এক বাগান মালিকের করুন কাহিনী যা পবিত্র কোরআনে বর্ণীত হয়েছে।

না, এটি কোনো সাধারণ বস্তু নয়। এটি সৃষ্টির ঊষালগ্নে মহান রবের প্রথম সৃষ্টি—সেই মহিমান্বিত কলম। সৃষ্টির পরেই আল্লাহ সেই কলমকে আদেশ করলেন, “লেখো।” কলম ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে প্রশ্ন করল, “হে আমার রব, আমি কী লিখব?” আল্লাহ বললেন, “কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তার সবকিছু লিখে ফেলো।”

সেই মুহূর্ত থেকে কলম চলতে শুরু করল। আর লাওহে মাহফুজে লেখা হয়ে গেল প্রতিটি মানুষের ভাগ্য, প্রতিটি গাছের পাতার ঝরে পড়া আর আজকের এই মুহূর্তে আপনার এই ভিডিওটি দেখা—সবকিছুই।

কিন্তু জানেন কি, পবিত্র কুরআনের একটি বিশেষ সূরা এই মহান কলমের শপথ করেই শুনিয়েছিল এক হাড়হিম করা ঘটনার কথা। এক রাতে—হ্যাঁ, মাত্র এক রাতে কীভাবে একদল অহংকারী কোটিপতি ভাই পথের ভিখারিতে পরিণত হলো? কেন তাদের সযত্নে গড়ে তোলা বিশাল ফলের বাগানটি চোখের পলকে পুড়ে কয়লা হয়ে গেল? তারা কি কোনো ভুল করেছিল, নাকি তাদের ধ্বংসের পেছনে ছিল কোনো অদৃশ্য শক্তি?

আর কেনই বা মক্কার কাফেররা আমাদের প্রিয় নবীজিকে পাথর দিয়ে নয়, তলোয়ার দিয়ে নয়, বরং নিজেদের চোখের বিষাক্ত দৃষ্টি দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল? কী সেই রহস্যময় বদনজর বা ইভিল আই (Evil Eye), যা আজও মানুষকে ধ্বংস করতে পারে? আর কেনই বা আল্লাহ নবীজির চরিত্রকে ‘খুলুকুন আজিম’ বা মহত্তম চরিত্র বলে ঘোষণা দিলেন?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আপনারা দেখছেন মুসাফিরের আলো। আজকের ভিডিওতে আমরা উন্মোচন করব সূরা আল কলমের সেই বিস্ময়কর ইতিহাস, যেখানে মিশে আছে কলমের শপথ, এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাগানের কান্না আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বের সনদ।

মূল ঘটনায় ডুব দেওয়ার আগে এখনই আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে পাশে থাকা বেল আইকনটি বাজিয়ে দিন, যাতে ইসলামের এমনই লোমহর্ষক এবং অজানা ইতিহাস সবার আগে আপনার কাছে পৌঁছায়।

চলুন, আমরা সময়ের চাকা ঘুরিয়ে ফিরে যাই আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগের মক্কায়। নবুওয়াতের শুরুর দিকের সময়। মক্কার পরিবেশ তখন আজকের মতো ছিল না। চারদিকে ধূসর পাহাড় আর তপ্ত মরুভূমি। সূর্যের প্রখর তাপে পাথরগুলো যেন আগুনের মতো জ্বলত। কিন্তু সেই তপ্ত পাথরের চেয়েও বেশি উত্তপ্ত ছিল মক্কার সামাজিক পরিবেশ।

মক্কার আকাশ-বাতাস তখনও শিরকের অন্ধকারে আচ্ছন্ন। পবিত্র কাবার চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি। আর সমাজের নেতৃত্বে ছিল কুরাইশ বংশের বড় বড় সর্দাররা—আবু জাহেল, ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, উমাইয়া ইবনে খালাফ এবং আস ইবনে ওয়াইল। এদের কাছে ক্ষমতা ছিল, অর্থ ছিল, আর ছিল বংশ মর্যাদার প্রচণ্ড অহংকার। তারা মনে করত এই পৃথিবী এবং সমাজ তাদের আঙুলের ইশারাতেই চলবে।

হঠাৎ করেই আব্দুল্লাহর এতিম সন্তান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদের ডাক দিলেন। তিনি সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।” এই একটি বাক্য মক্কার নেতাদের ক্ষমতার মসনদে ভূমিকম্প সৃষ্টি করল। তারা বুঝতে পারল যদি সাধারণ মানুষ এই এক আল্লাহর ইবাদত শুরু করে, তাহলে তাদের মূর্তিপূজার রমরমা ব্যবসা, তাদের সর্দারি আর বংশ গৌরব সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

লাত, মানাত আর উজ্জার কসম খেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল যেকোনো মূল্যে এই নতুন দ্বীনকে থামাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো তারা চাইলেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শারীরিকভাবে হত্যা করতে পারছিল না। কারণ মক্কার সমাজে গোত্র প্রথা ছিল খুব শক্তিশালী। নবীজির বংশ বনু হাশিম ছিল অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী। আবু তালিবের জীবদ্দশায় নবীজির গায়ে হাত তোলা মানে পুরো বনু হাশিমের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তাই কুরাইশ নেতারা বেছে নিল এক ভিন্ন এবং জঘন্য পথ—সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার (Psychological Warfare) বা মানসিক নির্যাতন এবং চরিত্র হনন।

মক্কার দারুন নদওয়ায় তারা শলাপরামর্শ করল। তারা বলাবলি করতে লাগল, মুহাম্মদ যা বলছে এই কুরআনের ভাষা তো সাধারণ কোনো মানুষের কথা হতে পারে না। এর ছন্দ, এর গাম্ভীর্য আমাদের কবিদের চেয়েও উন্নত। তাহলে উপায় কী? শয়তানি বুদ্ধি বের হলো তাদের মাথা থেকে। তারা সিদ্ধান্ত নিল নবীজিকে সামাজিকভাবে বয়কট করার জন্য তাকে পাগল প্রতিপন্ন করতে হবে।

তারা মক্কার অলিগলিতে, হাটে-বাজারে প্রচার করতে লাগল যে তিনি একজন মজনুন বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি—নাউজুবিল্লাহ। তারা বলতে লাগল নিশ্চয়ই তাকে কোনো জিনে আছর করেছে, তাই সে উল্টোপাল্টা কথা বলছে। যখনই রাসূলুল্লাহ কাবার চত্বরে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতেন, কাফেররা বক্রদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাত। তাদের চোখের চাহনি এতটাই হিংসাত্মক আর ঘৃণাভরা ছিল যে মনে হতো তারা দৃষ্টি দিয়েই নবীজিকে গিলে ফেলবে অথবা আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে। সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষ ছড়াচ্ছিল ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। সে ছিল মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি। তার অনেক সন্তান, অঢেল সম্পদ আর তায়েফ আর মক্কার মাঝখানে বিশাল ফলের বাগান ছিল। সে অহংকার করে বলত, “আমি যদি ভুল পথে থাকতাম তাহলে আল্লাহ আমাকে এত সম্পদ কেন দিয়েছেন? আমি দুই শহরের মহান নেতা আর মুহাম্মদ, সে তো এতিম, নিঃস্ব। যদি নবুওয়াত আসতই, তাহলে আমার মতো ধনী লোকের ওপর আসত।”

চিন্তা করুন আমাদের প্রিয় নবীজির মানসিক অবস্থার কথা। যিনি ছিলেন আল আমিন বা বিশ্বাসী, যিনি মানুষের উপকারের জন্য নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিচ্ছিলেন, তাকেই শুনতে হচ্ছে তিনি নাকি পাগল। তিনি রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মানুষ ফিসফিস করে, হাসাহাসি করে। তিনি কষ্ট পান কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। এই মানসিক যন্ত্রণা, এই একাকীত্ব যখন চরম পর্যায়ে, ঠিক তখনই জিব্রাইল আলাইহিস সালাম নিয়ে আসলেন আসমানি সান্ত্বনা। আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবিবের মনকে শান্ত করার জন্য এবং কাফেরদের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার জন্য নাযিল করলেন সূরা আল কলম।

চলুন, আমরা এবার ওই ঘটনাটিতে ফিরে যাই যার কথা আল্লাহ সূরা আল কলমে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা মক্কার কাফেরদের, বিশেষ করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা এবং তার মতো ধনীদের সতর্ক করার জন্য এই সূরায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বা দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন। এটি হলো আসহাবুল জান্নাহ বা বাগানের মালিকদের কাহিনী। এটি কোনো রূপকথা নয়, এটি ছিল পূর্ববর্তী যুগের একটি সত্য ঘটনা যা মক্কার মানুষের কাছেও কিছুটা পরিচিত ছিল।

তাফসিরবিদগণ বলেন, ইয়েমেনের সানা শহরের অদূরে দাওয়ান নামক এলাকায় এক নেককার বৃদ্ধ বাস করতেন। আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে প্রচুর নিয়ামত দিয়েছিলেন। তার ছিল এক বিশাল ফলের বাগান। আঙুর, খেজুর আর নানা রকম শস্যে ভরা ছিল সেই বাগান। বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে যেত ঝরনা। এই বৃদ্ধ ব্যক্তিটি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও আল্লাহভীরু। যখনই বাগানের ফসল ওঠার সময় হতো, তিনি ঘোষণা দিয়ে দিতেন। গরিব-মিসকিনরা দল বেঁধে আসত। তিনি নিজের এবং পরিবারের সারা বছরের খরচ রেখে বাকিটা অকাতরে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ফলে আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দিতেন, বাগান সবসময় ফলে ভরে থাকত। মিসকিনরা জানত এই বাগানের ফসল উঠলে তাদের আর না খেয়ে থাকতে হবে না।

কিন্তু একদিন সেই নেককার বৃদ্ধ মারা গেলেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার মৃত্যুর পর বাগানের মালিকানা পেল তার ছেলেরা। ছেলেরা ছিল বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। বাবার মৃত্যুর পর তারা এক গোপন বৈঠকে বসল। এক ভাই বলল, “আমাদের বাবা তো বোকা ছিলেন। তিনি সব সম্পদ গরিবদের দিয়ে দিতেন। এভাবে দিলে তো আমাদের সম্পদ কমে যাবে। আমরা তো আর বাবার মতো নই, আমাদের নিজেদেরই অনেক খরচ, আমাদের ভবিষ্যৎ আছে।” শয়তান তাদের কানে কুমন্ত্রণা দিল, তাদের অন্তরে লোভের আগুন জ্বলে উঠল। তারা প্রতিজ্ঞা করল, আল্লাহর কসম, এ বছর আমরা ফসলের একটা দানাও গরিবদের দেব না। সব ফসল আমরা নিজেরা ভোগ করব এবং বিক্রি করে মক্কার সবচেয়ে ধনী হব।

সেদিন রাতে তারা যখন আরামের ঘুমে আচ্ছন্ন, স্বপ্নের জালে বিভোর, তখন মহান রবের পক্ষ থেকে এক ভয়াবহ আজাব নিঃশব্দে নেমে এল। আকাশ থেকে আগুনের এক ঝড় বা অদৃশ্য টর্নেডো সেই বাগানের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। যে বাগানটি ছিল সবুজ শ্যামল, রসে টলটলে ফলে পরিপূর্ণ, নিমিষেই তা পুড়ে কালো কয়লার মতো হয়ে গেল। মনে হলো যেন অমাবস্যার নিকষ কালো রাত সেখানে স্থায়ী হয়ে গেছে। বাগানের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাতা ভস্ম হয়ে মাটিতে মিশে গেল। সবুজের চিহ্নমাত্র রইল না। কিন্তু অহংকারী ভাইয়েরা এর কিছুই জানতে পারল না।

পরের দিন খুব ভোরে তারা ঘুম থেকে উঠল। একে অপরকে ফিসফিস করে ডাকল, “চলো চলো, জলদি চলো, দেরি করলে মিসকিনরা জেগে যাবে।” তারা খুব সাবধানে পা ফেলে বাগানের দিকে এগোতে লাগল। তাদের মনে তখন খুশির জোয়ার, আজ তারা সব সম্পদের একক মালিক হবে। পথিমধ্যে তারা নিচু স্বরে বলাবলি করছিল, “খুব সাবধান, আজ যেন কোনো ফকির আমাদের কাছে ভিড়তে না পারে। আজ আমরা কঠোর হব।”

কিন্তু যখন তারা বাগানের সীমানায় পৌঁছাল, তারা থমকে দাঁড়াল। তাদের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সামনে তাকিয়ে তারা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কোথায় সেই সবুজ বাগান? কোথায় সেই ঝুলন্ত আঙুরের থোকা? সামনে শুধু পোড়া মাটি আর ছাই। সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে কালো ছাই। প্রথমে তারা ভাবল হয়তো তারা অন্ধকারে রাস্তা ভুল করেছে। তারা বলল, “না না, এটা আমাদের বাগান হতে পারে না। আমরা নিশ্চয়ই পথ হারিয়ে অন্য কোথাও চলে এসেছি। আমাদের বাগান তো ছিল জান্নাতের মতো সুন্দর।” কিন্তু যখন তারা আশেপাশের পাহাড় আর চিহ্নগুলো দেখল, তখন তাদের ভুল ভাঙল। তারা বুঝতে পারল এটাই তাদের সেই শখের বাগান। মুহূর্তের মধ্যে তাদের সব অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। তারা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। চিৎকার করে বলে উঠল, “হায়! আমরা তো কপালপোড়া, আমরা তো সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি! আমরা মিসকিনদের বঞ্চিত করতে চেয়েছিলাম আর আল্লাহ আমাদেরই সবকিছু থেকে বঞ্চিত করলেন।”

তাদের মধ্যে সেই মেজো ভাইটি যে তাদের আগেই সতর্ক করেছিল, সে তখন বলল, “আমি কি তোমাদের বলিনি আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করতে? আমি কি বলিনি বাবার পথ অনুসরণ করতে? কিন্তু তোমরা আমার কথা শোনোনি। এখন দেখো আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার ফল।”

তখন সেই ভাইয়েরা একে অপরকে দোষারোপ করতে লাগল। কিন্তু তখন আর দোষারোপ করে কোনো লাভ ছিল না। তাদের কৃপণতা, অহংকার আর গরিবদের হক নষ্ট করার মানসিকতা তাদের সম্পদকে এক রাতেই ভস্ম করে দিয়েছে। আল্লাহ এই ঘটনাটি মক্কার কুরাইশদের শোনালেন। যেন তিনি বলছেন, “হে মক্কার নেতারা, হে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, তোমরা তোমাদের সম্পদ আর সন্তান নিয়ে অহংকার করছো? তোমরা মনে করছো এই নিয়ামত চিরস্থায়ী? ইয়েমেনের সেই বাগানের মালিকদের মতো তোমাদেরও যেকোনো মুহূর্তে ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে। সম্পদ সম্মান আনে না, সম্মান আনে আল্লাহর আনুগত্য।”

সেই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হলো সূরা আল কলমের সেই তেজদীপ্ত এবং অলৌকিক আয়াতগুলো। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম যখন এই আয়াতগুলো নিয়ে নবীজির কাছে আসছিলেন, তখন প্রতিটি শব্দ ছিল মক্কার কাফেরদের জন্য চাবুক আর মুমিনদের জন্য রহমতের ঢাল স্বরূপ। আল্লাহ শুরু করলেন একটি রহস্যময় হরফ দিয়ে— ‘নূন’। এর পরেই তিনি সেই আদি সৃষ্টির শপথ নিলেন, “শপথ কলমের এবং সেই বিষয়ের যা তারা লেখে রাখে।”

আল্লাহ এখানে কলমের শপথ করে বললেন, “হে নবী, আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।” সুবহানাল্লাহ! দৃশ্যটি চিন্তা করুন, মক্কার সব বড় বড় নেতা, সমাজপতিরা যখন নবীজিকে পাগল বলে উপহাস করছে, তখন স্বয়ং মহাবিশ্বের রব সাত আসমানের ওপর থেকে ঘোষণা দিচ্ছেন— আপনি পাগল নন। এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট, এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী হতে পারে? মানুষের কথার কী মূল্য আছে যখন আল্লাহ নিজে আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেন।

এরপর আল্লাহ নবীজির চরিত্রের সর্বোচ্চ সনদ দিলেন। আল্লাহ বললেন, ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আজিম অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” অর্থাৎ কাফেররা যতই গালি দিক, আপনার ব্যবহার, আপনার ধৈর্য, আপনার সত্যতা, আপনার ক্ষমাশীলতা— এগুলোই প্রমাণ করে আপনি শ্রেষ্ঠ। কোনো পাগল বা জাদুকরের চরিত্র এত নিষ্কলঙ্ক হতে পারে না।

এরপর আল্লাহ মক্কার সেই সর্দার, বিশেষ করে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা আর তার মতো পাপিষ্ঠ নেতাদের মুখোশ খুলে দিলেন। তাদের বাহ্যিক আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নোংরা চরিত্রগুলো আল্লাহ এক এক করে উন্মোচন করলেন। আল্লাহ নবীজিকে বললেন, “হে নবী, আপনি তার কথা শুনবেন না যে বেশি বেশি শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে পেছনে নিন্দা করে, যে একের কথা অন্যের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, যে ভালো কাজে বাধা দেয়, যে সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাবের।”

এবং সবশেষে আল্লাহ তার বংশ পরিচয় নিয়ে এমন একটি শব্দ ব্যবহার করলেন যা তাদের অহংকারের মূলে কুঠারাঘাত করল। আল্লাহ বললেন, সে ‘জানিম’ অর্থাৎ কুখ্যাত বা নিচু বংশীয়। তাফসিরকারিগণ বলেন, এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সেই কাফের নেতা তার মায়ের কাছে গিয়ে সত্য জানতে চেয়েছিল এবং লজ্জিত হয়েছিল।

কুরআনের এই আয়াতগুলো যখন নাজিল হলো, কাফেরদের অন্তরে তা তীরের মতো বিদ্ধ হলো। তারা বুঝতে পারল যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে লড়াই করা মানে কোনো মানুষের সাথে লড়াই করা নয়, বরং স্বয়ং আসমানের মালিকের সাথে লড়াই করা। বাগানের মালিকদের পরিণতির দিকে তাকান, যখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল তখন তাদের অহংকার চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তারা বলেছিল, “হে আমাদের রব, আমরা সীমালঙ্ঘনকারী ছিলাম। হয়তো আমাদের রব আমাদের এর চেয়ে ভালো কিছু দান করবেন।”

তাফসিরের বিভিন্ন বর্ণনায় আর ঐতিহাসিক রেওয়াতে পাওয়া যায়, তাদের এই তওবা ছিল অত্যন্ত খাঁটি। তারা তাদের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে নত হয়েছিল। আর যারা আল্লাহর কাছে নত হয়, আল্লাহ তাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। স্কলারগণ বলেন, তাদের খাঁটি তওবার কারণে আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের দুনিয়া আর আখেরাতে উত্তম প্রতিদান দিয়েছিলেন। কিন্তু মক্কার অহংকারী নেতারা? তাদের অনেকেই অহংকার ছাড়তে পারেনি। আবু জাহেল, উমাইয়া ইবনে খালাফ— এরা সত্য চেনার পরেও অহংকার করে বদরের প্রান্তরে লাঞ্ছিত হয়ে মারা গেছে।

প্রিয় দর্শক, এই সূরা এবং বাগানের ঘটনা থেকে আজ আমাদের জন্য শিক্ষার বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে।

  • প্রথমত: আমাদের সম্পদ, ক্ষমতা, মেধা বা সৌন্দর্য— এ সবই আল্লাহর দান। এগুলো আমাদের অর্জন নয়, বরং পরীক্ষা। যদি আমরা এগুলো দিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করি, গরিবের হক আদায় না করি, তাহলে আসহাবুল জান্নাহর মতো আমাদের সব অর্জন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। কৃপণতা সম্পদ বাড়ায় না, বরং সম্পদ ধ্বংসের কারণ হয়। আর দান কখনো সম্পদ কমায় না।
  • দ্বিতীয়ত: মহান চরিত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র ছিল ‘খুলুকিন আজিম’। আজ আমরা যারা দ্বীনের পথে চলি, আমাদের অনেকেই সামান্য সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। কেউ একটু কটু কথা বললেই আমরা রেগে যাই। অথচ নবীজিকে পাগল বলা হয়েছে, জাদুকর বলা হয়েছে, তবুও তিনি গালি দেননি। পাথর খেয়েও দোয়া করেছেন। আমাদেরও সেই মহান চরিত্রের অনুসরণ করতে হবে। মানুষের কথায় কান না দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অটল থাকতে হবে।
  • তৃতীয়ত: ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল। এই সূরার শেষের দিকে আল্লাহ নবীজিকে মাছের পেটে থাকা ইউনুস আলাইহিস সালামের প্রসঙ্গ এনে অধৈর্য হতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ দ্বীনের পথে বা জীবনের যেকোনো পরীক্ষায় তাড়াহুড়ো করা যাবে না। রবের ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিপদ আসবেই, কিন্তু ধৈর্যের ফল সবসময় মিষ্টি হয়।

সবশেষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই। সূরার একদম শেষের আয়াতে বলা হয়েছে, কাফেররা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে নবীজিকে আছড়ে ফেলবে। এখান থেকেই বদনজর বা কুদৃষ্টির সত্যতা প্রমাণিত হয়। হিংসুটে মানুষের দৃষ্টি আসলেই মানুষকে অসুস্থ বা ধ্বংস করতে পারে। তাই আমাদের উচিত সবসময় নিজের রূপ, সম্পদ বা সন্তানের ছবি প্রদর্শনে সতর্ক থাকা এবং নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার দোয়া আর আয়াতুল কুরসি পাঠ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

আসুন, আমরা আমাদের কলমকে, আমাদের জ্ঞানকে এবং আমাদের সম্পদকে সত্যের পথে ব্যবহার করি। আমরা যেন সেই বাগানের মালিকদের মতো না হই, বরং আমরা যেন হই সেই মহান চরিত্রের মানুষটির প্রকৃত অনুসারী। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ‘খুলুকিন আজিম’-এর ছায়াতলে জীবন গড়ার তৌফিক দিন। আমিন।

Reporter

mamunphf@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *