকি তৈরি করে: গোপন চ্যাট, রাতভর মেসেজ আদান-প্রদান, ভিডিও কলে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা। দুজন মানুষ শারীরিকভাবে দূরে থেকেও এমন একান্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে শয়তান তৃতীয় হয়ে যায়। তাই কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা অনলাইনে নারী-পুরুষের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ যেন পেশাদার সীমার মধ্যে থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা মেনে চলার কিছু সহজ উপায় আছে। অফিসে বা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বৈঠক যতটা সম্ভব খোলা জায়গায় বা অন্যদের উপস্থিতিতে করা, কাজের যোগাযোগ কাজের সময় ও কাজের বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখা, ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে গায়রে মাহরামের সঙ্গে একান্ত আলাপ এড়িয়ে চলা, আর অনলাইনে এমন কথোপকথন থেকে বিরত থাকা, যা নিজের জীবনসঙ্গী বা পরিবারের সামনে প্রকাশ করতে সংকোচ হয়। একটি সহজ মাপকাঠি হলো: যে আলাপ লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছা হয়, সেখানেই শয়তানের উপস্থিতির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
এ বিধান কাউকে সন্দেহ করার জন্য নয়, বরং নিজেকে ও অন্যকে রক্ষার জন্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে একবার রাতে স্ত্রী সাফিয়া (রা.)-কে এগিয়ে দেওয়ার সময় দুজন সাহাবিকে দেখে নিজেই পরিচয় স্পষ্ট করেছিলেন, যাতে শয়তান তাদের মনে কোনো সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে না পারে (সহিহ বুখারি, ২০৩৫)। সন্দেহের পরিস্থিতি এড়ানোও যে ঈমানের দাবি, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।
তৃতীয় ফাঁদ: দানে দারিদ্র্যের ভয়
কাহিনির তৃতীয় সতর্কবার্তাটি সরাসরি কুরআনের একটি আয়াতের প্রতিধ্বনি:
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ ۖ وَاللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ: “শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়; আর আল্লাহ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেন তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৬৮)
এই আয়াতে দুটি বিপরীত প্রতিশ্রুতি পাশাপাশি রাখা হয়েছে। শয়তানের প্রতিশ্রুতি দারিদ্র্য, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ক্ষমা ও অনুগ্রহ। দান করার মুহূর্তে মনে যে দ্বিধা আসে—“পরে যদি নিজের প্রয়োজন হয়?”, “এত টাকা দিলে কী থাকবে?”—তা অনেক সময় শয়তানেরই কুমন্ত্রণা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ভয়ের সরাসরি জবাব দিয়েছেন: দান সম্পদ কমায় না (সহিহ মুসলিম, ২৫৮৮)। তিনি আরও বলেছেন, প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন; একজন বলেন, হে আল্লাহ, দানকারীকে তার বিনিময় দিন; অন্যজন বলেন, হে আল্লাহ, কৃপণের সম্পদ ধ্বংস করে দিন (সহিহ বুখারি, ১৪৪২)। কুরআনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা (৩৪:৩৯)।
কুরআন দানের প্রতিদান বোঝাতে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত দিয়েছে: যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি শস্যদানার মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়, আর প্রতিটি শিষে থাকে একশো দানা; আল্লাহ যাকে চান, আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন (২:২৬১)। শয়তান দেখায় একটি দানা হারানোর ক্ষতি, আর আল্লাহ দেখান সাতশো দানার লাভ। দানের মুহূর্তে কার প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করব, এটিই ঈমানের পরীক্ষা।
বিপরীতে কৃপণতাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ ধ্বংসের কারণ বলেছেন: তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো, কারণ কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে; এটি তাদের রক্তপাত ঘটাতে এবং হারামকে হালাল করতে প্ররোচিত করেছিল (সহিহ মুসলিম, ২৫৭৮)। শয়তানের দারিদ্র্যের ভয় মানুষকে প্রথমে কৃপণ করে, তারপর কৃপণতা তাকে সম্পদের লোভে অন্যায়ের পথে ঠেলে দেয়। দানশীলতা তাই শুধু অন্যের উপকার নয়, নিজের আত্মাকে লোভ ও শয়তানের ফাঁদ থেকে মুক্ত রাখারও উপায়।
শয়তানের এই ফাঁদ শুধু অর্থ দানের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো সৎকাজের সংকল্পেও কাজ করে। নামাজের সময় এলে “একটু পরে পড়ব”, কুরআন পড়ার সংকল্প করলে “আজ অনেক ক্লান্ত”, কাউকে সাহায্য করার ইচ্ছা হলে “অন্য কেউ তো করবে”—এভাবে বিলম্ব ও অজুহাতের মাধ্যমে শয়তান সৎকাজের পথ আটকে দেয়। তাই আলেমগণ বলেছেন, সৎকাজের ইচ্ছা জাগলে দেরি না করে দ্রুত তা সম্পন্ন করা উচিত।
কুরআনে শয়তানের কৌশল
কাহিনিতে তিনটি ফাঁদের কথা এলেও কুরআন শয়তানের কৌশল সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা দিয়েছে। ইবলিস নিজেই আল্লাহর সামনে শপথ করেছিল, আমি অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব, তারপর তাদের কাছে আসব সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে ও বাম দিক থেকে, আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না (৭:১৬–১৭)।
কুরআনে শয়তানের প্রধান কৌশলগুলো এভাবে চিহ্নিত হয়েছে। সে মন্দ কাজকে সুন্দর করে দেখায় (১৫:৩৯)। সে মানুষের অন্তরে গোপনে কুমন্ত্রণা দেয়, তারপর সরে পড়ে (১১৪:৪–৫)। সে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও আশা দেয় (৪:১২০)। সে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় (৫:৯১)। আর সে ধাপে ধাপে মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায় (২৪:২১)।
কুরআন এক মর্মান্তিক দৃশ্যও তুলে ধরেছে: কিয়ামতের দিন শয়তান তার অনুসারীদের উদ্দেশে বলবে, আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না, শুধু ডেকেছিলাম, আর তোমরা সাড়া দিয়েছিলে; সুতরাং আমাকে দোষারোপ করো না, নিজেদেরই দোষারোপ করো (১৪:২২)। এই আয়াত স্পষ্ট করে, শয়তান কাউকে জোর করে পাপ করাতে পারে না; সে কেবল আহ্বান করে, আর সিদ্ধান্ত নেয় মানুষ নিজেই।
ইবাদতের মধ্যেও শয়তানের হস্তক্ষেপ
শয়তান শুধু পাপের দিকে টানে না; ইবাদতের মধ্যেও সে মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করে। এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করলেন, শয়তান আমার নামাজ ও কিরাতের মধ্যে বাধা সৃষ্টি করে, আমাকে বিভ্রান্ত করে। তিনি বললেন, এ হলো খিনজাব নামের এক শয়তান; যখন তুমি তার উপস্থিতি অনুভব করবে, আল্লাহর আশ্রয় চাইবে এবং বাম দিকে তিনবার হালকা থুতু ফেলবে। সাহাবি বলেন, আমি তা করলাম, আর আল্লাহ আমাকে তার থেকে মুক্ত করলেন (সহিহ মুসলিম, ২২০৩)।
নামাজে মন অন্যদিকে চলে যাওয়া, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা আসা, কিংবা ইবাদতের সময় হঠাৎ দুনিয়ার কাজের কথা মনে পড়া—এসব অনেক সময় শয়তানের কৌশল। এর প্রতিকার হলো সচেতনভাবে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা, আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া। মনে রাখতে হবে, ওয়াসওয়াসা আসা ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং সাহাবিরাও এর মুখোমুখি হয়েছিলেন। আসল বিষয় হলো, তা অনুসরণ না করা।
শয়তান থেকে বাঁচার সুন্নাহসম্মত উপায়
আল্লাহ আমাদের শয়তানের সামনে অসহায় রাখেননি। কুরআন আশ্বস্ত করেছে, শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল (৪:৭৬), এবং আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদের ওপর তার কোনো আধিপত্য নেই (১৫:৪২)। সুরক্ষার কয়েকটি পথ হলো:
আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা: আল্লাহ বলেন, যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর আশ্রয় চাও (৭:২০০)। সূরা আল-ফালাক ও আন-নাস এবং আয়াতুল কুরসি এই আশ্রয়ের সর্বোত্তম মাধ্যম।
জিকির ও সতর্কতা: আল্লাহ বলেন, মুত্তাকিদের যখন শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ খুলে যায় (৭:২০১)। নিয়মিত জিকির শয়তানের প্রভাব থেকে অন্তরকে রক্ষা করে।
দৈনন্দিন সুরক্ষার আমল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেউ যখন ঘরে প্রবেশের সময় ও খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, এখানে তোমাদের রাতে থাকার জায়গা নেই, খাবারও নেই (সহিহ মুসলিম, ২০১৮)। আর ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক থাকে, আর শয়তান কাছে আসতে পারে না (সহিহ বুখারি, ২৩১১)। এই ছোট ছোট আমল প্রতিদিনের জীবনে শয়তানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে কাজ করে।
পাপের পরিবেশ এড়ানো: রাগ, নির্জনতা ও প্রলোভনের পরিস্থিতি আগেভাগেই এড়িয়ে চলা, যাতে শয়তান সুযোগ না পায়।
সৎ সঙ্গ: একা মানুষ শয়তানের সহজ শিকার। জামাতে নামাজ, সৎ বন্ধু ও দ্বীনি পরিবেশ শয়তানের বিরুদ্ধে এক সুরক্ষাবলয় তৈরি করে।
দ্রুত তাওবা: ভুল হয়ে গেলে আদম (আ.)-এর মতো সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ করা; আর মুমিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তাওবা।
আত্মসমীক্ষা: তিন ফাঁদের আয়নায় নিজেকে দেখা
শয়তানের ফাঁদ সম্পর্কে জানা যথেষ্ট নয়; নিজের জীবনে সেগুলো কোথায় কাজ করছে, তা খুঁজে বের করাই আসল কাজ। নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। শেষ কবে আমি রাগের মাথায় এমন কিছু বলেছি বা করেছি, যার জন্য পরে অনুতপ্ত হয়েছি? রাগের মুহূর্তে কি আমি আউজুবিল্লাহ পড়ি, নাকি প্রতিক্রিয়া দেখাতে তাড়াহুড়া করি? আমার কর্মক্ষেত্রে, পড়াশোনায় বা অনলাইনে কি এমন কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ আছে, যা ধীরে ধীরে সীমা অতিক্রম করছে? দান করার সময় কি আমার মনে দ্বিধা কাজ করে, আর সেই দ্বিধা কি আমাকে শেষ পর্যন্ত বিরত রাখে? কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে কি আমি তা বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিই, নাকি ইবলিসের মতো যুক্তি খুঁজি?
এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর আমাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিনিয়ে দেবে। আর দুর্বলতা চেনাই সংশোধনের প্রথম ধাপ। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট এই আত্মসমীক্ষা, আর তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা—এই সহজ অভ্যাস শয়তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারে।
উপসংহার: কাহিনি যাচাই, শিক্ষা গ্রহণ
শয়তান ও মুসা (আ.)-এর সাক্ষাতের কাহিনিটি সহিহ হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়; এটি উপদেশমূলক বা ইসরায়েলি বর্ণনা হিসেবে প্রচলিত। তাই একে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। তবে কাহিনিটির কেন্দ্রীয় শিক্ষাগুলো কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা সুপ্রমাণিত: অহংকার তাওবার পথ রুদ্ধ করে; রাগের মুহূর্তে শয়তান সবচেয়ে কাছে থাকে; পরনারীর সঙ্গে নির্জনতায় শয়তান তৃতীয় হয়; আর দানের সংকল্পে শয়তান দারিদ্র্যের ভয় দেখায়।
শয়তান মানুষের চিরশত্রু, কিন্তু অপরাজেয় নয়। তার চক্রান্ত দুর্বল, তার ক্ষমতা সীমিত, আর তার সামনে মুমিনের হাতে রয়েছে আল্লাহর আশ্রয়, জিকির, তাওবা ও সৎ সঙ্গের মতো শক্তিশালী অস্ত্র। যে মানুষ নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, শয়তান তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। আর যে নিজেকে নিরাপদ ভেবে অহংকারে ডুবে থাকে, সে অজান্তেই ইবলিসের পথে পা বাড়ায়।
এই আলোচনা আমাদের আরও একটি বড় শিক্ষা দেয়: দ্বীনের প্রতিটি তথ্য যাচাই করে গ্রহণ ও প্রচার করা। আকর্ষণীয় গল্প শুনলেই তা হাদিস হিসেবে শেয়ার না করে তার সূত্র ও মান জেনে নেওয়া প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। সত্য বর্ণনা ও সহিহ দলিলের মধ্যেই আমাদের জন্য যথেষ্ট শিক্ষা রয়েছে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে অহংকার থেকে মুক্ত রাখুন, রাগ নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিন, পাপের পরিবেশ থেকে হেফাজত করুন, দানশীল হওয়ার তাওফিক দিন এবং শয়তানের সব কুমন্ত্রণা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র
১. সূরা আল-আরাফ, ৭:১১–২৩ (ইবলিসের অহংকার ও আদম আ.-এর তাওবা): https://quran.com/7/11-23
২. সূরা আল-বাকারা, ২:৩৭ ও ২:২৬৮ (আদমের তাওবা কবুল ও শয়তানের দারিদ্র্যের ভয়): https://quran.com/2/37 এবং https://quran.com/2/268
৩. সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫–৭৮ ও সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০ (ইবলিসের অভিশাপ ও জিন পরিচয়): https://quran.com/38/75-78 এবং https://quran.com/18/50
৪. সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২ ও সূরা আন-নূর ২৪:২১ (ব্যভিচারের কাছে না যাওয়া ও শয়তানের পদাঙ্ক): https://quran.com/17/32 এবং https://quran.com/24/21
৫. সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৪ ও সূরা সাবা ৩৪:৩৯ (রাগ সংবরণ ও দানের বিনিময়): https://quran.com/3/134 এবং https://quran.com/34/39
৬. সূরা ইবরাহিম ১৪:২২, সূরা আল-হিজর ১৫:৩৯–৪২ ও সূরা আন-নিসা ৪:৭৬, ৪:১২০ (শয়তানের কৌশল ও দুর্বলতা): https://quran.com/14/22 এবং https://quran.com/15/39-42
৭. সূরা আল-আরাফ ৭:২০০–২০১ ও সূরা আন-নাস ১১৪ (আশ্রয় প্রার্থনা): https://quran.com/7/200-201 এবং https://quran.com/114
৮. সহিহ বুখারি, ৩৪৬১ ও ৪৪৮৫ (বনি ইসরাইলের বর্ণনা সম্পর্কে নীতি) এবং ১১০ (নবীর নামে মিথ্যা): https://sunnah.com/bukhari:3461, https://sunnah.com/bukhari:4485 এবং https://sunnah.com/bukhari:110
৯. সহিহ বুখারি, ৬১১৬ (রাগ করো না), ৬১১৪ (প্রকৃত শক্তিশালী) ও ৩২৮২ (রাগে আউজুবিল্লাহ): https://sunnah.com/bukhari:6116, https://sunnah.com/bukhari:6114 এবং https://sunnah.com/bukhari:3282
১০. সহিহ বুখারি, ২০৩৫ (শয়তান রক্তপ্রবাহের মতো চলে) ও ৫২৩৩ (মাহরাম ছাড়া নির্জনতা নিষেধ): https://sunnah.com/bukhari:2035 এবং https://sunnah.com/bukhari:5233
১১. সহিহ বুখারি, ১৪৪২ (দুই ফেরেশতার দোয়া) ও সহিহ মুসলিম, ২৫৮৮ (দান সম্পদ কমায় না): https://sunnah.com/bukhari:1442 এবং https://sunnah.com/muslim:2588
১২. সহিহ মুসলিম, ৯১ (অহংকারের সংজ্ঞা): https://sunnah.com/muslim:91a
১৩. জামে তিরমিজি, ২১৬৫ (নির্জনতায় শয়তান তৃতীয়) ও ৩৫৪০ (আল্লাহর ক্ষমার হাদিসে কুদসি): https://sunnah.com/tirmidhi:2165 এবং https://sunnah.com/tirmidhi:3540
১৪. সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮২ (রাগের সময় বসা বা শোয়া): https://sunnah.com/abudawud:4782
১৫. সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৫–১৬ (মুসা আ.-এর ঘটনায় শয়তানের কাজ) ও সূরা আল-বাকারা, ২:২৬১ (দানের দৃষ্টান্ত): https://quran.com/28/15-16 এবং https://quran.com/2/261
১৬. সহিহ মুসলিম, ২২০৩ (নামাজে খিনজাব শয়তান) ও ২০১৮ (ঘরে প্রবেশ ও খাবারে বিসমিল্লাহ); সহিহ বুখারি, ২৩১১ (ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি): https://sunnah.com/muslim:2203, https://sunnah.com/muslim:2018 এবং https://sunnah.com/bukhari:2311
১৭. সূরা আর-রাহমান ৫৫:১৫, সূরা ফাতির ৩৫:৬ ও সূরা আন-নূর ২৪:৩০–৩১: https://quran.com/35/6 এবং https://quran.com/24/30-31
১৮. সহিহ মুসলিম, ২৫৭৮ (কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো): https://sunnah.com/muslim:2578
১৯. ইমাম ইবনুল জাওজি, তালবিসে ইবলিস ও আল-মাওদুআত।
