আসহাবে উখদুদ ও ঈমানদার বালকের কাহিনী ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, শিক্ষণীয় এবং ঈমানকে দৃঢ় করার মতো একটি ঘটনা। এই ঘটনা মূলত কুরআনের Quran-এর সূরা আল-বুরুজে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সূরা আল-বুরুজের ৪ থেকে ৮ নম্বর আয়াতে “আসহাবে উখদুদ” অর্থাৎ “খন্দকের অধিকারীদের” কথা এসেছে। পাশাপাশি এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ হাদিসে পাওয়া যায়।
আসহাবে উখদুদ শব্দের অর্থ হলো “খন্দকের লোক” বা “গর্তের অধিকারী”। “উখদুদ” অর্থ বড় গর্ত বা খন্দক। এই ঘটনা এমন এক জাতির, যারা ঈমানদার মানুষদের কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখার কারণে ভয়াবহ নির্যাতন করেছিল।
অনেক বছর আগে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। সে নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাবান মনে করত। তার রাজ্যে এক জাদুকর ছিল, যে রাজাকে বিভিন্ন জাদুবিদ্যার মাধ্যমে সাহায্য করত। একসময় জাদুকর বৃদ্ধ হয়ে গেল। তখন সে রাজাকে বলল, “আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমার বিদ্যা শেখানোর জন্য একজন বুদ্ধিমান বালক নির্বাচন করুন।”
রাজা একজন মেধাবী বালককে নির্বাচন করল। বালক প্রতিদিন জাদুকরের কাছে শিক্ষা নিতে যেত। পথে একদিন সে এক ধর্মপ্রাণ সাধক বা আল্লাহভীরু সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করল। সন্ন্যাসী তাকে এক আল্লাহর ইবাদতের শিক্ষা দিলেন। বালক তার কথা শুনে গভীরভাবে প্রভাবিত হলো।
এরপর থেকে বালক জাদুকরের কাছেও যেত এবং সন্ন্যাসীর কাছ থেকেও সত্যের শিক্ষা গ্রহণ করত। ধীরে ধীরে তার অন্তরে ঈমানের আলো প্রবেশ করল।
একদিন পথে একটি বিশাল প্রাণী রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল। মানুষ চলাচল করতে পারছিল না। তখন বালক মনে মনে বলল, “আজ বুঝব জাদুকরের পথ সত্য নাকি আল্লাহর পথ সত্য।”
সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বলল, “হে আল্লাহ, যদি সন্ন্যাসীর শিক্ষা আপনার কাছে প্রিয় হয়, তাহলে এই প্রাণীটিকে হত্যা করুন।” এরপর সে পাথর নিক্ষেপ করল। প্রাণীটি মারা গেল। মানুষ পথ চলতে পারল।
এতে বালকের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হলো।
আল্লাহ তাকে বিশেষ ক্ষমতা দান করলেন। সে অন্ধকে সুস্থ করতে পারত, অসুস্থ মানুষকে আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভের পথ দেখাত এবং মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করত।
রাজার একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে বালকের কাছে এলো। বালক বলল, “আমি কাউকে সুস্থ করি না। আল্লাহ সুস্থ করেন। তুমি যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করবেন।”
লোকটি ঈমান আনল। আল্লাহ তাকে সুস্থতা দান করলেন।
সে সুস্থ হয়ে রাজার দরবারে ফিরে গেলে রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে কে সুস্থ করেছে?”
সে বলল, “আমার রব আমাকে সুস্থ করেছেন।”
রাজা বলল, “আমি ছাড়া তোমার আর কোনো রব আছে?”
লোকটি বলল, “আমার রব এবং আপনার রব একমাত্র আল্লাহ।”
রাজা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলো। নির্যাতন শুরু করল। একপর্যায়ে সেই লোক বালকের কথা জানিয়ে দিল। এরপর বালককে আনা হলো।
রাজা বালককে বলল, “তুমি কি জাদু শিখে মানুষকে প্রভাবিত করছ?”
বালক বলল, “আমি কাউকে সুস্থ করি না। আল্লাহ সুস্থ করেন।”
রাজা সন্ন্যাসীকেও ধরে আনল। তাকে বলা হলো ঈমান ত্যাগ করতে। কিন্তু তিনি অস্বীকার করলেন। তখন নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হলো।
এরপর রাজা বালককে হত্যার জন্য সৈন্যদের পাহাড়ে পাঠাল। তারা তাকে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেল। বালক আল্লাহর কাছে দোয়া করল। পাহাড় কেঁপে উঠল। সৈন্যরা পড়ে মারা গেল। বালক বেঁচে ফিরে এল।
পরে তাকে নৌকায় করে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেও সে আল্লাহর কাছে দোয়া করল। নৌকা ডুবে গেল। বালক আবারও বেঁচে গেল।
অবশেষে বালক রাজাকে বলল, “আপনি আমাকে হত্যা করতে পারবেন না যতক্ষণ না আমি যা বলছি তা করেন।”
রাজা বলল, “কী করতে হবে?”
বালক বলল, “সব মানুষকে একত্র করুন। আমাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে আমার তূণ থেকে একটি তীর নিন। এরপর বলুন— ‘বালকের রব আল্লাহর নামে’— তারপর তীর নিক্ষেপ করুন।”
রাজা তাই করল।
তীর বালকের শরীরে আঘাত করল। বালক শহীদ হয়ে গেল।
কিন্তু তখন হাজারো মানুষ বলে উঠল, “আমরা বালকের রবের প্রতি ঈমান আনলাম।”
রাজা ভয়ংকর রেগে গেল। সে বিশাল খন্দক খনন করতে আদেশ দিল। খন্দকে আগুন জ্বালানো হলো।
ঈমানদারদের বলা হলো— “ঈমান ত্যাগ করো, নয়তো আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।”
কিন্তু সত্যিকার মুমিনরা ঈমান ছাড়েনি।
একজন নারী তার শিশু সন্তানকে নিয়ে আগুনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার আগে তিনি কিছুটা দ্বিধায় পড়লেন। তখন আল্লাহর ইচ্ছায় ছোট শিশুটি কথা বলল—
“মা, ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের ওপর আছেন।”
এরপর সেই মা সন্তানকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিলেন।
এই ভয়াবহ ঘটনাকেই বলা হয় “আসহাবে উখদুদ”।
সূরা আল-বুরুজ আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়। প্রথম শিক্ষা হলো— সত্যের পথে থাকলে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। দ্বিতীয় শিক্ষা— ঈমানের জন্য ত্যাগ করতে হয়। তৃতীয় শিক্ষা— ক্ষমতাবান অত্যাচারীরা সাময়িকভাবে সফল হলেও শেষ পর্যন্ত আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা পায় না। চতুর্থ শিক্ষা— একজন সত্যবাদী মানুষের ঈমান অসংখ্য মানুষকে হেদায়েতের পথে আনতে পারে। পঞ্চম শিক্ষা— আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করলে কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষ অবিচল থাকতে পারে।
এই কাহিনী শুধু ইতিহাস নয়, এটি ঈমান, ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সত্যের পথে থাকা মানুষ নানা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আসহাবে উখদুদের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়— দুনিয়ার কষ্ট সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতা চিরস্থায়ী।

Leave a Reply