হারুত মারুত এর সত্যিকারের ঘটনা যা পবিত্র কোরআনে বর্ণীত হয়েছেঃ

ফেরেশতারা তো পৃথিবীতে আসেন মহান আল্লাহর রহমত নিয়ে, তাই না? কিন্তু যদি আপনাকে বলি আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে আসমান থেকে এমন দুজন ফেরেশতা পৃথিবীতে এসেছিলেন যাদের কাছে এক ভয়ংকর জ্ঞান ছিল। এমন এক জ্ঞান যা শিখলে মানুষ চিরকালের জন্য জাহান্নামী হয়ে যেত।

সম্মানিত দর্শক, কোরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির হাফেজ ইবনে কাসির রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন জোহরা নারীর ওই গল্পটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং এটি একটি ইহুদিদের বানানো একটি ভিত্তিহীন রূপকথা মাত্র। তাহলে আসল সত্য কী? কেনই বা আল্লাহ এই দুজন পবিত্র ফেরেশতাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন?

আসসালামু আলাইকুম। আপনারা দেখছেন মুসাফিরের আলো। আমাদের এই চ্যানেলে আমরা কোনো ভিত্তিহীন রূপকথা নয়, বরং পবিত্র কোরআন ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের আলোকে তুলে ধরি সত্যের পথে হারিয়ে যাওয়া অজানা গল্প। চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটি বাজিয়ে দিন যাতে ইসলামের অজানা ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস সবার আগে আপনার কাছে পৌঁছে।

চলুন, ডুব দেওয়া যাক প্রাচীন ব্যাবিলনের সেই রহস্যময় ও গা ছমছমে যুগে। এই গা ছমছমে মূল ঘটনায় প্রবেশের আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক সোনালী অধ্যায়ে। সময়টা ছিল হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের রাজত্বকালের। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে এমন এক বিশাল এবং অকল্পনীয় রাজত্ব দান করেছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো মানুষকে দেওয়া হয়নি আর কিয়ামত পর্যন্ত কাউকে দেওয়া হবে না। তার সিংহাসনের সামনে কেবল মানুষ নয়, বরং জ্বিন, পশুপাখি, এমনকি প্রবল বাতাসও মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকত। সুলাইমান আলাইহিস সালামের নির্দেশে আগুনের তৈরি দুর্ধর্ষ এবং বিশালদেহী জ্বিনেরা বাধ্য হয়ে সাগরের তলদেশ থেকে মহামূল্যবান মুক্তা তুলে আনত, বিশাল বিশাল প্রাসাদ আর ভাস্কর্য নির্মাণ করত।

জ্বিন জাতি, যারা মানব সৃষ্টির আগে পৃথিবীতে নিজেদের ইচ্ছেমতো ফাসাদ আর রাজত্ব করে বেরিয়েছিল, তারা আল্লাহ নবীর এই ঐশী ক্ষমতার সামনে ছিল একেবারে অসহায় এবং শৃঙ্খলিত। তাদের ঘাড়ে অদৃশ্য এক দাসত্বের শিকল পরানো ছিল। কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়ম মেনে একদিন হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম ইন্তেকাল করলেন। তার ইন্তেকালের বিষয়টি যখন জ্বিনদের কাছে পরিষ্কার হলো, তখন তাদের দীর্ঘদিনের বন্দিদশা ঘুচে গেল। তারা বুঝতে পারল সুলাইমান আলাইহিস সালামের সেই প্রতাপশালী রাজত্ব আর নেই।

তখন মানবজাতির আদি শত্রু ইবলিশ এবং তার অনুসারী শয়তানেরা এক চরম ধোঁকাবাজির পরিকল্পনা করল। তারা চাইল সুলাইমান আলাইহিস সালামের পবিত্র নামকে চিরতরে কলঙ্কিত করতে এবং মানুষকে শিরক ও কুফরের অন্ধকারে নিমজ্জিত করতে। শয়তানেরা অতি গোপনে কিছু ভয়ংকর জাদুর বই, কুফরি মন্ত্র এবং আসমান থেকে চুরি করে শোনা কিছু তথ্যের সাথে হাজারো মিথ্যা মিশিয়ে একটি বিশাল গ্রন্থ তৈরি করল। রাতের ঘন অন্ধকারে তারা সেই কালো জাদুর ভয়ংকর সব মন্ত্র সুলাইমান আলাইহিস সালামের সিংহাসনের ঠিক নিচে মাটির অনেক গভীরে পুঁতে রাখল। এরপর শয়তানেরা মানুষের রূপ ধরে বনী ইসরাইলের নেতাদের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “তোমরা কি জানো সুলাইমান কীভাবে পুরো পৃথিবী শাসন করত? কীভাবে জ্বিন আর বাতাস তার কথা শুনত? সে তো কোনো নবী ছিল না, সে ছিল একজন জাদুকর। বিশ্বাস না হলে তার সিংহাসনের নিচে খুঁড়ে দেখো, সেখানেই লুকিয়ে আছে তার ক্ষমতার আসল রহস্য।”

বনী ইসরাইলের লোকেরা চরম কৌতূহল নিয়ে সুলাইমান আলাইহিস সালামের সিংহাসনের নিচে মাটি খুঁড়ল। আর সত্যি তারা সেখান থেকে উদ্ধার করল সেই কালো জাদুর ভয়ংকর সব মন্ত্র। দুনিয়ার ক্ষমতা লোভে অন্ধ হয়ে যাওয়া সেই মানুষেরা শয়তানের এই জঘন্য মিথ্যাকে পরম সত্য বলে বিশ্বাস করে নিল। তারা বলতে শুরু করল সুলাইমান তো আসলে আল্লাহর নবী ছিলেন না, সে এই জাদুর বলেই রাজত্ব করত। বনী ইসরাইল জাতির কাছে তখন জীবন পরিচালনার মূল গাইডলাইন ছিল হযরত মুসা আলাইহিস সালামের ওপর নাজিল হওয়া আল্লাহর পবিত্র কিতাব তাওরাত। কিন্তু দুনিয়ার ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা আল্লাহর দেওয়া সেই তাওরাত কিতাবকে পেছনে ফেলে দিল। তার বদলে শয়তানের শেখানো সেই জাদুর বইগুলোকেই তারা নিজেদের জীবনের মূল লক্ষ্য বানাল। শুরু হলো মানুষের মাঝে জাদুর চর্চা। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল জাদুর অন্ধকার। মানুষ ভুলে গেল স্রষ্টাকে, ভুলে গেল আসমানি কিতাবকে। পুরো সমাজে এক ভয়ংকর আধ্যাত্মিক মহামারি নেমে এল। তারা জাদুর মাধ্যমে মানুষকে ধোঁকা দিতে শুরু করল।

বনী ইসরাইল এবং সেই প্রাচীন সমাজ যখন জাদুর এই নেশায় পুরোপুরি ডুবে গেল, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সিদ্ধান্ত নিলেন এই অবাধ্য জাতিকে এক ভয়ংকর পরীক্ষার সম্মুখীন করার। এখানে অনেকের মনেই একটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন আসতে পারে, মহান আল্লাহ কেন মানুষকে পাপের জিনিস শেখাবেন বা জাদু শেখানোর জন্য আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠাবেন? এর পেছনে রয়েছে একটি অত্যন্ত গভীর এবং যৌক্তিক কারণ। শয়তানেরা যখন জাদুকে ঐশী জ্ঞান বা নবীদের ক্ষমতা বলে সমাজে চালিয়ে দিচ্ছিল, তখন মানুষ সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য ভুলে গিয়েছিল। তাই মহান আল্লাহ আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠালেন মানুষকে এই সত্যটি বোঝানোর জন্য যে, কোনটা জাদুর কুফরি বিদ্যা আর কোনটা আল্লাহর দেওয়া মুজেজা বা অলৌকিক জ্ঞান। একই সাথে এটি ছিল মানুষের ইমানের জন্য একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা বা ফিতনা। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। আল্লাহ দেখতে চাইলেন কারা এই জাদুর বিদ্যা এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার লোভে পড়ে শয়তানের পথে পা বাড়ায়, আর কারা আল্লাহর ভয়ে নিজেদের ইমানকে রক্ষা করে।

এই চরম পরীক্ষার জন্য আল্লাহ যে স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে উন্নত এবং রহস্যময় শহর— ব্যাবিলন। এই শহরের বুকে মানুষের রূপ ধারণ করে অবতীর্ণ হলেন আসমান থেকে আসা সেই দুজন অত্যন্ত মর্যাদাবান ফেরেশতা। তাদের নাম ছিল হারুত এবং মারুত

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, হারুত আর মারুতের আগেই কি পৃথিবীতে জাদুর অস্তিত্ব ছিল? উত্তর হলো— হ্যাঁ, ছিল। শয়তানরা সুলাইমান আলাইহিস সালামের যুগে জাদুর যে বিষাক্ত বীজ বুনেছিল, তা ব্যাবিলন শহরে এসে এক মহামারির রূপ নিয়েছিল। মানুষ তখন নবীদের মুজেজা এবং শয়তানের জাদুর মাঝে পার্থক্য করতে পারছিল না। তাই আল্লাহ এই দুই ফেরেশতাকে পাঠালেন জাদুর প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করতে। একজন ডাক্তার যেমন বিষের প্রকৃতি সম্পর্কে জানেন মানুষকে বাঁচানোর জন্য, ঠিক তেমনি হারুত আর মারুত জাদুর স্বরূপ প্রকাশ করতেন মানুষকে এর অন্ধকার সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য।

কিন্তু যেহেতু ফেরেশতাদের কাছে এই জাদুকরী বিদ্যার চূড়ান্ত এবং নিখুঁত জ্ঞান ছিল, তাই ব্যাবিলনের ক্ষমতালোভী মানুষেরা দলে দলে তাদের কাছে ছুটে আসতে লাগল। ফেরেশতারা কাউকে ডেকে ডেকে পাপ করতে উৎসাহিত করতেন না; বরং কেউ তাদের কাছে জাদুবিদ্যা বা এর প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে এলে তারা তাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে দিতেন। তারা প্রতিটি মানুষকে আলাদাভাবে ডাকতেন, তাদের চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত গম্ভীর এবং ভারী কণ্ঠে বলতেন:

“শোনো, আমরা কিন্তু তোমাদের জন্য নিছক একটি পরীক্ষা স্বরূপ। আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন তোমাদের ইমান যাচাই করার জন্য। খবরদার! তুমি এই জাদু শিখে কুফরি করো না। সাময়িক ক্ষমতার লোভে নিজের অনন্তকালের আখেরাতকে বিক্রি করে দিও না।”

একবার ভাবুন তো দৃশ্যটা— দুজন পবিত্র ফেরেশতা স্বয়ং মানুষকে সতর্ক করছেন যে এটি শিখলে তুমি কাফের হয়ে যাবে, তোমার দুনিয়া ও আখেরাত ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর তো কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের ওই বিদ্যার ধারেকাছেও যাওয়ার কথা নয়। এভাবেই আল্লাহ মানুষকে সত্য উপলব্ধি করার এবং ইমান রক্ষার সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের ভেতরের লোভ বড় ভয়ংকর জিনিস। ফেরেশতাদের সেই ভয়ংকর সতর্কবাণী শোনার পরও মানুষ থেমে থাকল না। তারা হাসিমুখে নিজেদের ইমানকে বিক্রি করে দিল শয়তানের কাছে। তারা বলল, “আমাদের আখেরাত দরকার নেই, তুমি আমাদের বিদ্যা শেখাও।”

মানুষ যখন নিজ ইচ্ছায় সতর্কবাণী উপেক্ষা করে কুফরি করাকে বেছে নিত, তখনই কেবল হারুত আর মারুত আল্লাহর হুকুমে তাদের সেই পরীক্ষা নিতেন। কিন্তু জানেন কি? ব্যাবিলনের সেই মানুষেরা হারুত আর মারুতের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কোন জাদুটি শিখত? পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা সেই জাদুটি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে শিখত যা দিয়ে একজন স্বামী এবং তার স্ত্রীর মাঝে চরম বিচ্ছেদ ঘটানো যায়।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন, শয়তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো একটি হালাল এবং সাজানো সংসার ভেঙে দেওয়া। দুজন মানুষ যারা একে অপরকে প্রচণ্ড ভালোবাসে, জাদুর প্রভাবে হঠাৎ করেই তারা একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। স্বামীর চেহারা স্ত্রীর কাছে ভয়ংকর লাগতে শুরু করে, স্ত্রীর কথা স্বামীর কাছে বিষের মতো মনে হয়। কোনো কারণ ছাড়াই তাদের মাঝে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়, যার শেষ পরিণতি হয় ভয়াবহ ডিভোর্স বা বিচ্ছেদ। ব্যাবিলনের মানুষেরা অন্যের সুখ দেখতে পারত না; হিংসায় জ্বলে-পুড়ে তারা এই কালো জাদুর মাধ্যমে মানুষের সুন্দর পরিবারগুলোকে তছনছ করে দিতে লাগল। মানুষ বুঝতে পারল না যে অন্যের সংসার ভাঙতে গিয়ে তারা আসলে নিজেদের আখেরাতকে চিরতরে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করেছে।

সময় গড়িয়ে চলল। ব্যাবিলনের সেই ইতিহাস পার হয়ে পৃথিবী প্রবেশ করল আরেক নতুন যুগে। মদিনার বুকে তখন ইসলামের পবিত্র আলো ছড়িয়ে পড়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করেছেন। মদিনায় তখন ইহুদি পণ্ডিতদের বিশাল প্রভাব। তারা প্রাচীন কিতাব এবং ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানত, কিন্তু তাদের অন্তরে সত্যকে মেনে নেওয়ার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা ছিল না।

যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে ঘোষণা করলেন যে সুলাইমান আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী, তখন মদিনার ইহুদিরা তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠল। তারা মদিনার অলিতে-গলিতে রটিয়ে দিল— “দেখো মুহাম্মদের কথা! সে সুলাইমানকে নবীদের কাতারে শামিল করছে। অথচ সুলাইমান তো ছিল একজন জাদুকর, সে তো জাদু দিয়েই সব নিয়ন্ত্রণ করত।”

তাদের এই চরম ধৃষ্টতা এবং একজন সম্মানিত নবীর ওপর এমন জঘন্য অপবাদের পরই আসমান আর চুপ থাকল না। সুলাইমান আলাইহিস সালামের সম্মান রক্ষা করতে এবং ইহুদিদের মুখোশ উন্মোচন করতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মদিনার বুকে জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে নাজিল করলেন সূরা আল-বাকারার সেই ঐতিহাসিক ১০২ নম্বর আয়াত

আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করলেন:

তারা ওই জিনিসের অনুসরণ করেছে যা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। অথচ সুলাইমান কখনো কুফরি করেনি, বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারাই মানুষকে জাদু শেখাত।

এই একটি মাত্র আয়াত যেন আসমান থেকে বজ্রপাতের মতো এসে মদিনার ইহুদিদের সমস্ত অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য সুলাইমান আলাইহিস সালামের পবিত্র চরিত্রকে জাদুর মতো জঘন্য অপবাদ থেকে চিরতরে মুক্ত করে দিলেন। আল্লাহ এই আয়াতে হারুত আর মারুতের ঘটনাও তুলে ধরলেন। জানিয়ে দিলেন যে ব্যাবিলনে সেই ফেরেশতারা কাউকে জাদুতে বাধ্য করেনি, বরং তারা বারবার সতর্ক করেছিল। কিন্তু মানুষ জেনে-বুঝে নিজেদের ইমান ধ্বংস করেছে।

সবশেষে মহান আল্লাহ এই আয়াতে মানবজাতির জন্য অত্যন্ত গভীর এবং শক্তিশালী একটি মেসেজ দিলেন যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনের জন্য রক্ষাকবচ। আল্লাহ জাদুবিদ্যা সম্পর্কে কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন:

তারা এই জাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাত ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর হুকুম ছাড়া তারা এই জাদুর মাধ্যমে কারও বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে সক্ষম ছিল না।

এই আয়াতটি আমাদের ইসলামি আকিদার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিক কোনো স্বাধীন ঐশী ক্ষমতা নয়। জাদুকর চাইলেই কাউকে ধ্বংস করতে পারে না। জাদু হলো নিছক একটি মাধ্যম বা টুল। একটি ছুরি যেমন নিজে থেকে কাউকে কাটতে পারে না যতক্ষণ না আল্লাহ সেই কাটার নিয়তি নির্ধারণ করেন, ঠিক তেমনি দুনিয়ার সমস্ত জাদুকর মিলেও কোনো মানুষের এক চুল পরিমাণ ক্ষতি করতে পারবে না যদি না আল্লাহ তায়ালা সেই বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য অনুমতি দেন।

এখানে আপনার মনে একটি গভীর প্রশ্ন জাগতে পারে, জাদুর মাধ্যমে তো মানুষকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়। তাহলে মহান আল্লাহ কেন এমন জঘন্য জিনিসকে কাজ করার অনুমতি দেন? আল্লাহ কি জাদুকে কবুল করেন? না, আল্লাহ জাদুকে কখনোই কবুল বা পছন্দ করেন না। আল্লাহ একে জঘন্য কুফরি বলেছেন। কিন্তু এই দুনিয়া হলো পরীক্ষার জায়গা। একজন খুনি যখন ছুরি দিয়ে কোনো নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, আল্লাহ কি সেই খুনকে পছন্দ করেন? একেবারেই না। কিন্তু আল্লাহ সেই ছুরিটিকে কাটার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। খুনি তার ইচ্ছা ব্যবহার করে জাহান্নামী হয়, আর যে নিরীহ মানুষটি মারা যায়, আল্লাহ তার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন এবং পরকালে তাকে অসীম পুরস্কারে ভূষিত করেন। এই মহাবিশ্বের চরম এবং চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক কেবল একজনই— তিনি হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা।

এই পর্যায়ে ব্যাবিলনের সেই হারুত এবং মারুতের ঘটনা নিয়ে আপনাদের মনে একটি খটকা লাগতে পারে। আপনাদের মনে হতে পারে, ফেরেশতা হয়েও তারা কেন মানুষকে এমন কুফরি বিদ্যা শেখাতেন? মানুষ যখন নিজ ইচ্ছায় সতর্কবাণী উপেক্ষা করে কুফরি করাকে বেছে নিত, তখনই কেবল ফেরেশতারা তাদের পরীক্ষা নিতেন। বিষয়টি একদম সহজে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি:

ধরুন, সমাজে জাল নোট বা নকল টাকার খুব ছড়াছড়ি। আসল টাকা আর নকল টাকার পার্থক্য সাধারণ মানুষ কিছুতেই বুঝতে পারছে না। তখন সরকার থেকে একজন অফিসার এসে মানুষকে শেখালেন— “দেখুন, জাল নোট ঠিক এভাবে তৈরি হয়, এর ভেতরে এই এই জিনিস থাকে। আমি আপনাদের কেবল চেনার জন্য বিষয়টি শেখাচ্ছি যাতে প্রতারকদের ভণ্ডামি থেকে আপনারা বাঁচতে পারেন। কিন্তু খবরদার! আপনারা নিজেরা যেন জাল নোট বানাতে যাবেন না, তাহলে কিন্তু চরম শাস্তি পাবেন।”

এখন কেউ যদি জাল নোট চেনার উপায় শিখে সেটা কাজে লাগিয়ে নিজেই জাল নোট ছাপানো শুরু করে, তবে কি সেই অফিসারের কোনো দোষ আছে? একেবারেই না। হারুত-মারুতের বিষয়টিও ঠিক এইরকম ছিল। সেই সময় ব্যাবিলনে জাদুকরদের এতই দাপট ছিল যে মানুষ জাদুকে আল্লাহর দেওয়া মুজেজা বা অলৌকিক ক্ষমতা ভাবতে শুরু করেছিল। তাই আল্লাহ ওই দুজন ফেরেশতাকে পাঠিয়েছিলেন জাদুর আসল রূপ উন্মোচন করতে। তারা মানুষকে জাস্ট পার্থক্যটা বোঝাতেন। কিন্তু কাউকে কিছু শেখানোর আগে তারা কঠোরভাবে সতর্ক করে বলতেন—

“আমরা তো কেবল একটি পরীক্ষা মাত্র, কাজেই তুমি এটি শিখে কুফরি করো না।”

কিন্তু মানুষ যখন চরম জেদ ধরে তাদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করত, তখন ফেরেশতারা জাদুর জ্ঞান দিতেন ঠিকই; কিন্তু মানুষ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সেই জ্ঞানকে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা মানুষের ক্ষতির কাজে ব্যবহার করত। আল্লাহ তাদের পথভ্রষ্ট করেননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছিল।

সম্মানিত দর্শক, হারুত-মারুত এবং ব্যাবিলনের সেই ইতিহাস সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। এই ইতিহাস আজ হাজার বছর পরও আমাদের সমাজের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। ব্যাবিলনের সেই লোভী মানুষগুলো যারা ইমানের বিনিময়ে জাদু শিখেছিল, তারা দুনিয়াতে হয়তো সাময়িক কিছু ক্ষমতা পেয়েছিল, অন্যের ক্ষতি করে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিল; কিন্তু তাদের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? পবিত্র কোরআন স্পষ্ট বলছে, আখেরাতে বা পরকালে তাদের জন্য বিন্দুমাত্র কোনো অংশ নেই, তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

আজকের এই আধুনিক যুগেও একটু খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের সমাজ থেকে এই অন্ধকার পুরোপুরি মুছে যায়নি। আজও মানুষ সামান্য কিছু দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য, ব্যবসায় অন্যকে ঠকাতে, সম্পত্তির লোভে কিংবা অন্যের সুন্দর একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে ছুটে যায় বিভিন্ন ভণ্ড জাদুকর, গণক বা কুফরি তাবিজ-কবজকারীদের কাছে। তারা ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে অন্যের খাবারে, ঘরে বা ব্যবসায় কালো জাদু প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সূরা বাকারার এই আয়াত আমাদের এক চরম সত্য শিক্ষা দেয়— জাদুকর বা শয়তানের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।

স্বয়ং আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জাদু করা হয়েছিল। তিনি আসমানের দিকে হাত তুলেছিলেন, আল্লাহ তাকে শিখিয়েছিলেন সূরা ফালাক এবং সূরা নাস। তাই আপনার জীবনে যদি কখনো এমন কোনো অস্বাভাবিক সমস্যা আসে, ব্যবসায় হঠাৎ ধস নামে কিংবা পরিবারে অকারণ অশান্তি দেখা দেয়, তবে কোনো গণক বা জাদুকরের কাছে গিয়ে নিজের ইমান হারাবেন না। মনে রাখবেন, যে অন্যের ক্ষতি করার জন্য জাদুর আশ্রয় নেয়, সে আসলে আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করে এবং ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।

তাই প্রাচীন ব্যাবিলন থেকে শুরু করে আজকের এই আধুনিক সমাজ, জাদুর অন্ধকার যেখানেই থাকুক না কেন, এর থেকে বাঁচার একমাত্র ঐশী ঢাল স্বয়ং আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়ে গেছেন। সকাল-সন্ধ্যার জিকির, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ফালাক ও নাস হলো জাদুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। মানুষ হিসেবে আমরা বড়ই দুর্বল। দুনিয়ার ব্যস্ততায় হয়তো আমরা অনেকেই সবসময় এই আমলগুলো নিখুঁতভাবে ধরে রাখতে পারি না, অনেক সময় গাফেল হয়ে যাই। কিন্তু তারপরেও আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আনকাবুতের ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ আমাদের এক চরম সত্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন— শয়তান এবং তার দোসরদের সমস্ত চক্রান্ত মূলত মাকড়সার জালের চেয়েও দুর্বল। প্রয়োজন শুধু মহান রবের ওপর একবিন্দু খাঁটি তাওয়াক্কুল বা ভরসা।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুর্বলতা কাটিয়ে এই আমলগুলো করার এবং সব ধরনের কালো জাদুর প্রভাব থেকে হেফাজতে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Reporter

mamunphf@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *