মুসলিম সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, পবিত্র কুরআনে ‘দাজ্জাল’ বা ‘মাসিহ উদ-দাজ্জাল’ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই; তার সমস্ত আলোচনা কেবল হাদিসেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই ধারণাটি মূলত কুরআন অধ্যয়নের সঠিক পদ্ধতির অভাব থেকে তৈরি হয়।
পবিত্র কুরআন দুই ধরনের আয়াত নিয়ে গঠিত:
- আয়াত মুহকামাত: অত্যন্ত স্পষ্ট ও সহজ সরল আয়াত, যা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিরোধীরাও সহজে বুঝতে পারে। এগুলোই কিতাবের মূল ভিত্তি।
- আয়াত মুতাশাবিহাত: রূপক বা প্রতীকী আয়াত, যার সঠিক মর্মার্থ বোঝার জন্য গভীর ব্যাখ্যা বা ‘তাবিল’-এর প্রয়োজন হয়।
মাসিহ উদ-দাজ্জালের বিষয়টি কুরআনের কোনো স্পষ্ট আয়াতে (মুহকামাত) না থাকলেও, তা অত্যন্ত জোরালোভাবে লুকিয়ে আছে রূপক বা প্রতীকী (মুতাশাবিহাত) আয়াতগুলোর ভেতরে।
আখেরাতের প্রধান ১০টি নিদর্শন ও দাজ্জালের লক্ষ্য
সহীহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আখেরাত বা শেষ জামানার ১০টি প্রধান নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন। এই তালিকার অন্যতম প্রধান তিনটি বিষয় হলো:
- আল মাসিহ আদ-দাজ্জাল: সে নিজেকে ‘মাসিহ’ বা মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে দাবি করবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে একজন ভন্ড বা ছদ্মবেশী মাসিহা।
- ঈসা আলাইহিস সালামের প্রত্যাবর্তন: তিনিই সত্যিকারের মাসিহা, যিনি ফিরে এসে জেরুজালেম থেকে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের সাথে বিশ্ব শাসন করবেন।
- ইয়াজুজ ও মাজুজ।
যেহেতু সত্যিকারের মাসিহা (ঈসা আ.) জেরুজালেম থেকে বিশ্ব শাসন করবেন, তাই তাকে নকল বা অনুকরণ করার জন্য ভন্ড মাসিহা দাজ্জালেরও মূল লক্ষ্য হলো জেরুজালেম থেকে বিশ্বজুড়ে নিজের শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
সুলাইমান (আ.)-এর সিংহাসন এবং ‘জাসাদ’-এর রহস্য
কুরআনের সূরা সোয়াদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একটি বিশেষ পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন:
“এবং আমরা সুলায়মানকে পরীক্ষা করলাম এবং তার সিংহাসনে একটি ‘জাসাদ’ বা রুহহীন দেহ নিক্ষেপ করলাম। তারপর সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে এলো।”
এই আয়াতে বর্ণিত ‘জাসাদ’ আসলে কে? গভীর চিন্তাভাবনা ও বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই জাসাদই হলো দাজ্জাল। দাজ্জালকে কেন ‘জাসাদ’ বা মানবাত্মাহীন একটি দেহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে?
আল্লাহ তাআলা মানুষের ভেতর নিজের পক্ষ থেকে যে বিশেষ ‘রুহ’ ফুঁকে দিয়েছেন, তার ফলে মানুষ স্বাধীন চিন্তা, সত্য-মিথ্যা বাছাই এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (আমানত) লাভ করেছে। কিন্তু দাজ্জালের মধ্যে মানুষের মতো এই বিশেষ রুহ বা স্বাধীন চেতনা নেই। সে বাহ্যিকভাবে প্রোগ্রামড (Programmed) একটি সত্তা।
সুলাইমান (আ.) আল্লাহর দেওয়া প্রজ্ঞার মাধ্যমে এক মুহূর্তেই বুঝেছিলেন যে, তার সিংহাসনে বসা এই ‘জাসাদ’ একটি ভয়ঙ্কর শয়তানি শক্তি, যে জেরুজালেম থেকে বিশ্ব শাসন করার জন্য তার রাজত্বের উত্তরাধিকারী হতে চায়। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন তাকে এমন এক অনন্য রাজত্ব দেওয়া হয়, যা তার পরে আর কেউ যেন না পায়। এই দোয়ার মাধ্যমে তিনি দাজ্জালের সেই সময়ের মিশনকে আটকে দিয়েছিলেন।
জিন জাতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও ‘মিনসা’ (লাঠি)
ঐতিহ্যগতভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ দীর্ঘ সময় লাঠিতে ভর দিয়ে ছিল এবং উইপোকা সেই লাঠি খাওয়ার পর তা ভেঙে পড়লে জিনরা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে। কিন্তু একজন শাসকের মৃত্যু বা অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন মানুষের আড়ালে থাকা যুক্তিযুক্ত নয়।
আসলে, ‘মিনসা’ হলো লাঠির সেই অলৌকিক বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু (যেমনটা মূসা আলাইহিস সালামের লাঠিতেও ছিল)। সুলাইমান (আ.)-এর মৃত্যুর পর, দাজ্জাল বা সেই জাসাদ সিংহাসনে বসে অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে জিনদের বিভ্রান্ত করে রেখেছিল এবং দুষ্ট জিনদের দিয়ে নিজের মিশন (যেমন: বর্তমানের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা আধুনিক অবাস্তব প্রযুক্তি ব্যবস্থা) নিয়ন্ত্রণ করছিল। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার এই অতি-প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পেছনেও এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাব রয়েছে।
দাব্বাতুল আরদ এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
কুরআনে বলা হয়েছে, শেষ সময়ে ‘দাব্বাতুল আরদ’ বা ভূগর্ভস্থ এক অদ্ভুত জীব/সত্তা এসে সেই লাঠির অলৌকিক ক্ষমতা (মিনসা) ধ্বংস করে দেবে, যার ফলে দাজ্জালের ধোঁকা উন্মোচিত হবে এবং জিনেরা তার দাসত্ব ছেড়ে পালাবে।
সমকালীন প্রেক্ষাপটে ‘দাব্বাতুল আরদ’-এর একটি আধুনিক ব্যাখ্যা হতে পারে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ (Electromagnetic Waves), যা বর্তমানে স্মার্টফোন, ওয়্যারলেস ইন্টারনেট এবং ফাইভ-জি (5G) টাওয়ারের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে প্লাবিত করছে।
এই অদৃশ্য তরঙ্গ কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছে না, বরং মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোন ও স্মৃতিশক্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। যেভাবে কৃত্রিম সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে, তাতে মানুষ নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে এবং দাজ্জালের মতোই ‘জাসাদ’ বা চেতনাহীন জীবে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনে আধুনিক শহরে বড় হওয়া কোনো শিশুর পক্ষে পবিত্র কুরআনের হাফেজ হওয়া বা গভীর জ্ঞানচর্চা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। একমাত্র প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে থাকা শিশুরাই হয়তো এই ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।
উপসংহার
দাজ্জাল এখনো আমাদের চেনা স্থান ও কালের (Space and Time) দৃশ্যমান জগতে সরাসরি প্রবেশ করেনি। হাদিস অনুযায়ী, সে পৃথিবীতে আসার পর তার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে চারপাশের পরিবেশ ও প্রযুক্তি মানুষকে চিন্তাহীন রোবটে পরিণত করছে। কুরআনের এই মুতাশাবিহাত বা রূপক আয়াতগুলো নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে, যাতে আমরা দাজ্জালি ফিতনা ও চেতনাহীন ‘জাসাদ’ হওয়া থেকে নিজেদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারি।
(আল্লাহু আলাম — আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।)

Leave a Reply