সোশ্যাল মিডিয়ার কানেক্টিভিটি বনাম আধ্যাত্মিক একাকীত্ব: মানুষের প্রকৃত উন্নতি কি মানুষের ভিড়ে, নাকি নির্জনতায়?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন একটি সময় খুব কমই এসেছে যখন মানুষ এত বেশি সংযুক্ত থেকেও এত বেশি একাকী ছিল। আজকের পৃথিবীতে একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমশ সামনে চলে আসছে—এই অবিরাম কানেক্টিভিটি কি সত্যিই মানুষের অন্তরকে পরিপূর্ণ করছে, নাকি তাকে আরও শূন্য করে তুলছে? মানুষ কি হাজারো ভার্চুয়াল বন্ধুর মাঝে থেকেও নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলছে? নাকি নির্জনতা, নীরবতা এবং আধ্যাত্মিক একাকীত্বের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত বিকাশ লুকিয়ে আছে?

মানবজাতির ইতিহাসে যত বড় পরিবর্তন এসেছে, তার অধিকাংশই এসেছে গভীর চিন্তাশীল মানুষদের হাত ধরে। তাঁরা ভিড়ের মধ্যে নয়, বরং নির্জনতায় নিজেদের আবিষ্কার করেছিলেন। ইসলামি ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ। নবুয়তের পূর্বে তিনি মক্কার সামাজিক অবক্ষয়, মূর্তিপূজা, অন্যায় ও নৈতিক অধঃপতনে গভীরভাবে ব্যথিত ছিলেন। তিনি প্রায়ই হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। সেখানে তিনি ধ্যান, চিন্তা ও আত্মিক মনোনিবেশে সময় কাটাতেন। সেই হেরা গুহাতেই তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল প্রথম ওহী। ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সেই ঘটনাটি ঘটেছিল সামাজিক কোলাহল থেকে দূরে, গভীর নির্জনতায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হেরা গুহার নির্জনতা ছিল আত্মার জাগরণের জন্য, মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। আল্লাহ যখন তাঁকে নবুয়তের দায়িত্ব দিলেন, তখন তিনি মানুষের মধ্যে ফিরে এলেন। তিনি বাজারে গেছেন, মসজিদে গেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন, পরিবারকে সময় দিয়েছেন, সমাজ পরিচালনা করেছেন এবং মানবজাতির জন্য আদর্শ জীবন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে ইসলামের শিক্ষা হলো, নির্জনতা হবে আত্মগঠনের জন্য, আর সমাজে অংশগ্রহণ হবে মানবকল্যাণের জন্য।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বহুবার মানুষকে চিন্তা, গবেষণা ও আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আকাশ, পৃথিবী, রাত, দিন, সৃষ্টিজগৎ এবং মানুষের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করার কথা বলা হয়েছে। এই চিন্তা কখনো কোলাহলের মধ্যে সম্ভব হয় না। গভীর উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন নীরবতা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলছে যে মানুষের মস্তিষ্ক অবিরাম তথ্যপ্রবাহের মধ্যে থাকলে গভীর চিন্তার ক্ষমতা কমে যায়। অথচ আজকের মানুষ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় অবিরাম নোটিফিকেশন, ভিডিও, পোস্ট, মন্তব্য এবং খবরের বন্যায় ডুবে থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বড় সমস্যা হলো এটি মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করে। একজন মানুষ হয়তো পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়েছে, কিন্তু কখন এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। এই অবস্থা মানুষের চিন্তার গভীরতা কমিয়ে দেয়। মানুষ দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। বই পড়ার অভ্যাস কমে যায়। আত্মসমালোচনার সময় হারিয়ে যায়। এমনকি অনেক মানুষ নিজের সঙ্গে একা থাকতে পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ করে।

অন্যদিকে আধ্যাত্মিক একাকীত্ব মানুষকে নিজের অন্তরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যখন মানুষ নির্জনে বসে আল্লাহকে স্মরণ করে, কুরআন তিলাওয়াত করে, দোয়া করে, নিজের ভুলগুলো নিয়ে চিন্তা করে, তখন তার আত্মা পরিশুদ্ধ হতে শুরু করে। ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য সাহাবি, তাবেয়ি, আলেম, সুফি ও সংস্কারক নির্জন চিন্তাকে আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরাই নন, বিশ্বের বহু বিজ্ঞানীও নির্জনতাকে সৃজনশীলতার উৎস হিসেবে দেখেছেন। আইজ্যাক নিউটন প্লেগের সময় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় একাকী ছিলেন। সেই সময়েই তিনি মহাকর্ষ এবং ক্যালকুলাসের মৌলিক ধারণা বিকাশ করেন। আলবার্ট আইনস্টাইন প্রায়ই নির্জন চিন্তাকে সৃজনশীলতার প্রধান উপাদান বলতেন। নিকোলা টেসলা, মাইকেল ফ্যারাডে, গ্যালিলিও এবং আরও অনেক বিজ্ঞানীর জীবনে একাকীত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে সোশ্যাল মিডিয়াকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত ছড়ানো যায়, জ্ঞান অর্জন করা যায়, কুরআনের তাফসির শোনা যায়, হাদিস অধ্যয়ন করা যায়, বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় এবং অসংখ্য কল্যাণকর কাজে অংশ নেওয়া যায়। আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ অনলাইনের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করছে। অনেক আলেম, গবেষক ও শিক্ষাবিদ তাঁদের জ্ঞান কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

সমস্যা সোশ্যাল মিডিয়ার অস্তিত্বে নয়; সমস্যা এর অপব্যবহারে। যখন এটি আমাদের সময়, মনোযোগ এবং আত্মিক শক্তিকে গ্রাস করে ফেলে, তখন এটি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। একজন মানুষ যদি প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা অর্থহীন স্ক্রলিংয়ে ব্যয় করে, কিন্তু কুরআন পড়তে দশ মিনিটও সময় না পায়, তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি ভারসাম্যহীন জীবন।

আজকের যুগে অনেক মানুষ লাইক, কমেন্ট এবং ফলোয়ারের সংখ্যাকে নিজের মূল্যবোধের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছে। ফলে তাদের সুখ নির্ভর করছে অন্যের প্রতিক্রিয়ার উপর। কেউ পোস্টে প্রশংসা করলে ভালো লাগে, সমালোচনা করলে মন খারাপ হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিনের আত্মমর্যাদা মানুষের প্রশংসা বা নিন্দার উপর নির্ভর করে না।

আধ্যাত্মিক একাকীত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মসমালোচনা। হযরত উমর (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে যার সারমর্ম হলো, হিসাবের দিনের আগে নিজের হিসাব নিজেই নাও। এই আত্মসমালোচনা তখনই সম্ভব যখন মানুষ নিজের সঙ্গে কিছু সময় কাটায়। সারাদিন ফোন, ভিডিও, নোটিফিকেশন এবং অনলাইন ব্যস্ততায় ডুবে থাকলে নিজের ভুলগুলো দেখার সুযোগই থাকে না।

অনেক তরুণ মনে করে, বেশি বন্ধু মানেই বেশি সুখ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সত্যিকারের বন্ধু হয়তো একজন বা দুজনই হতে পারে, কিন্তু তারা আন্তরিক হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার হাজারো পরিচিত মানুষের তুলনায় একজন সৎ, আল্লাহভীরু বন্ধুর মূল্য অনেক বেশি। কারণ সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই উপকার করতে পারে।

ইসলামে রাতের নীরবতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাহাজ্জুদের সময়, রাতের শেষ প্রহর, যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এই সময়ের নির্জনতা আত্মাকে এমন প্রশান্তি দেয় যা কোনো ভার্চুয়াল বিনোদন দিতে পারে না। যারা নিয়মিত রাতের নির্জনতায় আল্লাহর স্মরণে সময় কাটান, তারা প্রায়ই এক ধরনের অভ্যন্তরীণ শান্তি অনুভব করেন।

তবে আধ্যাত্মিক একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এক জিনিস নয়। ইসলাম পরিবার, আত্মীয়তা, প্রতিবেশীসুলভ আচরণ, মসজিদভিত্তিক সমাজজীবন এবং মানবিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই আদর্শ মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি নির্জনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করেন এবং মানুষের মাঝে থেকে তাদের উপকার করেন।

বর্তমান যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের প্রাচুর্য কিন্তু প্রজ্ঞার অভাব। মানুষ হাজারো তথ্য জানে, কিন্তু নিজের আত্মাকে চেনে না। পৃথিবীর খবর রাখে, কিন্তু নিজের হৃদয়ের খবর রাখে না। অন্যের জীবন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়, কিন্তু নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে পাঁচ মিনিটও চিন্তা করে না। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সচেতনভাবে কিছু সময় প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা।

যদি একজন মানুষ প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ফোন বন্ধ রেখে কুরআন পড়ে, চিন্তা করে, দোয়া করে, বই পড়ে এবং নিজের জীবন মূল্যায়ন করে, তবে কয়েক মাসের মধ্যেই তার মানসিক ও আত্মিক অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। কারণ মানুষের আত্মা শুধু বিনোদন চায় না; আত্মা অর্থ, উদ্দেশ্য এবং সত্যের সন্ধান করে।

পরিশেষে বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ার কানেক্টিভিটি এবং আধ্যাত্মিক একাকীত্ব পরস্পরের শত্রু নয়; কিন্তু যখন প্রথমটি দ্বিতীয়টিকে গ্রাস করে ফেলে, তখন মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তা হারিয়ে ফেলে। হেরা গুহা আমাদের শেখায় যে মহান পরিবর্তনের সূচনা প্রায়ই নীরবতা থেকে হয়। নবী-রাসুল, চিন্তাবিদ, সংস্কারক এবং বিজ্ঞানীদের জীবন আমাদের বলে যে গভীর চিন্তা ও আত্মসমালোচনা ছাড়া প্রকৃত মহত্ত্ব অর্জন করা কঠিন। তাই আধুনিক মানুষের প্রয়োজন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, প্রযুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হওয়া। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে হবে জ্ঞান, দাওয়াত ও কল্যাণের জন্য; আর প্রতিদিন কিছু সময় নির্জনে কাটাতে হবে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। যে মানুষ এই ভারসাম্য অর্জন করতে পারে, সে দুনিয়ার কোলাহলের মধ্যেও অন্তরের শান্তি খুঁজে পায় এবং মানুষের ভিড়ের মধ্যেও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়।

মানুষের ইতিহাস মূলত দুই ধরনের যাত্রার ইতিহাস—একটি বাহ্যিক জগতের দিকে, অন্যটি অন্তর্জগতের দিকে। বাহ্যিক জগতের যাত্রায় মানুষ সভ্যতা গড়েছে, নগর নির্মাণ করেছে, প্রযুক্তির বিস্ময় সৃষ্টি করেছে এবং পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। আর অন্তর্জগতের যাত্রায় মানুষ সত্যের সন্ধান করেছে, স্রষ্টাকে খুঁজেছে, নিজের আত্মাকে চিনেছে এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে। বর্তমান যুগে মানবসভ্যতা বাহ্যিক উন্নতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও অন্তর্জগতের সংকট ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে। মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, কিন্তু আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্থির। বন্ধু তালিকায় হাজারো মানুষ আছে, কিন্তু হৃদয়ের কথা বলার মতো একজন মানুষও অনেকের নেই। কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, কিন্তু আত্মার নীরব আহ্বান যেন হারিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল শব্দের ভিড়ে।

প্রযুক্তির এই যুগে একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে এমন এক বাস্তবতায় জন্ম নেয় যেখানে স্ক্রিন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার শিক্ষা, বিনোদন, যোগাযোগ, এমনকি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া আজ কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনধারা, একটি মানসিক পরিবেশ। এই পরিবেশ মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ তাআলা যখন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৃথিবীতে পাঠাতে চাইলেন, তখন সেটি কোনো বাজারে, রাজপ্রাসাদে বা জনসমাগমে নাজিল করেননি। বরং একটি নির্জন গুহায়, একাকী চিন্তামগ্ন একজন মানুষের হৃদয়ে অবতীর্ণ করেছিলেন। হেরা গুহার সেই ঘটনা মানব ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। এটি আমাদের শেখায় যে সত্যের সর্বোচ্চ উপলব্ধি প্রায়ই নীরবতা, ধ্যান এবং আত্মিক মনোযোগের মাধ্যমে আসে।

হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনেও আমরা গভীর চিন্তার উদাহরণ দেখি। তিনি তাঁর চারপাশের সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছিলেন। আকাশের তারা, চাঁদ এবং সূর্যের দিকে তাকিয়ে তিনি সত্যের অনুসন্ধান করেছিলেন। তাঁর সেই অনুসন্ধান তাঁকে এক আল্লাহর পরিচয় দিয়েছিল। যদি তিনি সমাজের প্রচলিত চিন্তার স্রোতে ভেসে যেতেন, তবে হয়তো সত্যের সন্ধান পেতেন না। ইতিহাসের প্রতিটি মহান জাগরণ শুরু হয়েছে প্রশ্ন থেকে, চিন্তা থেকে, আর সেই চিন্তার জন্য প্রয়োজন হয়েছে নির্জনতা।

হযরত মূসা (আ.) সিনাই পর্বতে আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের জন্য নির্জনে গিয়েছিলেন। হযরত ঈসা (আ.) দীর্ঘ সময় নির্জনে ইবাদত ও ধ্যান করেছেন। নবী মুহাম্মদ ﷺ হেরা গুহায় অবস্থান করেছেন। এসব ঘটনা কেবল ধর্মীয় ইতিহাস নয়; এগুলো মানব আত্মার বিকাশের এক চিরন্তন শিক্ষা। এগুলো আমাদের জানায় যে মানুষের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় তখনই, যখন সে মাঝে মাঝে কোলাহল থেকে দূরে সরে নিজের অন্তরের দিকে তাকায়।

আজকের পৃথিবীতে সমস্যাটি হলো আমরা একা থাকতে ভুলে গেছি। আগে মানুষ একা থাকলে চিন্তা করত; এখন একা হলেই ফোন বের করে। আগে নীরবতা মানুষকে নিজের ভেতরে নিয়ে যেত; এখন নীরবতা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ আমরা ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিক অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে অবিরাম উদ্দীপনা ছাড়া থাকতে পারি না। মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত নতুন ভিডিও, নতুন পোস্ট, নতুন সংবাদ এবং নতুন বিনোদনের প্রত্যাশা করে। ফলে গভীর চিন্তার ক্ষমতা কমে যায়।

বিশ্বের অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন যে আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো “ডিজিটাল বিভ্রান্তি”। মানুষের মন এখন ক্রমাগত এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে ছুটে বেড়ায়। মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ বই পড়ার অভ্যাস কমছে। গভীর গবেষণার পরিবর্তে মানুষ শিরোনাম পড়ে মতামত তৈরি করছে। অথচ জ্ঞান কখনো দ্রুত স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। জ্ঞান আসে মনোযোগ, ধৈর্য এবং গভীর চিন্তার মাধ্যমে।

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি অদৃশ্য প্রভাব হলো এটি মানুষের আত্মপরিচয়কে পরিবর্তন করে। আগে মানুষ নিজেকে মূল্যায়ন করত তার চরিত্র, জ্ঞান, নৈতিকতা এবং কাজের ভিত্তিতে। এখন অনেকেই নিজেকে মূল্যায়ন করে অনুসারীর সংখ্যা, লাইক, শেয়ার এবং মন্তব্যের মাধ্যমে। ফলে মানুষের আত্মসম্মান বাইরের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থা আত্মিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একজন মানুষের মূল্য তার জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার চরিত্রে।

ইসলামে ইখলাস বা আন্তরিকতার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন বহু আমল রয়েছে যা গোপনে করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কারণ যখন মানুষ একা থাকে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে, তখন তার কাজের মধ্যে প্রদর্শনীর সম্ভাবনা কম থাকে। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ার সংস্কৃতি প্রায়ই মানুষের মধ্যে নিজেকে প্রদর্শনের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। মানুষ কখনো কখনো ইবাদত, দান বা ভালো কাজকেও প্রশংসা পাওয়ার মাধ্যম বানিয়ে ফেলে। এর ফলে কাজের আধ্যাত্মিক মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ খারাপ। বরং এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যেমন একটি ছুরি দিয়ে ফল কাটা যায়, আবার ক্ষতিও করা যায়; তেমনি সোশ্যাল মিডিয়াও কল্যাণ বা অকল্যাণ উভয় কাজেই ব্যবহৃত হতে পারে। আজ অসংখ্য ইসলামি শিক্ষামূলক চ্যানেল, কুরআন তিলাওয়াত, হাদিসের আলোচনা, ইসলামের ইতিহাস, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তাই মূল প্রশ্ন হলো—আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করছে?

যদি একজন মানুষ প্রতিদিন চার ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে, তবে বছরে সে প্রায় ষাট দিনেরও বেশি সময় শুধুমাত্র স্ক্রিনে কাটায়। দশ বছরে এই সময় দাঁড়ায় প্রায় দুই বছরের সমান। এখন প্রশ্ন হলো, এই দুই বছর যদি কুরআন অধ্যয়ন, বই পড়া, গবেষণা, নতুন দক্ষতা অর্জন, আত্মশুদ্ধি এবং সমাজসেবায় ব্যয় হতো, তবে সেই মানুষটি কোথায় পৌঁছাতে পারত?

ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখতেন। ইমাম বুখারি, ইমাম গাজ্জালি, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে খালদুন, ইবনে সিনা, আল-খাওয়ারিজমি এবং অন্যান্য মুসলিম মনীষীরা তাঁদের জীবনের অসংখ্য ঘণ্টা অধ্যয়ন, গবেষণা এবং চিন্তায় ব্যয় করেছেন। তাঁরা যদি আজকের যুগের মতো প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতেন, তাহলে হয়তো মানবসভ্যতা তাঁদের সেই অসাধারণ অবদান থেকে বঞ্চিত হতো।

আধ্যাত্মিক একাকীত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে শেখায়। যখন মানুষ একা বসে নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করে, তখন সে বুঝতে পারে তার সময় সীমিত, জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং একদিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং তাকে আরও বিনয়ী করে তোলে।

বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ তথ্যের সাগরে বাস করছে, কিন্তু প্রজ্ঞার মরুভূমিতে হাঁটছে। তথ্য জানার জন্য ইন্টারনেট যথেষ্ট, কিন্তু প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য প্রয়োজন চিন্তা। আর চিন্তার জন্য প্রয়োজন নীরবতা। সেই নীরবতা কখনো হেরা গুহার মতো কোনো পাহাড়ি গুহায় না হলেও, নিজের ঘরের একটি নির্জন কোণে, রাতের শেষ প্রহরে, অথবা একটি বইয়ের পাশে বসেও সৃষ্টি করা সম্ভব।

হয়তো এই কারণেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবগুলো শুরু হয়েছে একজন মানুষের অন্তরের ভেতর থেকে। কারণ পৃথিবী পরিবর্তনের আগে মানুষকে নিজেকে পরিবর্তন করতে হয়। আর নিজের পরিবর্তনের যাত্রা শুরু হয় একাকী আত্মসমালোচনা থেকে, জনসমক্ষে আত্মপ্রদর্শন থেকে নয়।

Reporter

mamunphf@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *