ইসলামী পরকালবিদ্যা বা এস্ক্যাটোলজি হলো মানব ইতিহাসের সূচনা থেকে সমাপ্তি এবং পরবর্তী অনন্ত জীবনের এক সুদীর্ঘ, গম্ভীর ও ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে এবং এর সমাপ্তি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত মহাগ্রন্থের চূড়ান্ত অধ্যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব জীবন হলো একটি পরীক্ষাক্ষেত্র মাত্র এবং পরকাল হলো সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশের চূড়ান্ত मंच। ঈমানের ছয়টি মূল ভিত্তির অন্যতম একটি হলো পরকালের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, যা একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনদর্শন, नैतिकता এবং কর্মধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই পুরো বিষয়ের বিস্তৃতি সৃষ্টির শেষ মুহূর্তের সামাজিক অবক্ষয় থেকে শুরু করে মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞ, হাশরের ময়দানের জবাবদিহিতা, কর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সবশেষে জান্নাত বা জাহান্নামে চিরস্থায়ী আবাসন পর্যন্ত বিস্তৃত।
শেষ জামানার সামাজিক অবক্ষয় ও ছোট আলামত
মহাবিশ্বের এই अंतিম যাত্রার প্রথম ধাপটি শুরু হয় মানুষের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাকে ছোট আলামত বা লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মানবসমাজে যখন ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব দেখা দেয়, মূর্খতা ও অজ্ঞতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ যখন স্রষ্টাকে ভুলে কেবল বস্তুগত সুখের পেছনে অন্ধ হয়ে ছোটে, তখনই শেষ জামানার সূচনা ঘটে। সমাজে আমানতদারিতা বা বিশ্বাসের যোগ্যতা হারিয়ে যায়, অযোগ্য ও পাপাচারী ব্যক্তিরা নেতৃত্বের আসনে উপবিষ্ট হয় এবং মানুষ ব্যভিচার, মদ্যপান ও জুয়াকে প্রগতি বা আধুনিকতার নামে বৈধতা দিতে শুরু করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদের ব্যাপক প্রচলন ঘটে, ফলে ধনী আরও ধনী হয় এবং দরিদ্র মানুষ চরম শোষণের শিকার হয়। এই সামাজিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি মানুষের মানসিকতার মধ্যেও এক বিরাট পরিবর্তন আসে, যেখানে মানুষ একে অপরের সাথে কেবল বৈষয়িক স্বার্থে সম্পর্ক রক্ষা করে এবং পারিবারিক বন্ধনগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সন্তান তার পিতামাতার অবাধ্য হয়, মায়ের সাথে দাসীর মতো আচরণ করা হয় এবং পিতা তার নিজের সন্তানকে শত্রু ভাবা শুরু করে। সমাজে খুনাখুনি, অন্যায় রক্তপাত এবং নৈরাজ্য এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, একজন হত্যাকারী নিজেও জানবে না সে কেন হত্যা করছে এবং যাকে হত্যা করা হচ্ছে সেও জানবে না তার অপরাধ কী ছিল। এই চরম সামাজিক অবক্ষয়ের একটি বড় বাহ্যিক রূপ হলো মানুষের দালানকোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতা, যেখানে রাখাল বা অতি সাধারণ দরিদ্র পরিবারের মানুষেরাও বিপুল অর্থের মালিক হয়ে একে অপরের চেয়ে উঁচু ও বিলাসবহুল অট্টালিকা তৈরিতে মেতে ওঠে। সময়ের গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যায়, একটি বছর একটি মাসের মতো, একটি মাস একটি সপ্তাহের মতো এবং একটি সপ্তাহ একটি দিনের মতো কেটে যায়, যার ফলে মানুষের জীবন থেকে বরকত ও স্থায়িত্ব উঠে যায়।
বড় আলামতের সূচনা ও ইমাম মাহদীর আগমন
এই সমস্ত ছোট ছোট লক্ষণগুলো যখন সমাজে পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে যাবে এবং পৃথিবী এক অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত হবে, তখনই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত সমাপ্তির ঘণ্টা বাজাতে বড় বড় অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃতিক আলামতগুলো একের পর এক আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করবে। বড় আলামতগুলোর আগমন ঘটবে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, যেমন একটি মালার সুতো কেটে গেলে তার ভেতরের পুঁতিগুলো যেভাবে টুপটাপ করে পরপর পড়ে যায়, ঠিক সেভাবে। এই মহাজাগতিক ও অলৌকিক লক্ষণগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ political ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম মাহদী, যিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বংশধারা থেকে আগমন করবেন। যখন পৃথিবীতে জুলুম, অত্যাচার ও অন্যায় এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে কোনো মানুষের পক্ষে সাধারণ উপায়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হবে, ঠিক তখনই আল্লাহ তাআলা ইমাম মাহদীকে পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠাবেন। তিনি মক্কা ও মদিনা থেকে তাঁর দাওয়াত শুরু করবেন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এক পতাকার নিচে এনে পৃথিবীতে পুনরায় ইসলামী খেলাফত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁর শাসনামলে পৃথিবী দীর্ঘকাল পর সত্য ও ন্যায়ের আলোয় আলোকিত হবে এবং মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে।
দাজ্জালের ফিতনা ও হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ
কিন্তু এই শান্তির মাঝেই মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক ফিতনা বা পরীক্ষার আবির্ভাব ঘটবে, যাকে দাজ্জাল বা মিথ্যা মসীহ বলা হয়। দাজ্জাল হবে একজন মানুষ, যার ডান চোখটি অন্ধ ও ফোলা আঙুরের মতো থাকবে এবং তার কপালে স্পষ্ট অক্ষরে কাফির বা অবিশ্বাসী লেখা থাকবে যা কেবল প্রকৃত মুমিনরাই পড়তে পারবে। আল্লাহ তাআলা দাজ্জালকে এক বিশাল ও অলৌকিক পরীক্ষা হিসেবে পৃথিবীতে পাঠাবেন, যাকে মৃত মানুষকে জীবিত করার ভান করা, বৃষ্টি নামানো, মাটির নিচ থেকে गुप्तধন বের করা এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অতি দ্রুত যাতায়াত করার মতো কিছু বাহ্যিক ক্ষমতা দেওয়া হবে। সে নিজেকে ঈশ্বর বা প্রভু বলে দাবি করবে এবং পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে দুর্বল ঈমানের অধিকারী নারী ও পুরুষেরা তার এই চমৎকারিত্ব দেখে বিভ্রান্ত হয়ে তাকে সিজদা করবে এবং তার অনুসারী হয়ে যাবে। দাজ্জালের এই ভয়াবহ ফিতনা ও অত্যাচারের কারণে পৃথিবীতে যখন ঈমানদারদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে এবং তারা সিরিয়ার দামেস্কের এক মসজিদে অবরুদ্ধ হয়ে থাকবে, ঠিক তখনই আল্লাহর হুকুমে আকাশ থেকে অলৌকিক অবতরণ ঘটবে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের। তিনি দুজন ফেরেশতার ডানায় ভর করে দামেস্কের শ্বেত মিনারের ওপর অবতীর্ণ হবেন এবং ইমাম মাহদীর সাথে মিলিত হয়ে দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। লুদ নামক স্থানে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের মুখোমুখি হওয়া মাত্রই দাজ্জাল পানিতে লবণ গলে যাওয়ার মতো গলতে শুরু করবে এবং ঈসা আলাইহিস সালাম তাকে নিজের বল্লম দিয়ে আঘাত করে হত্যা করবেন।
ইয়াজুজ-মাজুজের উপদ্রব ও সোনালী যুগ
দাজ্জালের মৃত্যুর পর পৃথিবীতে তার অনুসারী ও সমস্ত অশুভ শক্তির পতন ঘটবে এবং মানবজাতি এক নতুন যুগে পদার্পণ করবে। কিন্তু এই শান্তির পরপরই আরেকটি বিশাল পরীক্ষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে ইয়াজুজ ও মাজুজ নামক এক অতি প্রাচীন, বিশালাকার ও ধ্বংসাত্মক মানব জাতি। এই জাতিটি সুপ্রাচীনকাল থেকে যুলকারনাইন নামক এক ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর তৈরি করা লোহা ও তামার এক সুদৃঢ় প্রাচীরের পেছনে বন্দি রয়েছে এবং তারা প্রতিদিন সেই প্রাচীর কাটার চেষ্টা করে। আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে তারা সেই প্রাচীর ভেঙে পিঁপড়ের পালের মতো দলে দলে পাহাড়ের ওপর থেকে উপত্যকায় নেমে আসবে এবং তাদের যাত্রাপথে যা কিছু পাবে তা ধ্বংস করে ফেলবে। তারা তাবারিয়া হ্রদের সমস্ত পানি পান করে শেষ করে ফেলবে এবং তাদের বিশাল সংখ্যার কারণে পৃথিবীতে তীব্র খাদ্য ও পানির সংকট দেখা দেবে। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গী মুমিনরা আল্লাহর নির্দেশে তূর পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন এবং আল্লাহর কাছে এই ভয়াবহ আজাব থেকে মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করবেন। আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়ার বরকতে ইয়াজুজ ও মাজুজের ঘাড়ে এক ধরণের মহামারী বা কীটের সৃষ্টি করবেন, যার ফলে তারা সবাই একসাথে এক রাতের মধ্যে মারা যাবে এবং পুরো পৃথিবী তাদের মৃতদেহে ঢেকে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যা পৃথিবীর বুক থেকে তাদের সমস্ত অবশিষ্টাংশ ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে এবং মাটি পুনরায় অত্যন্ত উর্বর ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এই ঘটনার পর পৃথিবীতে এক অভাবনীয় শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যুগ আসবে যেখানে বাঘ ও হরিণ একসাথে বিচরণ করবে, শিশুরা বিষাক্ত সাপের সাথে খেলবে কিন্তু কেউ কারও কোনো ক্ষতি করবে না। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে দীর্ঘকাল শাসন করবেন, বিবাহ করবেন, সন্তান লাভ করবেন এবং স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যুবরণ করার পর মদিনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে সমাহিত হবেন।
শেষ মুহূর্তের অলৌকিক নিদর্শন ও মুমিনদের বিদায়
তাঁর বিদায়ের পর পৃথিবীর শেষ মুহূর্তগুলো ঘনিয়ে আসবে এবং তখন আরও কিছু বড় আলামত প্রকাশ পাবে যার মধ্যে অন্যতম হলো পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া। এটি হবে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও অলৌকিক ঘটনা, যা দেখার পর পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একসাথে ঈমান আনবে, কিন্তু সেই সময়কার ঈমান বা তওবা আল্লাহর দরবারে আর কবুল হবে না, কারণ পরীক্ষার নির্ধারিত সময় তখন শেষ হয়ে যাবে। এর পরপরই জমিন ফেটে মক্কা বা তার আশপাশের কোনো অঞ্চল থেকে ‘দাব্বাতুল আরদ’ নামক এক অদ্ভুত ও অলৌকিক চতুষ্পদ প্রাণীর আবির্ভাব ঘটবে, যার হাতে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের লাঠি এবং হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের আংটি থাকবে। এই প্রাণীটি সমগ্র পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে এবং মানুষের সাথে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলবে, সে মুমিনদের কপালে লাঠি দিয়ে স্পর্শ করে তাদের মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল ও নূরানী করে দেবে এবং কাফিরদের নাকে আংটি দিয়ে সিল মেরে তাদের মুখ কালো করে দেবে, যার ফলে কে বিশ্বাসী আর কে অবিশ্বাসী তা একদম স্পষ্ট হয়ে যাবে। এরপর ইয়েমেনের এডেন নামক অঞ্চলের এক গভীর উপত্যকা থেকে এক বিশাল ও ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটবে, যা মানুষকে চারদিক থেকে তাড়া করে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের দিকে বা শামের প্রান্তরের দিকে একত্রিত করতে থাকবে। এই সমস্ত চূড়ান্ত আলামতগুলো শেষ হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা ইয়েমেনের দিক থেকে একটি অত্যন্ত মৃদু, সুবাসিত ও শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন, যা পৃথিবীর সমস্ত মুমিন ও ঈমানদার ব্যক্তির রুহ বা আত্মাকে অত্যন্ত শান্তিতে হরণ করে নিয়ে যাবে। পৃথিবীতে তখন আর এমন একটি মানুষও অবশিষ্ট থাকবে না যার অন্তরে আল্লাহর নাম নেওয়ার মতো সামান্যতম বিশ্বাস রয়েছে। সমগ্র পৃথিবী তখন কেবল নিকৃষ্ট, পাপাচারী, নাস্তিক ও পশুর মতো আচরণকারী মানুষদের দ্বারা পূর্ণ থাকবে এবং এই নিকৃষ্টতম মানুষদের ওপরেই পৃথিবীর চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞ বা কেয়ামত সংঘটিত হবে।
সিঙ্গার প্রথম ফুঁক ও মহাজাগতিক ধ্বংসযজ্ঞ
এই মহাধ্বংসের সূচনা হবে আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা হযরত ইসরাফিল আলাইহিস সালামের সিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার মাধ্যমে। যখন এই সিঙ্গার প্রথম ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আকাশ থেকে এক বিকট, হৃদয়বিদারক এবং ভয়াবহ শব্দ নির্গত হবে যা শোনার সাথে সাথে মহাবিশ্বের সমস্ত জীবন্ত প্রাণী তীব্র আতঙ্কে প্রাণ হারাবে। এই শব্দের তীব্রতায় মহাজাগতিক সুশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে এবং প্রকৃতির চেনা রূপ এক মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। বিশাল ও সুদৃঢ় পাহাড়গুলো তুলোর মতো বাতাসে উড়তে থাকবে, সমুদ্রের পানি প্রচণ্ড উত্তাপে ফুটতে ফুটতে এক বিশাল অগ্নিসমুদ্রে পরিণত হবে এবং সমস্ত নদী ও জলাশয় শুকিয়ে যাবে। মাথার ওপরের নীল আকাশটি তেলের তলানির মতো গলে খসে পড়বে, সূর্য তার সমস্ত আলো হারিয়ে অন্ধকার হয়ে যাবে, চন্দ্র ও সূর্যের আলো একসাথে বিলীন হয়ে তারা একে অপরের সাথে ধাক্কা খাবে এবং আকাশের নক্ষত্রগুলো কক্ষপথ চ্যুত হয়ে মুক্তোর মালার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। গর্ভবতী মায়েরা তাদের গর্ভস্থ সন্তানকে ভুলে যাবে, স্তন্যদায়ী মায়েরা তাদের কোলের শিশুকে ফেলে পালাবে এবং মানুষ তীব্র আতঙ্কে মাতালের মতো এদিক-ওদিক ছুটতে থাকবে, যদিও তারা আসলে মদ পান করেনি, বরং আল্লাহর আজাবের তীব্রতা তাদের বুদ্ধি ও চেতনাকে লোপ করে দেবে।
বারজাখ ও দ্বিতীয় ফুৎকারে পুনরুত্থান
পৃথিবীর সমস্ত জীব নিথর ও মৃত হয়ে যাওয়ার পর এক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবে যাকে বারজাখ বা অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা বলা হয়। এই সময়ে আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কোনো সৃষ্টির অস্তিত্ব থাকবে না, এমনকি মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত আজরাইল আলাইহিস সালাম এবং সিঙ্গার ফেরেশতা ইসরাফিল আলাইহিস সালামকেও আল্লাহ তাআলা মৃত্যুদান করবেন। আল্লাহ একাকী তাঁর পরম সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ঘোষণা করবেন যে, আজ রাজত্ব কার, আজ কোন স্বৈরাচারী বা অহংকারী রাজার কোনো ক্ষমতা নেই, সমস্ত রাজত্ব কেবল একমাত্র পরাক্রমশালী আল্লাহর। এক দীর্ঘ সময় এই নিস্তব্ধতা বজায় থাকার পর আল্লাহ তাআলা পুনরায় হযরত ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে জীবিত করবেন এবং তাঁকে দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার নির্দেশ দেবেন। এই দ্বিতীয় ফুৎকারের সাথে সাথে আকাশ থেকে এক বিশেষ ধরণের জীবনদায়ী বৃষ্টি বর্ষিত হবে, যা মানুষের মেরুদণ্ডের শেষাংশের একটি ক্ষুদ্র হাড় থেকে তাদের পুরো শরীরকে মাটির নিচে পুনরায় নিখুঁতভাবে তৈরি করে ফেলবে। সমস্ত মানুষ তাদের কবর থেকে এক নতুন ও অবিনশ্বর শরীর নিয়ে জীবিত হয়ে দলে দলে চোখ ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়াবে এবং এই ঘটনাকে বলা হয় আল-বা’আস বা পুনরুত্থান। মানুষ যখন কবর থেকে উঠবে তখন তাদের শরীরে কোনো পোশাক থাকবে না, পায়ে কোনো জুতো থাকবে না এবং তারা সম্পূর্ণ খৎনাবিহীন অবস্থায় থাকবে। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, পুরুষ ও নারীরা যদি এভাবে নগ্ন অবস্থায় একসাথে ওঠে তবে কি তারা একে অপরের দিকে তাকাবে না, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন যে, সেই দিনের ভয়াবহতা ও আতঙ্ক এতটাই বেশি হবে যে কারও দিকে তাকানোর মতো মানসিকতা বা সময় কারও থাকবে না।
হাশরের ময়দান ও শাফায়াতে কুবরা
পুনরুত্থানের পর সমস্ত সৃষ্টিকে এক বিশাল ও সমতল প্রান্তরের দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে যাকে হাশরের ময়দান বলা হয়। এই মাঠটি হবে সম্পূর্ণ সাদা এবং সমতল, যেখানে কোনো পাহাড়, উপত্যকা, গাছপালা বা আড়ালের কোনো জায়গা থাকবে না। হাশরের ময়দানে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত আগত কোটি কোটি মানুষ, জিন এবং সমস্ত পশুপাখিকে একসাথে সমবেত করা হবে। এই ময়দানে সূর্য মানুষের মাথার মাত্র এক মাইল বা এক ধনুক সমপরিমাণ উঁচুতে চলে আসবে এবং এর প্রচণ্ড উত্তাপে মানুষের মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে। মানুষ তাদের দুনিয়ার পাপের পরিমাণ অনুযায়ী নিজের গায়ের ঘামের মধ্যে ডুবতে থাকবে, কেউ গোড়ালি পর্যন্ত, কেউ হাঁটু পর্যন্ত, কেউ কোমর পর্যন্ত এবং কেউ কেউ নিজের মুখের থুতু ও ঘামের মধ্যে হাবুডুবু খাবে। এই চরম কষ্ট, তৃষ্ণা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে মানুষ অস্থির হয়ে পড়বে এবং হাশরের ময়দানের এই ভয়াবহ অবস্থান দুনিয়ার গণনায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ মনে হবে। মানুষ এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং বিচার কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য বিভিন্ন বড় বড় নবী ও রাসূলদের কাছে সুপারিশের জন্য দৌড়াবে। তারা ক্রমান্বয়ে হযরত আদম, হযরত নূহ, হযরত ইব্রাহিম, হযরত মূসা এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাবে কিন্তু প্রত্যেক নবীই নিজের দুনিয়ার কোনো না কোনো ভুলের কথা স্মরণ করে বলবেন যে, আজ আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত রাগান্বিত আছেন এবং আজ আমি নিজের মুক্তি ছাড়া অন্য কারও জন্য সুপারিশ করতে পারব না। সবশেষে সমস্ত মানুষ যখন চরম হতাশ হয়ে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসবে, তখন তিনি বলবেন যে, হ্যাঁ, এই সুপারিশের দায়িত্ব আজ আমারই। তিনি হাশরের ময়দানে আল্লাহর आरশের নিচে গিয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহর এমন কিছু চমৎকার প্রশংসা ও গুণগান করবেন যা আগে কোনো মানুষকে শেখানো হয়নি। আল্লাহ তাআলা তখন বলবেন, হে মুহাম্মদ, আপনার মাথা তুলুন, আপনি যা চাইবেন তা দেওয়া হবে এবং আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে। এই মহান সুপারিশকে বলা হয় ‘শাফায়াতে কুবরা’ বা প্রধান সুপারিশ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা হাশরের ময়দানের বিচার কাজ শুরু করার ঘোষণা দেবেন।
আমলনামা প্রকাশ ও মিজানের দাঁড়িপাল্লা
বিচার কাজ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর আরশকে আটজন বিশাল আকৃতির ফেরেশতা বহন করে হাশরের ময়দানে নিয়ে আসবেন এবং আল্লাহর নূরের আলোয় পুরো ময়দান আলোকিত হয়ে উঠবে। আল্লাহ তাআলা তখন প্রত্যেকটি মানুষের সামনে তার দুনিয়ার জীবনের সম্পূর্ণ হিসাব বা আমলনামা পেশ করবেন। এই আমলনামাটি এমন এক অলৌকিক কিতাব বা রেকর্ড যেখানে মানুষের জীবনের ছোট থেকে ছোট এবং বড় থেকে বড় কোনো কর্মই বাদ পড়েনি, মানুষ একা গোপনে কী চিন্তা করেছে এবং জনসম্মুখে কী প্রকাশ করেছে তার সবকিছু সেখানে লিপিবদ্ধ থাকবে। ডানহাতে আমলনামা প্রাপ্ত ব্যক্তিরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে চারদিকের মানুষকে ডেকে বলবে যে, দেখ আমার আমলনামা দেখ, আমি জানতাম আমাকে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। আর যাদের আমলনামা বামহাতে বা পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে, তারা চরম হাহাকার করে বলবে যে, হায় আফসোস, যদি আমাকে এই কিতাব দেওয়া না হতো এবং আমি যদি মাটির সাথে মিশে যেতাম। বিচারের এই পর্যায়ে মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং আল্লাহর নির্দেশে মানুষের হাত, পা, চোখ, কান এবং গায়ের চামড়া কথা বলতে শুরু করবে এবং তারা দুনিয়াতে মানুষের করা সমস্ত পাপের জীবন্ত সাক্ষ্য দেবে। হিসাব-নিকাশের এই চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্য হাশরের ময়দানে স্থাপন করা হবে ‘মিজান’ বা আমলের দাঁড়িপাল্লা। মিজান হলো একটি পরম সত্য ও নিখুঁত পরিমাপক যন্ত্র যার দুটি পাল্লা থাকবে, একটিতে মানুষের ভালো কাজ এবং অন্যটিতে মানুষের মন্দ কাজগুলো রাখা হবে। দুনিয়াতে মানুষের করা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, সদকা, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার, সৎ চরিত্র এবং আল্লাহর জিকির এই সমস্ত নেক আমল ওজনের পাল্লাকে ভারী করবে। যার নেক কাজের পাল্লা সামান্যতম ভারী হবে সে চিরদিনের জন্য সফল ও মুক্ত হয়ে যাবে, আর যার পাপের পাল্লা ভারী হবে সে চরম বিপদ ও ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।
হাওযে কাউসার ও পুলসিরাতের কঠিন পরীক্ষা
বিচারের এই দীর্ঘ ও তৃষ্ণার্ত প্রক্রিয়ার মাঝে মুমিনদের জন্য আল্লাহ তাআলা একটি বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করেছেন যাকে ‘হাওযে কাউসার’ বলা হয়। এটি হলো জান্নাত থেকে প্রবাহিত একটি বিশেষ জলাশয় বা হাউজ যা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করা হয়েছে। এই হাউজের পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং বরফের চেয়েও শীতল হবে এবং এর চারপাশে আকাশের নক্ষত্রের মতো অসংখ্য সুদৃশ্য পেয়ালা থাকবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর অনুসারী ও উম্মতদের এই হাউজ থেকে পানি পান করাবেন এবং যে ব্যক্তি এই পানি একবার পান করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আর কখনোই তৃষ্ণার্ত হবে না। কিন্তু যারা দুনিয়াতে ধর্মের নামে বিদআত বা নতুন প্রথার সৃষ্টি করেছিল এবং নবীর আদর্শ ত্যাগ করেছিল, ফেরেশতারা তাদেরকে এই হাউজ থেকে তাড়িয়ে দেবে। হিসাব-নিকাশ ও দাঁড়িপাল্লার ওজন শেষ হওয়ার পর সমস্ত মানুষকে তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরেকটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করা হবে, যাকে ‘পুলসিরাত’ বলা হয়। সিরাত হলো একটি সুদীর্ঘ সেতু যা হাশরের ময়দান থেকে শুরু করে সরাসরি জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর ঠিক নিচেই থাকবে গর্জে ওঠা এবং লেলিহান শিখা পরিবেষ্টিত জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ড। এই সেতুটি হবে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম এবং তলোয়ারের চেয়েও ধারালো, যার দুই পাশে থাকবে বড় বড় লোহার হুক বা কাঁটা যা অপরাধীদের টেনে নিচে ফেলে দেওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকবে। সিরাতের ওপর কোনো কৃত্রিম আলো থাকবে না, চারদিক থাকবে সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং প্রতিটি মানুষকে তার দুনিয়ার ঈমান ও নেক আমলের পরিমাণ অনুযায়ী ব্যক্তিগত নূর বা আলো দেওয়া হবে। যার ঈমান যত মজবুত ছিল তার নূরের আলো তত বড় ও তীব্র হবে, আর মুনাফিক বা কপট বিশ্বাসীদের আলো সিরাতের শুরুতে একটু জ্বলেই সম্পূর্ণ নিভে যাবে এবং তারা অন্ধকারে পথ হারিয়ে নিচে পড়ে যাবে। মুমিন বান্দারা তাদের আলোর সাহায্যে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই সিরাত পার হতে শুরু করবে, কেউ পার হবে চোখের পলকে বিদ্যুতের গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ দৌড়ে আবার কেউ কেউ হামাগুড়ি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় কোনোমতে পার হয়ে জান্নাতের দরজায় গিয়ে পৌঁছাবে। আর কাফির, মুশরিক এবং পাপাচারী মানুষেরা তাদের পাপের বোঝার কারণে ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে না এবং লোহার কাঁটাগুলোর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে উল্টে জাহান্নামের অতল গহ্বরে পতিত হবে।
কানতারা সেতু ও জান্নাতের অনন্ত সুখ
পুলসিরাতের এই কঠিন বাধা সফলভাবে পার হওয়ার পর মুমিনরা জান্নাতের ঠিক সামনে ‘কানতারা’ নামক একটি সেতুতে এসে সমবেত হবে, যেখানে জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে মুমিনদের মধ্যকার পারস্পরিক দুনিয়াবী হিংসা, ক্ষোভ বা ছোটখাটো পাওনা-দাওয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হবে যাতে তাদের অন্তরে একে অপরের প্রতি বিন্দুমাত্র মালিণ্য বা ক্ষোভ অবশিষ্ট না থাকে এবং তারা সম্পূর্ণ পবিত্র মন নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। এরপর শুরু হবে মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী অধ্যায়, যেখানে সমস্ত সৃষ্টি জান্নাত অথবা জাহান্নাম নামক দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত আবাসে বিভক্ত হয়ে যাবে। জান্নাত হলো আল্লাহর পরম সন্তুষ্টি, রহমত এবং ভালোবাসার এক অবিনশ্বর ও চিরন্তন সাম্রাজ্য যা আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য নিজস্ব কুদরতে সাজিয়েছেন। জান্নাতের রয়েছে আটটি বিশাল দরজা এবং এর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন স্তর, যার মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর হলো জান্নাতুল ফিরদাউস, যার ঠিক ওপরেই রয়েছে আল্লাহর আরশ। জান্নাতের ঘরবাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছে সোনা ও রূপার ইট দিয়ে, যার গাথুনি দেওয়া হয়েছে সুগন্ধি কস্তুরী দিয়ে এবং এর মেঝেতে বালুর পরিবর্তে ছড়িয়ে রয়েছে মুক্তো ও ইয়াকুত পাথর। জান্নাতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বিভিন্ন স্বাদের নদীর ধারা যার মধ্যে রয়েছে নির্মল ও সুপেয় পানির নদী, খাঁটি ও সুস্বাদু দুধের নদী, দুনিয়ার মতো মাতাল না করা পবিত্র শরাব বা পানীয়ের নদী এবং স্বচ্ছ ও খাটি মধুর নদী। জান্নাতবাসীদের বয়স চিরদিনের জন্য তেত্রিশ বছরে স্থবির করে দেওয়া হবে, তারা কখনো বৃদ্ধ হবে না, কখনো অসুস্থ হবে না, তাদের কোনো মলমূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হবে না এবং তাদের শরীর থেকে কস্তুরীর মতো সুগন্ধি ঘাম নির্গত হবে। তারা যা কিছু ইচ্ছা করবে, মনের কল্পনা করার সাথে সাথেই তা তাদের সামনে উপস্থিত করা হবে। জান্নাতে থাকবে পরম সুন্দরী হুর এবং সুদর্শন সেবক যারা সবসময় জান্নাতবাসীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। জান্নাতবাসীরা সোনা ও রেশমের তৈরি চমৎকার পোশাক পরিধান করে মখমলের উচ্চাসনে একে অপরের মুখোমুখি হয়ে বসবে এবং দুনিয়ার সুখ-দুঃখের স্মৃতি চারণ করে গল্প করবে। কিন্তু এই সমস্ত অতুলনীয় নিয়ামত, হুর, প্রাসাদ এবং সুস্বাদু খাবারের চেয়েও জান্নাতের সবচেয়ে বড়, মহান এবং অতুলনীয় আনন্দময় পুরস্কার হবে মহান আল্লাহ তাআলার দিদার বা সরাসরি দর্শন লাভ করা। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর মুখের পর্দা উন্মোচন করবেন এবং জান্নাতবাসীরা তাদের পরম দয়ালু প্রভুর নূরানী চেহারা মোবারক অবলোকন করবে, তখন আল্লাহর সৌন্দর্যের তীব্রতায় তারা জান্নাতের অন্য সব সুখের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যাবে এবং সেটিই হবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের মুহূর্ত।
জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব ও শাস্তির স্বরূপ
জান্নাতের এই পরম সুখের ঠিক বিপরীত প্রান্তে থাকবে আল্লাহর ক্রোধ, অভিশাপ ও শাস্তির চূড়ান্ত স্থান জাহান্নাম বা দোজখ। জাহান্নাম হলো এমন এক অন্ধকার, সংকীর্ণ এবং ভয়াবহ কারাগার যার আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অন্তত সত্তর গুণ বেশি উত্তপ্ত এবং এর কালো ও ধোঁয়াটে আগুন মানুষকে এক মুহূর্তের মধ্যে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে, কিন্তু তারা মারা যাবে না, বরং চামড়া পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ নতুন চামড়া তৈরি করে দেবেন যাতে তারা ক্রমাগত শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। জাহান্নামের পাহারাদার হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন উগ্র, নিষ্ঠুর ও কঠোর হৃদয়ের ফেরেশতারা যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। জাহান্নামীদের খাবার হিসেবে দেওয়া হবে ‘যাক্কুম’ নামক এক অত্যন্ত তিতা ও বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত গাছের ফল যা পেটে যাওয়া মাত্রই তা তেলের তলানির মতো ফুটতে থাকবে এবং তাদের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য দেওয়া হবে ‘হামিম’ নামক ফুটন্ত গরম পানি বা পুঁজ যা মুখে নেওয়া মাত্রই তাদের মুখের ভেতরের সমস্ত চামড়া ও মাংস গলে খসে পড়বে। জাহান্নামীদের শিকল ও বেড়ি দিয়ে বেঁধে আগুনের স্তূপে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাদের চারদিক থেকে কেবল চিৎকার, হাহাকার, আফসোস এবং কান্নার আওয়াজ আসতে থাকবে। তারা আল্লাহর কাছে মৃত্যু প্রার্থনা করবে কিন্তু তাদের মৃত্যু দেওয়া হবে না, কারণ পরকাল হলো এক অনন্ত জীবনের স্থান যেখানে মৃত্যুর কোনো অস্তিত্ব নেই।
মৃত্যুর সমাপ্তি ও চূড়ান্ত ফয়সালা
বিচারের এই সমস্ত প্রক্রিয়া যখন সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে এবং জান্নাতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামবাসীরা জাহান্নামে চলে যাবে, তখন আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে মৃত্যুকে একটি সাদা-কালো দুম্বার বা ভেড়ার আকৃতিতে নিয়ে আসবেন এবং সমস্ত জান্নাত ও জাহান্নামীদের ডেকে বলবেন যে তোমরা কি একে চেনো। সবাই বলবে হ্যাঁ, এটি হলো মৃত্যু। তখন আল্লাহর নির্দেশে সেই মৃত্যুরূপী দুম্বাটিকে জবাই করে দেওয়া হবে এবং ঘোষণা করা হবে যে, হে জান্নাতবাসীরা, তোমরা এখন থেকে চিরকাল এখানে থাকবে, তোমাদের আর কোনোদিন মৃত্যু আসবে না, এবং হে জাহান্নামবাসীরা, তোমরাও চিরকাল এখানে থাকবে, তোমাদেরও আর কোনোদিন মৃত্যু আসবে না। এই ঘোষণার পর জান্নাতবাসীদের আনন্দ আরও কোটি গুণ বেড়ে যাবে এবং জাহান্নামীদের দুঃখ, হতাশা ও হাহাকার এক চরম ও অনন্তসীমায় পৌঁছে যাবে।
উপসংহার
ইসলামের এই সামগ্রিক পরকালবিদ্যা বা এস্ক্যাটোলজির মূল উদ্দেশ্য কেবল কিছু অলৌকিক বা ভীতিকর ভবিষ্যৎবাণী করা নয়, বরং মানুষের বর্তমান জীবনকে একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক কাঠামো ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে নিয়ে আসা। একজন মানুষ যখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে তার জীবনের প্রতিটি ছোট কাজ, প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি গোপন চিন্তার জন্য একদিন তাকে এক মহাবিশ্বের বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে, তখন সে পৃথিবীতে কখনো স্বৈরাচারী, অত্যাচারী বা দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না। পরকালের এই চেতনা মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ-লালসা থেকে মুক্ত করে এক নিঃস্বার্থ, পবিত্র এবং মানবতাবাদী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করে, যা সমাজকে শান্তি ও শৃঙ্খলায় পূর্ণ করে তোলে এবং মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই প্রকৃত সফলতা ও পরম শান্তি দান করে।

Leave a Reply